[b]ঢাকা: [/b]বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধাপরাধ আদালতের বিচারকে কেন্দ্র করে জনঅসন্তোষ বিরাজ করছে। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের পর সে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠতে পারে। এমন অবস্থায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কাকে কেউ উড়িয়ে দিতে পারেন না। ক্ষমতাসীন দল দেশকে একদলীয় শাসন থেকে যাতে সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো সবচেয়ে খারাপ কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে না পারে সে জন্য হোয়াইট হাউসকে তৎপরতা বাড়াতে হবে।
মাইকেল কুগেলম্যানের লেখা ‘ফাইভ রেজল্যুশন্স ফর ইউএস সাউথ এশিয়া পলিসি ইন-২০১৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ওয়াশিংটনে উড্র উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস-এ দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম এসোসিয়েট মাইকেল কুগেলম্যান।
তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ঘনিষ্ঠ নজরদারি করতে হবে। এ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কি হবে সে বিষয়ে ৫টি প্রস্তাব দেন তিনি এ প্রতিবেদনে।
এগুলো হলো- ১. অধিকতর আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চিন্তা করা। ২. সুসংহত অর্থনৈতিক অগ্রগতিমূলক নীতি অনুসরণ। ৩. বাংলাদেশে আরও মনোযোগ বাড়াতে হবে। ৪. ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পুনর্জাগরণে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ এবং ৫. প্রত্যাশ্যা ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য আরও উদ্যোগী হতে হবে।
তিনি আরও লিখেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে এ বছর নির্বাচন। এগুলো হলো আফগানিস্তান, ভারত। ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিতর্কিত নির্বাচন। অন্য চারটি দেশে নির্বাচিত সরকার প্রথমবারের মতো তাদের ক্ষমতার মেয়াদ পুরো করছে। এগুলো হলো ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও পাকিস্তান।
এ বছরই আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে ন্যাটোর সেনাদের। এসব পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তায় দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য থাকে একই। তা হলো স্থিতিশীলতা অর্জন।
তিনি লিখেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বা আন্তঃসম্পর্ক ও দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, তাতে বিদ্যমান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও নিরাপত্তা হুমকি ইসলামী জঙ্গিবাদ থেকে সংঘবদ্ধ অপরাধ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এমন সমস্যার মধ্যে ওই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নিশ্চিতভাবেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পর্যায়ে পড়ে। এ বছর দক্ষিণ এশিয়া ইস্যুতে কয়েকটি বিষয় ভিন্নভাবে সমাধা করার প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরে অধরাই রয়ে গেছে। এখানে মাইকেল কুগেলম্যানের ৫টি প্রস্তাব তুলে ধরা হলো:
১)[b] আরও বেশি আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চিন্তা করা:[/b] ওয়াশিংটনে একটি প্রবণতা রয়েছে। তারা ভারত-পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্কীর্ণ বা সরু লেন্সের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক স্বার্থ অনুধাবনের চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষেই, আফগানিস্তান থেকে বিদেশী সেনা প্রত্যাহারের পর এ দু’টি দেশ আফগানিস্তানে তাদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নামবে। এর ফলে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সঙ্কটের সম্মুখীন হবে। প্রসঙ্গক্রমে, আফগানিস্তান ইস্যুতে ইরান, চীন, রাশিয়া, মধ্য এশিয়ার দেশসমূহের নানা উদ্বেগ ও স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কথা তুলে ধরা হয়।
সবশেষে, এ বছর আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের করণীয় কি হবে, সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয় এ প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, বিশেষভাবে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের জন্য ওয়াশিংটনের উচিত একটি সম্মেলনের আয়োজন করা। সম্মেলনে আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থ ও উদ্বেগের বিষয়গুলো উঠে আসতে পারে এবং মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে দরকারি বহু তথ্য ও রসদ সেখান থেকে পেতে পারেন।
২) [b]আরও দৃঢ়ভাবে অর্থনৈতিক সুসংহতি অর্জনের নীতি অনুসরণ:[/b] দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র অঞ্চল। এ অঞ্চলটির উন্নয়নকে এই দারিদ্র্য বাধাগ্রস্ত করেছে ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা উস্কে দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বিষয়টি জানেন। ২০১১ সালে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এক ঘোষণায় বলেছিলেন, এ অঞ্চলে আরও সমন্বিত অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অর্জনের লক্ষ্যে আফগানিস্তানকে অবশ্যই তাদের সব প্রতিবেশীর সঙ্গে কাজ করতে হবে, যা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে ও জঙ্গিবাদের সমস্যা কমিয়ে আনবে।
এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে দক্ষিণ এশিয়ায় আরও সমন্বিত অর্থনীতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা। এর মধ্যে সাউথ এশিয়ান এসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (সার্ক)-এর কাছ থেকে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। কঠিন সব চ্যালেঞ্জের আবর্তে জড়িয়ে রয়েছে সার্ক। এর সদস্য বেশ কিছু রাষ্ট্রের মধ্যে কার্যত কোন সম্পর্কই নেই। তার সঙ্গে রয়েছে এমন কিছু সমস্যা যেগুলো সহজেই সমাধানযোগ্য। প্রায়ই অচল হয়ে যাওয়া ওয়েবসাইট সে সমস্যাগুলোর একটি।
এ বিষয়গুলো ঠিকঠাক হলে, ওয়াশিংটন বিভিন্ন ইস্যুতে মৃদু চাপ প্রয়োগ করতে পারবে। প্রসঙ্গক্রমে, ইরান-পাকিস্তান পাইপলাইনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ প্রকল্প শুধু আঞ্চলিক সমন্বয়কেই বৃদ্ধি করবে না, পাকিস্তানের শক্তিখাতের সঙ্কটকেও প্রশমিত করবে। গত বছরের জেনেভা চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাসমূহ প্রত্যাহারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা-ও আশার আলো জ্বালিয়েছে।
৩) [b]বাংলাদেশের প্রতি অধিক মনোনিবেশ করা:[/b] সামপ্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান রয়েছে ওয়াশিংটনের কাছে মূল ভাবনায়। এর সঙ্গে মিশে আছে ভারতনীতি। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিষয়টি ব্যাপকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ।
এ সম্পর্কে পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রভাবশালী বিশ্লেষক রবার্ট কাপলান বলেছেন, গত শতকে ইউরোপের মতো এ শতকে একটি আইকনিক এলাকা হয়ে উঠতে পারে এ অঞ্চল। বাংলাদেশ প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এ দেশটির শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ পণ্য যায় যুক্তরাষ্ট্রে।
উপরন্তু, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ হলো বিস্ফোরণোন্মুখ। সমপ্রতি নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন-পূর্ব অপ্রত্যাশিত ঘটনা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। এ নির্বাচন বর্জন করেছে বিরোধী দল। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা ও তার অস্থির প্রতিবেশীদের কারণে এ বছর বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নজর রাখা প্রয়োজন। সরকার পরিচালিত চলমান যুদ্ধাপরাধ বিচারে এরই মধ্যে জনমনে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
৪) [b]ভারত-পাকিস্তান পুনর্মিত্রতা স্থাপনে নতুন করে চাপ প্রয়োগ:[/b] দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক আশীর্বাদ হিসেবে পরিগণিত হবে বলে একমত বেশির ভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা। তবে, খুব অল্প সংখ্যক মানুষই বিশ্বাস করেন, এ দু’টি দেশের সম্পর্ক শিগগিরই পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ দু’টি দেশের সম্পর্কের তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয় ওই প্রতিবেদনে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমেই তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের উচিত নিভৃতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা।
৫)[b] প্রত্যাশা ও লক্ষ্যের ব্যাপারে আরও বিনম্র হওয়া:[/b] দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের যে সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে, তা মেনে নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এ প্রসঙ্গে উঠে আসে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি ইস্যু। সেখানে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিল, সেগুলো সফলতার মুখ দেখেনি। ওয়াশিংটনের নিজের ও দক্ষিণ এশিয়ার স্বার্থে এ বছর মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সব পদক্ষেপই গ্রহণ করার ইচ্ছা পোষণ করবেন।
কিন্তু, তাতে প্রতিবন্ধকতা আসবে। কারণ, দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থের সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মার্কিন স্বার্থ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর, সেটা মার্কিন নীতির জন্য একটি শিক্ষাস্বরূপ। কারণ, তা অন্যান্য অঞ্চলের মার্কিন নীতিতেও কাজে আসবে। সূত্র: মানবজমিন
[b]টাইমনিউজবিডি/এসএমআর[/b]
মতামত
বিতর্কিত, ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ বিস্ফোরিত হতে পারে
ঢাকা: বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধাপরাধ আদালতের বিচারকে কেন্দ্র করে জনঅসন্তোষ বিরাজ করছে। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের পর সে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠতে পারে। এমন অবস্থায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কাকে কেউ উড়িয়ে দিতে পারেন না। ক্ষমতাসীন দল দেশকে একদলীয় শাসন থেকে যাতে সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো সবচেয়ে খারাপ কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে না পারে সে জন্য হোয়াইট হাউসকে তৎপরতা বাড়াতে হবে।





