বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ। এটা স্বাভাবিক কোনো রাজনৈতিক নেতাকে আটকে রাখা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চিরতরে নস্যাৎ করার একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর একবার হয়েছিল। স্বাধীনতার ঘোষক সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেছিল সেনাবাহিনীর একটি বিদেশী এজেন্ট চক্র। তখন দুঃসাহসী সৈনিক ও জনতা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিল। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবে জিয়াউর রহমানের মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শত্রুমুক্ত হয়। চল্লিশ বছরের মাথায় এসে বাংলাদেশ সেই একই চক্রান্তের মুখোমুখি।
বর্তমান বাংলাদেশের অন্ধকার পরিস্থিতি আমাদের সবার জানা। এটা কেবল ক্ষমতার লোভের অন্ধকার রাজনীতি নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলাদেশকে চিরতরে পঙ্গু করার বিশেষ পরিকল্পনা। বাংলাদেশী জাতিকে একটি নিষ্ক্রিয় জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার চক্রান্ত। এর অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র কেড়ে নেয়া হয়। এটি ছিল সেই ১৯৭৫ সালের স্মৃতির নতুন সংস্করণ। ভিন্ন আদলে যার ফলাফল দেখা যাচ্ছে আরও বিষময় এবং ধ্বংসাত্মক।
৫ জানুয়ারি প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের আগে ২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেটি ছিল গণতন্ত্র রক্ষার একটি কর্মসূচি। সেদিন বালুর ট্রাক দিয়ে গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়ার গতিপথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। তাকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রেখে গণতন্ত্র হত্যার মাধ্যমে একটি বিশেষ সরকার ক্ষমতা দখল করে। সেই সরকারের কাঠামো, কার্যক্রম এবং নষ্টামির বিষয়গুলো সবার জানা। এমনকি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং ওই বিশেষ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ৫ জানুয়ারি ক্ষমতা দখলের বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট হাস্যরস করেছেন। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নিলে কিছু সংসদ সদস্য এবং ক্ষমতার ভাগও দিতেন বলে তিনি মিডিয়ার সামনেই বলেছেন।
গণতন্ত্র হত্যা এবং একটি বিশেষ সরকারের অবৈধ ক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়েই সমালোচনা আছে। নতুন নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারেরও চাপের কথা শোনা যায়। এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনে থাকা নেত্রী ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য গত ৩১ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। কিন্তু বিশেষ সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। করবে কেন? এই বিশেষ সরকারের দর্শন এবং রোডম্যাপ তো ভিন্ন। তারা যে করেই হোক ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে নেপালের আদলে গড়ে তোলাই তাদের প্রধান লক্ষ্য; যার অনেকাংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বশেষ টাইম স্কেল হিসেবে ‘জানুয়ারি-২০১৫’ অতিক্রম করা দরকার। ‘জানুয়ারি টু মার্চ’কে ঝুঁকি মনে করছে বিশেষ এই সরকার। এই সময় অতিক্রম করতে পারলে ২০১৯ সাল, ২০২১ সাল, ২০২৫ সাল এবং ২০৪১ সালের যে রোডম্যাপ তারা করেছে, তা সহজেই বাস্তবায়ন সম্ভব বলেই তাদের বিশ্বাস। পরিকল্পনাটাও সেভাবেই নেয়া তাদের।
সেজন্যই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ৪ জানুয়ারি প্রথম প্রহরে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করা হয়। এর আগে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি আহমেদকে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবি নিয়ে নেয় ডিবি পুলিশ।
এই পরিস্থিতিতে কি করবে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি? বিএনপির কোটি কোটি নেতাকর্মীর ভূমিকা কি হবে? সিনিয়র নেতারা জাতিকে রক্ষার দায়িত্ব কী পালন করবেন? ২৮ ডিসেম্বরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির মতো তারা বিশেষ সরকারের ভয়ে মোবাইল বন্ধ রাখবেন, না-কি বীর জনতাকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে বিপ্লবে অংশ নেবেন।
নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানুষ এখন ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের অন্ধকার সময়ের চেয়েও গভীর সংকটে। তখন ষড়যন্ত্রকারীরা চক্রান্তের জন্য খুব বেশী সময় পায়নি। কিন্তু এবার ষড়যন্ত্রের শেকড় অনেক বেশী শক্ত। পঁচাত্তরের একাধিক দেশ-বিরোধী পক্ষ এখন জোটবদ্ধ। অবশ্য সেই সময়ের চেয়ে এখন বাংলাদেশের মানুষও অনেক বেশী সচেতন। ষড়যন্ত্রকারীরাও চিহ্নিত। কেবল বুলেটের সামনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের টেনে হিচড়ে নামাতে হবে।
পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর সাহসী সৈনিক ও জনতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে যেভাবে মুক্ত করেছিলেন, তেমিন একটি বিপ্লব এখন সময়ের দাবি। এ বিপ্লব বাংলাদেশ রক্ষার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার। এ বিপ্লব নাগরিকদের জীবন রক্ষার। এটা হতে হবে জনবিপ্লব। গণবিপ্লব। সব শ্রেণী-পেশার মানুষের বিপ্লব ছাড়া স্বাধীনতা রক্ষা করা যাবে না। অবৈধ এই বিশেষ সরকার চলতি জানুয়ারি পার করলে এ বিপ্লব অনেক বেশী কঠিন হয়ে পড়বে। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ক্ষমতা দখলকারী বাহিনীকে হটানোর এ বিপ্লব যত দ্রুত সম্ভব করতেই হবে। অন্যথায় ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদেরও দাঁড়াতে হবে। আসুন, আমরা ৭ নভেম্বরের নতুন সংস্করণে ৫ জানুয়ারি কিংবা ৭ জানুয়ারি গণবিপ্লবের ডাক দেই। স্বাধীন বাংলাদেশ রক্ষা করি। বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করি।
জাতি এবার জিয়াউর রহমানের কণ্ঠের মতোই নতুন একটি কণ্ঠ শুনতে চায়। সেই কণ্ঠ হবে জননন্দিত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কণ্ঠ। মুক্ত হবেন তিনি। গণমাধ্যমের সামনে এসে বলবেন, 'প্রিয় দেশবাসী। জাতি আজ সংকট মুক্ত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং অন্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত। ষড়যন্ত্রকারীরা পালাতে বাধ্য হয়েছে। আপনারা সবাই শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সর্বস্থানে অফিস, আদালত, যানবাহন, বিমান বন্দর, নৌবন্দর, কলকারখানাগুলি পূর্ণভাবে চালু থাকবে। আল্লাহ আপনাদের সকলের সহায় হোন। খোদা হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।'
লেখক: গবেষক ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক।
এআর





