দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ 'মান্থলি পেয়েবল অর্ডার' (এমপিও)ভুক্তির জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে। তাদের মধ্যে আবার কোনো কোনোটি প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ১৫-২০ বছর পেরিয়ে গেলেও এমপিওভুক্তির সেই সোনার হরিণটি এখনও ধরতে পারছে না।
এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ, দেশে প্রায় সাড়ে আট হাজার প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় আছে। ভাবতে সত্যিই অবাক লাগে যে দেশে এতগুলো প্রতিষ্ঠান এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবশ্য এখন আর এমপিওভুক্তির কিছু নেই। কারণ সেখানে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানগুলো এ সরকারের আমলেই গত কিছুদিন আগে জাতীয়করণ করে দেওয়া হয়েছে। আমি এ রকম কিছু প্রতিষ্ঠানের কথা জানি। সে সঙ্গে জানি সেসব প্রতিষ্ঠানের ভুক্তভোগী কিছু শিক্ষক-কর্মচারীর কথাও। তাদের মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এদের প্রতিষ্ঠার প্রায় ২০ বছর হয়ে গেছে এবং তারা যথারীতি এ দীর্ঘ সময় ধরে বিনামূল্যে শিক্ষাদান করেও চলেছেন; কিন্তু এখন পর্যন্ত না হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি, না হয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি।
আবার অন্যদিকে আরও কিছু বেসরকারি শিক্ষকদের দেখছি যে, তারা প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে এমপিওভুক্তি ছাড়াই তাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে চলেছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে এক প্রকার না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। তাদের অপরাধ কী? সবাই তো সরকারি চাকরি পায় না। কিংবা অনেকে শিক্ষকতা করতে চান। তারা যাবেন কোথায়? তারাও তো এ দেশেরই সন্তান। আজ শিক্ষাক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তাতে কি এসব এমপিওবিহীন শিক্ষক-কর্মচারীদের অবদান নেই? এ ক্ষেত্রে তাদের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষিত এসব যুবক-যুবতী তাদের পড়াশোনা শেষ করে অনেকে সরকারি চাকরির চেষ্টা করে এ প্রতিযোগিতার বাজারে ব্যর্থ হয়ে নিজের এলাকার সন্তান-সন্ততিকে শিক্ষিত করার ব্রত নিয়ে নিকটবর্তী কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী হিসেবে চাকরিতে সংযুক্ত হয়ে পড়েছেন। সে ক্ষেত্রে হয়তো তারা নিজ বাড়ির খাবার খেয়ে চাকরি করবেন বলেই দীর্ঘদিন বেতন ছাড়াও কোনো রকমে প্রতিষ্ঠানকে ধরে রাখেন। এতে অবশ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ দেশ ও জাতি উপকৃত হয় তাদের শিক্ষাসেবা পেয়ে।
এখন কিন্তু বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে ঢুকতে হলেও প্রায় বিসিএস পরীক্ষার আদলে অনুষ্ঠিত সারাদেশে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে এমপিওভুক্তির জন্য তালিকাভুক্ত হতে হয়। সেসব জায়গায় চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই শুরু হয় তাদের এমপিওভুক্তির মতো সোনার হরিণের পেছনে ছোটাছুটি। এ যেন চাকরি পাওয়ার চেয়েও কঠিন কাজ। এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সন্তুষ্ট করতে হয়, তারপর শুরু হয় স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধরনা দেওয়া। এ যেন আর শেষ হতে চায় না। অতঃপর বেনবেইজ, শিক্ষা ভবন, মন্ত্রণালয় এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্তও গড়াতে হয় অনেক সময়।
কথিত আছে যে, এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ভবনের জটিল-কুটিল দৌরাত্ম্যের কথা কে-ইবা না জানে। তবে এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি অংশের বরাদ্দ আস্তে আস্তে এখন শতভাগ দেওয়া হয়ে থাকে। অথচ এটি স্বাধীনতা-উত্তরকালে সর্বপ্রথম ২০ ভাগ থেকে দেওয়া শুরু হয়েছিল, যা আমাদের সবারই মনে থাকার কথা। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অবদানের কথা বলতেই হবে। এবারও রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোকে এক কথায় জাতীয়করণ করে দিয়েছে। এজন্যই এ সরকারের প্রতি মানুষের চাওয়া-পাওয়া এবং প্রত্যাশা আরও অনেক বেশি। দেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলে কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই এগিয়ে থাকার রেকর্ড রয়েছে।
