ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারার ক্ষমতাবলে যখন তখন রিমান্ড চাওয়া ও মঞ্জুর করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী। এ অবিচার বন্ধ করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু সরকারের বিরোধী মতের লোকদের এখন দমন পীড়ণেন জন্যই যখন তখন রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার এই রীতি যেন শেষ হবার নয়।
আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় যে জাতির লাখ লাখ মানুষ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, আজ ক্ষমতার লোভে সেই জাতির সরকারই জনগণকে পদে পদে আইনের নামে নির্যাতন করে চলেছে। আমরা আজও আইনের মাধ্যমে নির্যাতন বন্ধ করতে পারিনি। এটি খুবই হতাশাজনক ঘটনা।
এরই মধ্যে উচ্চ আদালত এক রায়ে বলেন, ‘পুলিশ সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আমলযোগ্য কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেই কেবল কোনো অভিযুক্ত বা সাক্ষীকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে। তাও গ্রেফতারের কারণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করতে হবে। গ্রেপ্তারের পরপরই গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে সংবাদ দিতে হবে। গ্রেপ্তারের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। এ রায় আমাদের দেশের একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
হাইকোর্ট রায়ে প্রত্যাশা করেছিলেন, মাসদার হোসাইন মামলার রায়ের সুপারিশের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ায় ২০০৩ সালের উল্লিখিত রিট মামলার রিমান্ড ও ৫৪ ধারা সংক্রান্ত সুপারিশের আলোকেও এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হবে। কিন্তু অদ্যাবধি এ ধরণের কোনো আইন তৈরি হয়নি। এটি খুবই দুঃখজনক। যার কারণে আজও জনগণের অধিকার প্রতিনিয়ত ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। মানুষের ব্যক্তি অধিকার ও সম্মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ও আটকের ব্যাপারে পদ্ধতিগত সুরক্ষা নিশ্চিতের কথা বলেছেন। যেমন গ্রেপ্তারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথা শীঘ্র গ্রেপ্তারের কারণ জ্ঞাপন না করে পুনরায় আটক রাখা যাবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাবে না।
সংবিধানে আরো বলা হয়, কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ্রেপ্তারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে এর কারণ জানাতে হবে।
আইন অনুযায়ী, বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে। কিন্তু আজ আমাদের দেশের বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের নি:শব্দে গ্রেফতার করে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেলে বিভিন্ন মামলায় জড়িত আছে বলে তাদের হত্যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। ওই ব্যক্তিকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাচনির্মিত বিশেষ কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। কিন্তু হাইকোর্টের রিমান্ড বিষয়ে এই নির্দেশনাও অমান্য করেছে আইনশৃঙ্খলাবহিনী প্রতিনিয়ত।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে বা ৫৪ ধারায় যে কাউকে আটক। ১৬৭ ধারায় তথাকথিত স্বীকারোক্তি আদায়; অতঃপর অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া, কল্পিত ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং কর্তব্যরত অবস্থায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি চালানো এটা বাংলাদেশের প্রশাসনের নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে আটক করা হলে, আইনই হবে তার হেফাজতকারী। তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব সম্পূর্ণই আইনের। এটাই মানবাধিকারের কথা। কিন্তু আইন রক্ষাকারী বাহিনী তা করছে না। ৫৪ ধারায় আটক ব্যক্তিকে আইন বা আইন রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা দেয়নি বা দিচ্ছে না।
১৮৫৭ সালে সিপাহী যুদ্ধের পর খোদ ব্রিটিশরাজ ভারত উপমহাদেশের ক্ষমতাভার গ্রহণ করেন। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ১৮৬২ সালে পুলিশ বাহিনী সৃষ্টি করে পুলিশের বিধি ও কার্যপ্রণালী ধারা প্রণয়ন করা হয়। ফলে জমিদারদের ক্ষমতায় কিছুটা ভাটা পড়লেও পুলিশের সহায়তায় তাদের আধিপত্য পূর্ণ মাত্রায়ই বজায় রাখতে সক্ষম হন। প্রজাদের স্বার্থ কিছুটা সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় ব্রিটিশরাজ ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেন্যান্সী অ্যাক্ট পাস করেন।
ফলে জমিদাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ও ব্রিটিশরাজের কাছে তাদের অসুবিধার কথা তুলে ধরেন। খাজনা আদায়ের এবং প্রদেয় তদাংশ ব্রিটিশরাজকে পরিশোধ করার দায়িত্ব জমিদারদের থাকলেও খাজনা অনাদায়ের কারণে কাউকে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা জমিদারদের নেই।
এ ধরনের নানা অসুবিধার কথা ভেবে এবং ঔপনিবেশিক শাসন পাকাপোক্ত ও চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরাজ ১৮৯৮ সালে ফৌজদারি আইন (অ্যাক্ট নং ৫, যা সিআরপিসি নামে পরিচিত), যা মূলত একটি কালো আইন পাস করেন।
উক্ত আইনের ৫৪ সেকশনে পুলিশকে ঢালাওভাবে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া বা কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত সন্দেহবশে কাউকে আদালতগ্রাহ্য অপরাধের জন্য গ্রেফতার করতে পারে সে ক্ষমতা দেয়া হয়।
১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের আলোকে দেশে সুশৃংখল পুলিশ বাহিনীর গোড়াপত্তন হয়। এর আগে এ ধরনের কোন সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, পুলিশের বড়কর্তাদের এ আইনের ব্যাপারে বড়ই গাত্রদাহ।
কারণ হিসেবে তারা দেখিয়ে থাকেন এটি ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত। সন্দেহ নেই, এটি ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি। কিন্তু শুধু এ অজুহাতই কি ওটা বাতিলের জন্য যথেষ্ট? যদি তাই হয়, তাহলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি অদ্যাবধি বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় মৌলিক আইন।
পুলিশের বড় কর্তাদের দাবি অনুযায়ী ওই আইনগুলোও বাতিল হওয়া দরকার, যেহেতু সেগুলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত। তাদের ওই পুলিশ আইনের ব্যাপারে গায়ে জ্বালা পোড়ার প্রধান কারণ মূলত ওই আইনের ৪ ধারা, যেখানে উল্লেখ রয়েছে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাধারণ নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে থেকে জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপার ও অধীনস্থ অন্য অফিসাররা দায়িত্ব পালন করবেন। ১৯৭৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তৎকালীন সামরিক শাসক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সার্কুলারের মাধ্যমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জেলা পর্যায়ে পুলিশের এসপি ও অন্যান্য অফিসারের এসিআর অর্থাৎ বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন লেখার বিধান স্থগিত করেন।
পুলিশ রেগুলেশন (পিআরবি) ১৯৪৩-এর ৭৫ক নং রেগুলেশন বলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওই এসিআর লিখতেন। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ৪ ধারার বিধানকে বাস্তবে কার্যকর করার জন্য পিআরবিতে এরকম বিধান করা হয়েছিল।
পিআরবি একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত আইনগত রূপ, যার দ্বারা পুলিশ বাহিনী তার সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এটি ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ভিত্তিতে সৃষ্ট। সত্যিকার অর্থে পিআরবির সামান্য দু-একটি বিষয় ছাড়া অধিকাংশ বিষয় বাস্তবসম্মত এবং তা দেশ ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পিআরবি’র ৭৫ক নং রেগুলেশনের মাধ্যমে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ৪ ধারার যে বাস্তবায়ন করা হতো, তা ১৯৭৫ সালের ১০ ডিসেম্বরে তৎকালীন সামরিক শাসকের হটকারী সিদ্ধান্তে অকার্যকর হয়ে যায়।
ফলে আইন থাকলেও এখন তার বাস্তবায়ন নেই। যারা সমাজে আইনের প্রয়োগ ঘটাবে, তারা নিজেরাই যদি আইন না মানে তবে সমাজে আইনের শাসন নয় বরং বেআইনি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে বাধ্য। এ পর্যায়ে খোদ যুক্তরাজ্যে সাংবিধানিক আইনের বর্তমান হাল-হকিকত সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে।
উক্ত আইনের সেকশন ৫৬ অনুযায়ী পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে আটক করার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই তার আত্মীয়দের কাউকে আটকের কথা জানাবে।
শুধু গুরুতর অপরাধের জন্যই এই ৩৬ ঘণ্টার সময়সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।  একজন আটক ব্যক্তিকে যে কোনো সময়ে তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার অধিকার দিয়েছে। তাকে আইনজীবী দেয়া সম্ভব না হলে নিজ খরচায় রাষ্ট্র একজন কর্তব্যরত আইনজীবীর ব্যবস্থা করবে।
উক্ত আইনের সেকশন ৭৬-এ কোনো স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যকে মামলার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের বিধান থাকলেও শর্ত রয়েছে যে, উক্ত বিবৃতি বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে এবং কোনো জুলুম করে নেয়া হয়নি, তা প্রমাণ করতে হবে।
অনুরূপভাবে সেকশন ৭৮ ফৌজদারি আদালতকে এই আইনের বিধান বহির্ভূত গৃহীত কোনো প্রমাণ নাকচ করে দেয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেছে।
পুলিশ কোনো আটক ব্যক্তিকে জানিয়ে দেবে যে, তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ বা সাক্ষাতের সুযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজনে বিনা ব্যয়ে সরকারি আইনজীবীর সাক্ষাত ও পরামর্শ নিতে পারেন। সন্দেহের বশে গ্রেফতার হলো সরকারের বিচার বহির্ভূত হত্যার এক অভিনব কৌশল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, আইন তৈরি করে শাসকগোষ্ঠী, প্রয়োগও করে শাসক গোষ্ঠী। তারা যদি আইনের অপব্যবহার করে তাহলে কারো কিছু করার নেই। এই জন্য জনগণকে আইন সম্পর্কে জানতে হবে। একই সংঙ্গে সরকারকেও জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব থাকতে হবে।