কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘হৈমন্তী’ গল্পের ধারা বর্ণনায় বলেছেন, ‘ নরমাংসের স্বাদ পাইলে মানুষের সম্বন্ধে বাঘের যে দশা হয়, স্ত্রী সম্বন্ধে তাহার ভাবটা সেইরূপ হইয়া ওঠে’। কবিগুরু মূলত বাঘের মাংসের প্রতি আসক্তি আর পরিনীতের স্ত্রীর প্রতি দুর্বলতার কথায় অত্যন্ত সাবলীল ও সার্থকভাবে বর্ণনা করেছেন।

আসলে ভোজন বিলাস ও জৈবিক চাহিদা জীবের বিশেষ করে মানুষের স্বভাবজাত ও মজ্জাগত। আর এসব পূরুণ করতে হয় সংবিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে। কিন্তু তা যদি বেপরোয়া ইন্দ্রীয় বিলাস ও লিপ্সায় পরিণত হয়, তবেই মনুষত্ব পশুত্বে রূপ নেয়। বিষয়টির সুন্দর ও প্রাণবন্ত উপস্থান করেছেন কালজয়ী কথাসাহিত্যিক, রম্য লেখক ও রাজনীতিক মরহুম আবুল মনসুর আহমদ। তিনি তার ‘আয়না’ রম্য-গ্রন্থে ‘হুজুর কেবলা’ গল্পে ‘হুজুর কেবলা’ চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের ক্ষমতালোভী, ধর্মব্যবসায়ী, নারীলোভী ও ইন্দ্রিয় পুঁজারীদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন তার লেখনির সুনিপুন উপস্থাপনায়।

গল্পের পরিসর সুদুরপ্রসারী হলেও হুজুর কেবলা খ্যাত পীর সাহেবের প্রাগৈতিহাসিক প্রবৃত্তি ও ইদ্রিয়ানুভূতির বিষয়টি উপজীব্য। গল্পে ভাগ্যাহতা কলিমনের রূপ-লাবণ্যই বিড়ম্বনার প্রধান কারণ হয়ে দেখা দেয়। উল্লেখ, লাস্যময়ী কুলবধু কলিমন পীর সাহেবের মুরীদ রজব আলীর সদ্য পরিণীতা স্ত্রী। কিন্তু তার রূপ-সৌন্দর্যটা পীর সাহেবের নজরে আসে। এতেই কেবলাজান একেবারে কুপোকাত। তাই তিনি তার সুপ্ত কামনা-বাসনা ও আদিম ইন্দ্রিয়লিপ্সা চরিতার্থ করতেই মুরিদের সধবা স্ত্রীকে অতিকৌশলে করায়ত্ব ও পশুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য খলিফা-মুরিদানের মাধ্যমে প্রতারণার আশ্রয় নেন। পীর সাহেব ও তার চেলা-চামুন্ডারা সম্মিলিতভাবে রাসুল (স.) এর রূহকে অন্যের উপর হাজির করার নাটক মঞ্চস্থ করে। নিজের পাপ বাসনা পূর্ণ করতে মহানবী (স.) এর অবমাননা করতে কুন্ঠাবোধ করেনি তারা।

ঘটনার নাট্যরূপ দিতেই পীর সাহেবের প্রধান খলিফা সুফী সাহেবের কলবের উপর রাসুল (সা.) এর রূহ মোবারককে হাজির করার কদর্য ও গর্হিত পথ অনুসরণ করা হয়। প্রশ্নত্তোরের এক পর্যায়ে রাসুল (সা.) এর রূহ মোবারক হুজুর কেবলাকে চতুর্থ বিয়ে করার নির্দেশ দেন এবং পাত্রী হিসাবে পীরের মুরিদ রজব আলীর স্ত্রী কলিমনের নামও উল্লেখ করা হয়। রাসুল (সা.) নির্দেশের পাবন্দী করে হুজুর-কেবলার মুরিদান-আশেকান ও চেলা-চামুন্ডারা রজবকে তার স্ত্রী তালাক দিতে বাধ্যও করে। সদ্য তালাকপ্রাপ্তার ইদ্দত পালন প্রশ্নে রাসুল (সা.) এর কলবের পক্ষে সুফী সাহেবের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়, ‘কলিমন কেবল তোমার জন্যই হালাল। এই মারফতি নিকার ইদ্দত পালনের প্রয়োজন হ্ইবে না’।

হুজুর কেবলার ৪ বিয়ের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে আখেরী নবীর নামে সুফী সাহেবের মুখ থেকে নিসৃত হয়, ‘.... তোমার মাত্র তিন বিবি। যারা সাধারণ দুনিয়াদার মানুষ, তাদের এক বিবি হইলেও চলিতে পারে। কিন্তু যারা রুহানী ফয়েজ হাসিল করিতে চায়, তাদের চার বিবি ছাড়া উপায় নাই। আমি চার বিবির ব্যবস্থা কেন করিয়াছি, তোমরা কিছু বুঝিয়াছ ? চার দিয়াই এ-দুনিয়া, চার দিয়াই আখেরাত। চারদিকে যা দেখ সবই খোদা চার চীজ দিয়া পয়দা করিয়াছেন। চার চীজ দিয়া খোদাতালা আদম সৃষ্টি করিয়া তার হেদায়েতের জন্য চার কেতাব পাঠাইয়াছেন। সেই হেদায়েত পাইতে হইলে মানুষকে চার এমামের চার মযহাব অনুসারে চার তরিকা মানিয়া চলিতে হয়। এইভাবে মানুষকে চারের ফাঁদে ফেলিয়া খোদাতালা চার কুরসীর অন্তরালে লুকাইয়া আছেন। এই চারের পরদা ঠেলিয়া আলমে-আমরে নুরে ইয্দানিতে ফানা হইতে হইলে দুনিয়াতে চার বিবির ভজনা করিতে হইবে’। ( নাউজুবিল্লাহ )

মূলত কথা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ তার রম্য-রচনার মাধ্যমে সমাজের ধর্মীয় কুসংস্কার, আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও শ্রেণীস্বার্থে ধর্মের অপব্যাখ্যা-অপব্যবহার ও কপট সাধুদের মুখোশ উম্মোচনে ব্রতী হয়েছেন। এতে তিনি কতখানি সফল হয়েছেন তা অবশ্য সমঝদার পাঠকগণই মূল্যায়ন করতে পারবেন। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদ যে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারের ও ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মসীহযুদ্ধ চালিয়েছিলেন তার প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়েছে বলে মনে হয় না।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় পন্থায় ক্ষমতা চর্চার সুযোগ এখন আর নেই। সে সময় ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে ক্ষমতা চর্চা হতো। রাষ্ট্র পরিচালনায় কোন সংবিধিবদ্ধ নিয়ম-পদ্ধতি ছিল না। কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে এসব পেশীশক্তির চর্চাকে ‘অপরাধ’ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। অপরাধের প্রতিবিধানের জন্য দন্ডবিধি এবং তা কার্যকরের জন্য বিচার বিভাগ, সঠিকভাবে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য বিচারকের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা ও ক্ষমতা চর্চায় জনমতের প্রতিফলন ও গণতান্ত্রিক ধারার ব্যাপ্তি ঘটেছে। সৃষ্টি হয়েছে রাষ্ট্র বিজ্ঞানও। ফলে মানুষ এসের সুফলও পাচ্ছে দারুণভাবে। আমাদের দেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, Ô The shall be a democracy in which fundamental human rights and fredoms and respect for the dignity and worth of the human person shall be guaranteed and in which effective participation by the people through their elected representatives in administration at all levels shall be ensured.’)

অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যেও প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।

কিন্তু দেশে গণতন্ত্রের নামে আত্মতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। মানবাধিকার, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবসত্তার মর্যাদা ও শ্রদ্ধাবোধ এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আসলে আত্মপুজারীরা বোধহয় অতীতে নিবৃত ছিল না, এই একবিংশ শতাব্দী এসেও নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। অশুভ চর্চার সিলসিলাটা বোধ হয় এখনও চালুই রয়ে গেছে।

মূলত আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও শ্রেণীস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান জানান দিতেই হুজুর কেবলার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এসব ক্ষমতাপাগল হুজুর কেবলাদের কাছে ‘ক্ষমতা’ কলিমনের রূপ-যৌবনের মত লাস্যময় ও উপভোগ্য। ক্ষমতা পুজারী এসব ব্রহ্মণরা ক্ষমতার মোহে পুরোপুরি অন্ধ। তারা দেশটাকে নিজেদের তালুক-সম্পত্তি মনে করে। দেশটা বোধহয় শুধুই দুগ্ধজাত গাভী । তাই এর মালিকানা ছাড়তে তারা কোনভাবেই রাজী নয়। কারণ, যত দোহন করা যায়, ততই তাদের দোহনেচ্ছা বৃদ্ধি পায়। এদের খাঁইয়ের কোন শেষ নেই। খেতে খেতে নিজের উদরটাকে ইটভাটা বানিয়ে ফেলেছে। গাছ-গাছালী, লাকড়ি-খড়ি, খড়-কুটা-বর্জ যা সামনে পায় সবই উদরস্থ করে।

এদের চেলা-চামুন্ডা, খয়ের খাঁ, মুরিদান-আশেকান ও খলিফাদের কোন অভাব হয় না। কারণ এরা উচ্ছিষ্ট ভোগী। ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় সৃষ্টির আদিকাল থেকে শুরু থেকে অদ্যাবধি এসব উচ্ছিষ্টভোগীদেরই প্রাধান্য সকল ক্ষেত্রেই। এরা সবকিছুরই অনুঘটক। মূলত ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতেই এরা শ্রেণী বিশেষকে লেহন করে চলে। তারা ক্ষমতার বর্জ ভক্ষণের জন্য ক্ষমতাশালীদের জিকির-আজকারে লিপ্ত হয়।

সাংবিধানভাবে বাংলাদেশ গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম। সে মতে জনপ্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটেই নির্বাচিত হওয়ার কথা জনপ্রতিনিধি। মূলত টেকসই গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নির্বাচকমন্ডলীকে উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। গেটেলের মতে, Ô Because of the wide powers, direct and indirect, exercised by the voters in the modern states, the electorate has become practically a separate and important branch of government.’)

অর্থাৎ নির্বাচনমন্ডলী কার্যত সরকারের একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী শাখা, কারণ এর বিস্তৃত ক্ষমতা রয়েছে এবং তা সরকারি ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রযোজ্য হয়।

মূলত দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন-কানুন ও নীতি-নৈতিকতাবোধ উপেক্ষা করে দেশে মারেফতি গণতন্ত্র চালু হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। মারেফতি বিয়ের জন্য কলিমনের যেমন ইদ্দত পালনের প্রয়োজন হয় না, আমাদের দেশের গণতন্ত্রেও বোধ হয় নির্বাচকমন্ডলী ও তাদের ভোট দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

চরদখলের মত কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, জাল ভোট এবং ভোটারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শনসহ হামলা-মামলা করলেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কোন সমস্যা হয় না। কারণ, দেশটা বোধ হয় এমনই কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে যে, জনগণকে কষ্ট করে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রে সেবক সংঘই (?) এই মহান কাজটা সমাধান গণমানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য।

জনমতের তোয়াক্কা না করে ১৯ সাল, ২১ সাল ও ৪১ সালের স্বপ্নে তারা বিভোর। আসলে দেশে গণতন্ত্র ও নির্বাচনের নামে যা শুরু হয়েছে তা আমাদের জন্য কলঙ্কতীলকই বলতে হবে।

সম্প্রতি দেশে পৌর নির্বাচন শেষ হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণরায়ের মাধ্যমে জনগণ তাদের শাসক নির্বাচন করে। সে নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য সকল দেশেই নির্বাচন কমিশন নামের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কমিশনের দায়িত্ব হলো দেশের ভোট দানে যোগ্য লোকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে সকল যোগ্য নাগরিকের ভোটদান প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্নকরণ।

কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বচন কমিশনারসহ অপরাপর কমিশনারগণ কোন বিশেষ দল, গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ গোলাম নন বরং তারা সাংবিধানিক পদের পদাধিকারী। নির্বাচনকে নির্বিঘ্নকরতে যা যা করা প্রয়োজন সংবিধান তাদেরকে সকল ক্ষমতায় প্রদান করেছে। যেকোন নির্বাচনকালীন সময়ে গণপ্রশাসনকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যাস্ত করার সাংবিধানিক বিধানও রয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (Ô It shall be the duty of all executive authorities to assist the Election Commission in the discharge of the functions.’)

অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশনের দাসসুলভ মনেবৃত্তি ও শাসক গোষ্ঠীর তল্পিবাহক হওয়ার কারণে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে ধ্বংসে মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

গণপ্রশাসনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজে না লাগিয়ে ক্ষমতাসীনদের তল্পিবাহক বানানো হয়েছে। মেরুদন্ডহীন ও দলদাস নির্বাচন কমিশনের কাছে এরচেয়ে বেশী কিছু আশা করার সুযোগ আছে ?

সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বচনের খবরা-খবর নিয়ে জানা গেছে, দেড় হাজারেরও অধিক কেন্দ্রে ভোট কারচুপি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক কেন্দ্রে রাতেই বিশেষ প্রতীকে সিল মারা হয় বলে অভিযোগ আছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে মেয়র পদের ব্যালটই দেয়া হয়নি। ব্যাপক ভোট ডাকাতি ও ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে। এজেন্টদের মারধর ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। ব্যালটভর্তি বাক্স এনে নির্ধারিত সংখ্যক ব্যালট বাক্সের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এসবের নাম যদি গণতন্ত্র হয় তাহলে ফ্যসীতন্ত্র বা জুলুমতন্ত্রের সংজ্ঞায়ন নতুন করে করতে হবে বৈ-কী !

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচনে সংঘর্ষে সাতকানিয়ায় যুবদলের এক কর্মী নিহত হয়েছেন। সাংবাদিক ও পুলিশসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক‘শ আহত হয়েছে। কিছু সংখ্যক কেন্দ্রে রাতেই বিশেষ মার্কায় সিল মারা হয়েছে। যশোরের একটি কেন্দ্রে ভোট শেষ হওয়ার আগেই ভোট গণনা সম্পন্ন হয়ে গেছে। এ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে ২শ‘টি পৌরসভার দেড় শতাধিক কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এ নির্বাচনে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নির্বাচন হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। হুজুর কেবলা ও খলিফা-মুরীদানের যৌথ প্রযোজনায় খেলাটা বেশ উপভোগ্যই বলতে হবে।

প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দফায় দফায় প্রতিনিধি দলের সদস্যরা নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেছে।

জাতীয় পাটির পক্ষ থেকে ১৭৬টি কেন্দ্রে থেকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থীদের সমর্থকরা সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) এজেন্টদের বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। কেন্দ্র দখল ও অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তত ২২ জন বিএনপি ও স্বতন্ত্র এবং বিদ্রোহী প্রার্থী। এ নির্বাচন যখন সরকারি দলও অবাধ মনে করেনি, তাই বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তো থাকছেই।

অভিজ্ঞমহল থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে যে, সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে দৃশ্যমান কারচুপি হলেও অদৃশ্য কারচুপিও হয়েছে ব্যাপকহারে। অন্তত তিনটি পর্যায়ে পৌরসভা নির্বাচনে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দুই রকমের কারচুপি হয়েছে। ভোটের আগে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রচার ও গণসংযোগে বাধা দেয়া হয়েছে। সন্ত্রাস সৃষ্টি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের নৈতিক মনোবল ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে পোলিং এজেন্টদের মামলার ভয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকা দিয়ে ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। জালভোটের বন্দোবস্ত তো যথারীতি আছেই। নির্বাচনী কর্মকর্তারা প্রশাসনিক ক্যাডারের বলে তারা এসব ব্যাপারে কিছু বলেনি। নির্বাচন কমিশন এসব দেখেও না দেখার ভান করে সরকারি দলের পালে বাতাস দিয়েছে।

আসলে নির্বাচন কমিশন এখন ‘পুতুল নাচের খেলা’য় মেতে উঠেছে। কমিশন যে সকল নির্বাচনেই দায়-দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে তা কমিশনের বক্তব্য থেকেই পরিস্কার। নির্বাচন নিয়ে কমিশনের পক্ষে বলা হয়েছে, কারো কোনো আপত্তি থাকলে আদালতে যেতে পারে।

স্মরণযোগ্য যে, কোনো কোনো ভোট কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়লেও এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পড়েছে যে ওসি, এসপি ও ডিসি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কথা শোনেন নি। কারণ তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠান। তাই তাদের পক্ষে কোন কিছু করা মোটেই সম্ভব নয়।

সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। কমিশন তাদের হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধার, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এরপরও সরকার এবং নির্বাচন কমিশন দাবি করছে পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। পৌর নির্বাচনে যে কারচুপি হয়েছে তা সবাই দেখেছে। একই প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় ৫ জানুয়ারি, উপজেলা, ঢাকা সিটি করপোরেশনের মতো পৌরসভা নির্বাচনেও কারচুপি হয়েছে। আর ৫ জানুয়ারি পাতানো নির্বাচন নিয়ে তো প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা এইচ টি ঈমামের আত্মস্বীকৃতিও রয়েছে।

মূলত সরকার দেশ শাসনে হুজুর কেবলার ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা দলীয়করণ করে পীর-মুরিদীর রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। সরকারের মুখ থেকে যা নিসৃত হচ্ছে তা-ই এ সংস্থাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। এখানে নীতি-নৈতিকতা, আইন-কানুন, সংবিধান কোন কিছুকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। সংবিধান ও প্রচলিত আইন-কানুনকে নিজেদের অনুকুলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রকে এখন ক্ষমতাসীনদের ‘পুতুলে’ পরিণত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হলেও তারা ক্ষমতাসীনদের দলীয় ক্যাডারে পরিণত হয়েছেন। তারা চাকুরীবিধি লঙ্ঘন করে সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেও কুন্ঠাবোধ করছে না। যা তাদের রীতিমত পেশাগত অসদাচারণ। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা সম্পর্কে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অগ (Ogg) বলেন, (The body of the civil servants is an expert, professional, non-political, permanent and subordinate staff)

অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাবৃন্দ হবে সুদক্ষ, পেশাদারী, অধিনস্ত কর্মকর্তা যারা স্থায়ীভাবে চাকরি করেন এবং রাজনীতির সাথে যাদের কোনো সংশ্রব নেই।

এখানেই শেষ নয়। বিচারের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনকারীরা বিচারকের পদ অলঙ্কৃত করছেন এবং অবসরের পর আবার রাজপথেই ফিরে আসতেও প্রত্যক্ষ করা গেছে। অবসরের দীর্ঘকাল পরে বিচারকদের রায় লেখার চর্চা শুরু হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত রায় আর পুর্নাঙ্গ রায়ের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রায় লিখে জমা দিয়ে ফেরত নিয়ে আবার সংশোধনের নজীরও সৃষ্টি হয়েছে আমাদের দেশে। যা কারো কাম্য ও আইনানুগ নয় বলেই মনে করছেন দেশ-বিদেশের আইনজ্ঞগণ।

সবই হয় অদৃশ্যের ইশারায়। নেপথ্যে থেকে হুজুর কেবলারা কলকাঠি নাড়ছেন, আর খলিফা, আশেকান-মুরিদানেরা কোরাস গাইছেন নিজ মতলবে। কিন্তু এসব হুজুর কেবলাদের কাজকর্ম কখনোই নির্বিঘ্নহয়নি। যখনই তারা এসব করেছে ইতিহাসের এমদাদরা তার প্রতিবাদও করে। আবুল মনসুর আহমদের বর্ণনায় ‘বাপ-চাচা, পাড়া-পড়শীর অনুরোধে, আদেশে, তিরষ্কারে ও অবশেষে উৎপীড়নে তিষ্টিতে না পাড়িয়া রজব আলী তার এক বছর-আগে-বিয়া-করা আদরের স্ত্রীকে তালাক দিয়া কাপড়ের খুঁটে মুখ মুছিতে-মুছিতে বাহির হইয়া গেল। কলিমনের ঘন-ঘন মুর্ছার মধ্যে অতিমাত্রায় ত্রস্ততার সঙ্গে শুভকার্য সমাধা হইয়া গেল’।

‘এমদাদ স্তম্ভিত হইয়া বর-বেশে সজ্জিত পীর সাহেবের দিকে চাহিয়া ছিল।        তার চোখ থেকে আগুন ঠিক্রাইয়া বাহির হইতে ছিল’।

‘এইবার তার চেতনা ফিরিয়া আসিল। সে এক লাফে বরাসনে-উপবিষ্ট পীর সাহেবের সম্পূখে উপস্থিত হইয়া তার মেহেদী-রঞ্চিত দাড়ি ধরিয়া হেচকা টান দিয়া বলিলঃ রে ভন্ড শয়তান নিজের পাপ-বাসনা পূর্ণ করিবার জন্য দুইটা তরুণ প্রাণ এমন দুঃখময় করিয়া দিতে তোর বুকে বাজিল না’?

হুজুর-কেবলারা আসে, আবার কালের পরিক্রমায় হারিয়েও যায়। রজব আলী আর কলিমনের ঘরও ভাঙ্গে। কিন্তু এমদাদদের প্রতিবাদও থেমে থাকেনা। যদিও এদের প্রতিবাদটা তত জোরালো হয় না। কিন্তু এমদাদরা ইতিহাস সৃষ্টি করে ইতিহাসের অংশই হয়ে যায়।

বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

এআই