আবার রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় অনেক শহরের নামকরা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি পর্যায়ের যারা শিক্ষা বোর্ডের মেধাতালিকার শীর্ষে। এমপিওভুক্তিতে অবশ্য কিছু সমস্যাও আছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু ক্যাটাগরি রয়েছে; যেমন_ সৃষ্ট পদ, অনুমোদিত পদ কিংবা শূন্যপদ। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবশ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির চাপে অনুমোদনহীন, সৃষ্ট, অনুমোদিত এবং শূন্য সব ধরনের পদে বেশি বেশি লোক নিয়োগ দিয়ে রাখা হয়েছে। সেজন্য সেই প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের এমপিওভুক্তিও বন্ধ রয়েছে।
আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা খুলে ফেলেছে। সেখানে যথাযথ স্টাফ ও অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুলকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিক স্কুলকে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজকে ডিগ্রি কলেজ এবং ডিগ্রি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ নাম দিয়ে সেখানে দেদারসে অনার্স পড়ানো শুরু করেছে। সেসব অনেক প্রতিষ্ঠানের ঠিকমতো নেই কোনো মানসম্পন্ন শিক্ষক স্টাফ, নেই কোনো অবকাঠামো।
সরকার সরকারি চাকুরেদের জন্য অষ্টম পে স্কেল ঘোষণা করেছে, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ১ জুলাই ২০১৫ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি, যা বিমাতাসুলভ আচরণ হিসেবে ভুক্তভোগীরা মনে করছেন। কারণ প্রতি পাঁচ বছর পরপর চাকুরেদের প্রণোদনা প্রদান, দ্রব্যমূল্য, বাজারমূল্য এবং চলমান মূল্যস্টম্ফীতির ধকল সমন্বয় সাধন ইত্যাদির জন্যই সরকার এ পে স্কেল দিয়ে থাকে। কাজেই সেখানে বেসরকারি চাকুরেদের এসবের প্রয়োজন নেই, বাস্তবিকপক্ষে এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এমনিতেই তারা আসলে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন, তার ওপর আবার প্রতিক্ষেত্রেই আর্থিকভাবে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া কষ্টকর।
এবার শিক্ষায় বাজেট হলো ১১.৬ শতাংশ প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসহ। অবশ্য শিক্ষা খাতের ঘোষিত এ বাজেটে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় নিজেই একাধিকবার অসন্তুষ্টি ব্যক্ত করেছেন। সরকার দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের দিকে একটু সুদৃষ্টি দিলেই এসব সমস্যা সহজেই সমাধান করা যেতে পারে। তবে যারা এমপিওভুক্ত তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি তো আছেই, তার থেকেও যারা দীর্ঘদিনে এখনও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি তাদের বিষয়টি সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফয়সালা করা উচিত। অতীতে শুধু শিক্ষা ভবনের অনৈতিক আনুকূল্যে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি এমপিওভুক্ত হয়েছেন যেগুলো হওয়ার উপযুক্ত হয়নি। জানা যায়, ডিগ্রি পর্যায়ে পঞ্চম শিক্ষক পর্যন্তও এমপিওভুক্ত হয়েছে।
অথচ যাদের আসলেই হওয়ার কথা তারা হতে পারেননি। প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির এমপিওভুক্তির জন্য এখন যেসব পূর্ব শর্তাবলি পূরণ করতে হয় তার মধ্যে প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফল, প্রতিষ্ঠার চাকরির সময়কাল, প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, জঙ্গিবাদের সৃষ্টি করছে কিনা এসব দেখে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুতপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এগুলো নিয়ে প্রায়ই আন্দোলনের ডাক দিতে দেখা যায়, সেটি আবার সর্বাংশে ঠিক নয়। বর্তমান সরকারের শিক্ষা বিষয়ে আন্তরিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। কিন্তু বিষয় হলো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন।
ইতিমধ্যে গত কয়েকদিন আগে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক বাংলাদেশ নিম্নআয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার সুখবর পাওয়া গেছে। এভাবে আর্থিক খাতের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারলে রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুলের মতো অদূর ভবিষ্যতে অন্য সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এক সময় পূর্ণ জাতীয়করণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের স্থির বিশ্বাস। তবে এক্ষুণি এবারের ঘোষিত এ বাজেট থেকেই শিক্ষাবান্ধব মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ও সদিচ্ছায় এমপিওবিহীনদের এমপিওভুক্তির বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।
লেখক:ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ





