ইসরাইলের সিকিউরিটি বাহিনী শিন বেটের সাবেক প্রধান ইয়ুভাল ডিসকিন (Yuval Diskin) জার্মান প্রভাবশালী সাময়িকী 'স্পাইজেল ( SPIEGEL)' এর সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন হামাস তিন সেটেলার অপহরণের সাথে সরাসরি জড়িত না। এমনকি হামাসের নেতারাও এ ঘটনায় প্রথম দিকে বেশ অবাক হন। কিন্ত ঘটনার সাথে সাথেই হামাস বিপদ বুঝতে পারে এবং তারা এবারে রকেট হামলা বন্ধের কোন চেষ্টা করে নি যেটা সাধারণত তারা অন্য সময়ে করে থাকে।
নেতানিয়াহু তাহলে কেন এই যুদ্ধে জড়ালেন ? সম্ভবত, নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে এই যুদ্ধ চান নি। রাইট উয়িং যুদ্ধবাজদের চাপে পড়ে তাকে আসতে হয়েছে। এটা পরিষ্কার যে, ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের মতই এ গ্রাউন্ড ইনভেশন ইসরাইলের জন্য একটা বড় ভুল ছিল।
তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং অবরোধের মুখে হামাসের জনপ্রিয়তা এমনিতেই কমে আসছিল বলে কিছু সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে। এছাড়া সিরিয়া ইস্যুতে ইরানের সাথে সম্পর্কের অবনতি এবং মিশরে ব্রাদারহুডের পতন হামাসের জন্য ছিল বড় বিপর্যয়। তারা নিজেদের ৪০ হাজারেরও বেশী সরকারি কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছিল না। এ অবস্থায় হামাস স্পষ্টতই ছিল দুর্বল এবং এ সংকট নিরসনে একেবারে মরিয়া । যে কোন মূল্যে তারা এ অবরোধের অবসান চাইছি এবং এ জন্যে অনেক ছাড় দিয়ে ঐক্যমতের সরকারে এসেছিল।
ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সে ঐক্যমতের সরকারকে স্বীকৃতি না দেয়া। এ সরকারে হামাসের প্রায় কেউ ছিল না। ইসরাইলের জন্য ভাল অবস্থান হতে পারত এ সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে অবরোধ কিছুটা শিথিল করা। এতে ইকোনমি একটু সচল হত এবং হামাসের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারত। এরপর ধীরে ধীরে মাহমুদ আব্বাসের সরকারকে প্রমোট করা। এটা না করে তিন সেটেলারকে অপহরণের উছিলায় নেতানিয়াহু হামলে পড়লেন গাজায়। উদ্দেশ্য ছিল একটা সহজ যুদ্ধ করে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে কিছুটা রাজনৈতিক ইমেজ উদ্ধার। এ যুদ্ধে হামাসের আর হারানোর কিছু ছিল না। মরিয়া হামাস আগেরবারের অপারেশন কাস্ট লিড থেকে কিছু কৌশলগত শিক্ষা নিয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে যেটি ইসরাইলের জন্য ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত।
ইতিমধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, এতে ইসরাইলের কৌশলগত পরাজয় হয়েছে যার সপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি রয়েছে-
প্রথমত, এবারের যুদ্ধে হামাসের রকেট হামলার কারণে ইসরাইলের একমাত্র আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে বিমান চলাচল কয়েকবার বন্ধ হয়ে যায়। এটাকে এক ধরনের সাময়িক ব্লকেড বলা যেতে পারে যেটা ইসরাইল এর আগে কখনো চিন্তাই করতে পারে নি। সাথে সাথে ইরান জানিয়েছে যে তারা হামসাকে যদিও অস্ত্র সরবরাহ করেনি তবে তারা রকেট বানানোর কৌশল দিয়ে সহায়তা করেছে। এত দূরপাল্লার রকেট হামলায় হামাসের সফলতা এর ইঙ্গিত বহন করে যেটা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি বলে মনে করে ইসরাইল। হামাস ইসরাইলের ভিতরে যে কোন জায়গায় আঘাত হানতে সক্ষম এটা তারই ইঙ্গিত।
দ্বিতীয়ত, কেবল নিহতের সংখ্যার বিচারে ইসরাইল এ যুদ্ধে কৌশলগত বিজয় অর্জন করতে পারবে না। কারণ আধুনিক সমরাস্ত্র এবং সামর্থ্যের বিচারে তারা অনেক অনেক শক্তিশালী এবং এটি একটি অসম যুদ্ধ। ইসরাইলের জয়ের জন্য একমাত্র প্যরামিটার হতে পারে হামাসের একটা বড় অংশকে হত্যা করা, তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টানেল এবং অস্ত্রাগার ধ্বংস করা। সম্ভবত এর কোনটিই এখন পর্যন্ত তারা খুব একটা সফলভাবে করতে পারে নি। ইসরাইল ইতিমধ্যেই ৩৫ সেনা হারিয়েছে যে সংখ্যা হামাসের সাথে আগের অন্য সব যুদ্ধের বিবেচনায় অনেক বেশী। আল-কাসসাম বিগ্রেডের দাবি অনুসারে তাদের হাতে ইসরাইলের এক জন সৈন্য বন্দীও আছে। এ দাবি সত্য হলে এটিও ইসরাইলের জন্য আরেকটি বড় কৌশলগত পরাজয় কেননা এর জন্য ইসরাইলকে উচ্চ মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
তৃতীয়ত, ইসরাইলের সাথে কিছুটা নরম সুরে থাকা মাহমুদ আব্বাসও হামাসের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। সাথে সাথে পশ্চিম তীরের অনেক মানুষ গাজার আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেছে যেটি গত অনেক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। হামাসের নেতা খালেদ মিশাল ইতিমধ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তৃতীয় ইন্তিফাদার ডাক দিয়েছেন।
চতুর্থত,নারী-শিশু সহ বেসামরিক লোক হত্যা, জাতিসংঘের স্থাপনায় হামলা এবং নিষিদ্ধ অস্ত্রের ব্যবহারের জন্য ইসরাইল অনেক দেশের সমালোচনার শিকার হয়েছে । আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরাইল ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন শিন বেটের সে সাবেক প্রধান ইয়ুভাল ডিসকিন এবং তিনি এর জন্য নেতানিয়াহুর আগাস্রী ভূমিকার সমালোচনা করেছেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কেবল হোটেল ব্যবসাতেই ইসরাইলের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১২৮ মিলিয়ন ডলার। অনেক দেশেই ইতিমধ্যে ইসরাইলি পণ্য বর্জন চলছে যেটি তাদের অর্থনীতিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন সে দেশের অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়াও আগের যে কোন সময়ের তুলনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় এ যুদ্ধের ভয়বহতা অনেক বেশী উঠে এসেছে। ইসরাইল স্পষ্টতই সোশ্যাল মিডিয়ার যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। আলজাজিরার, জরিপে দেখা যায় যে গাজার সমর্থনে টুইটারে টুইট করা লোকের সংখ্যা ইসরাইলের সমর্থনে টুইট করা লোকের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশী।
পঞ্চমত, ইসরাইলের দেয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মানতে হামাস অস্বীকার করছে। হামাস যুদ্ধবিরতির জন্য অবরোধ উঠিয়ে নেয়ার প্রশ্ন অনড় অবস্থান নিয়েছে। এর জন্য তারা আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গ্যারান্টি চেয়েছে যাতে চুক্তি সম্পাদিত হলে পরবর্তীতে তা পুরোপরি কার্যকর হয়। হামাস বলেছে প্রয়োজনে এর জন্য তারা আরও দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করতে এবং মুল্য পরিশোধ করতে রাজি আছে। 'দি টাইমস অব ইসরাইল' এর প্রকাশিত খবরে দেখা যায় যে, জন কেরি অবরোধ তুলে নেয়া সহ হামাসের অন্যান্য দাবি পূরণের ব্যপারে আশ্বাস দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে হামাস যাতে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় সে চেষ্টা করছেন।
কিছু দিন আগেও হামাস অনেক বেশী নাজুক ছিল এবং ইসরাইল অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এখন যুদ্ধের পর স্পষ্টতই হামাস সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। হামাসের মূল সফলতা সরকার পরিচালনায় না বরং ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে । ইসরাইল যদি হামাসের জনপ্রিয়তা কমাতে চায় তাদের জন্য সবচেয়ে ভাল কৌশল হল হামাসের সাথে যুদ্ধ না করে হামাসকে নিস্ক্রিয় করে রাখা। অথচ এ সময়ে ইসরাইল একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে লিপ্ত হল যখন যুদ্ধ ছাড়াও তাদের হাতে আরও ভাল বিকল্প ছিল।
শেষ পর্যন্ত হামাস যদি অবরোধ তুলে নেয়ার বদলে যুদ্ধবিরতিতে যায় সেটা হবে এ যুদ্ধে হামাসের স্পষ্ট বিজয় এবং ইসরাইলের কৌশলগত পরাজয়। এর জন্য নেতানিয়াহুকে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে হতে পারে। সম্ভবত, ইসরাইলের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং হামাসের প্রাণপণ লড়াই এ অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে ইসরাইলের কৌশলগত পরাজয়ের জন্য দায়ী।
তথ্যসূত্র: বিডিটুডে
জাহিদুল ইসলাম রাজন
শিক্ষার্থী, কে টি এইচ রয়েল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, স্টকহোম, সুইডেন





