টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্ত-আঞ্চলিক বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে।

বর্তমানে এই সহযোগিতার বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের জন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক কোন উদ্যোগ নাই।

তা ছাড়া বাংলাদেশকে আভ্যন্তরীণরাজস্ব আয় বৃদ্ধি ছাড়াউন্নতির কোন সহজ পথ খোলা নাই।

তাই দেশে আয় কর দাতা বৃদ্ধির সুপরিকল্পনাগ্রহণ করতে হবে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১১ লক্ষ মানুষ মাত্র আয়কর দাতা।এই পরিসংখ্যান খুবই নগণ্য।

এশিয়ার দেশ সমূহে দ্রুত উন্নতি ঘটে যাচ্ছে। এশিয়ার প্রায় সকল দেশের সমস্য একই রকম। তবে কিছু কিছু এশিয়ার দেশ উন্নত দেশে ইতিমধ্যে প্রবেশ করছে।

বাংলাদেশের মত কিছু দেশ এখনও উন্নত দেশ তো দূরের কথা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারেনি। বাংলাদেশসহ এই সকল দেশের উন্নতির সঙ্গে নীতির সমন্বয় প্রয়োজন।

টেকসই উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করে তা দীর্ঘ মেয়াদিকরার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে হলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ সমূহে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন।

আগামী দিনে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশ সমূহের মধ্যে কি ভাবে এই বিষয় আলোচনা হবে তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের অর্থনীতি অনেকটা তৈরি পোষাক শিল্পের রফতানি আয় ও প্রবাসীদের আয়ের উপর নির্ভরশীল এই দুটি খাত অর্থনীতি উত্থান- পতনের উপর নির্ভরশীল।

তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধুমাত্র এই দুইটি খাতের উপর সম্পূর্ণরুপে নির্ভর করা উচিত হবে না। আমাদের দেশের স্থায়ী উন্নতির জন্য আভ্যন্তরিন আয় বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি করা জরুরি।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে এখন ৫টি বড় প্রতিবন্ধতা রয়েছে। বাধাগুলো হচ্ছে:

১. অবকাঠামোগত দূর্বলতা ২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ঘাটতি ৩. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ৪ বাংলাদেশী পণ্যে আর্ন্তজাতিক ও অভ্যন্তরীণবাজারে চাহিদা কমে যাওয়া ৫. দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব।

এই সকল কারণে চলতি অর্থ বছওে ২০১৪- ২০১৫ অর্থ বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রায় চেয়ে কম হবে।

বর্তমান অর্থ বছরের জানুয়ারি ২০১৫ থেকে মার্চ, ২০১৫ পর্যালোচনা করলে এই বিষয় বেরিয়ে আসে।

চলতি অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের ( জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ৬ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে হবে।

ইতোমধ্যে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে আভাস দিয়েছে।

বাংলাদেশকে আগামী ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে হলে ব্যাপক হারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া কোন বিকল্প নাই।

আর ৬ষ্ঠ পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, সে জন্যও মোট বিনিয়োগের পরিমান জিডিপির বর্তমান ২৬-২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে চলতি ২০১৫ সালে সাড়ে ৩২ শতাংশে উন্নতি করতে হবে।

গ্যাস বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতির জন্য অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে করতে পারছে না। তাছাড়া রয়েছে দেশে রাজনৈতিক হরতাল, অবরোধ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগ ঘাটতি ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় শিল্প স্থাপনে জমি না পাওয়া নানামুখি সমস্যা রয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আলোচ্য জানুয়ারি- মার্চ প্রান্তিক কৃষি খাতসহ দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের কারণ রয়েছে।

উৎপাদন ভাল হওয়ার শর্তেও কৃষকেরা বাজারে ঠিকমত পণ্য বিক্রিয় করতে পারেনি। বাজারে পণ্যের মূল্য লাভজনক ভাবে বিক্রিয় করতে কৃষকেরা ব্যর্থ হয়েছে।

পণ্যের ন্যায্য মূল্য ও কৃষকেরা পাননি। নিমার্ণ খাতের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পরিবহন, হোটেল রেস্তোঁরা , কমিউনিটি সেন্টার ও সামাজিক সেবা, শিক্ষা, পাইকারী ও খুচরা ব্যবসাসহ গোটা সেবাখাতের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া দেশে পুজি বাজারে অস্থিরতা থাকায় বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকা সত্বেও জানূ: থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রান্তিকে কয়েকটি খাতে উন্নতি লাভ করেছে।

রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয় আগের বছরের জানূ: থেকে মার্চ এর তুলনায় ১ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আর অর্থ বছরের প্রথম নয় মাস হিসেবে রেমিট্যোন্স ৭ দশমিক ১৯ শতাংশে বেড়ে ১ হাজার ১২৫ কোটি ডলার ছাড়িছে।

এই পঞ্চ বাধাকে কি ভাবে আমরা আমাদের সমস্যা সমাধানের পথে অন্তরায় না করিয়ে সহজে কাবু করতে পারি সে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এক: অবকাঠামোগত দূর্বলতা: অবকাঠামোগত দূর্বলতা দূর করার জন্য আমাদেরকে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক দিনে বা রাতা রাতি অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার বেশ কিছু অবকঠামোগত উন্নয়নমূলক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়েছে।

সরকার আশা করছে নিদিষ্ট সময়ে পদ্মা সেতুতে গাড়ি চলতে পারবে। অন্য দিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম চার লেন রাস্তা নির্মাণের কাজ দ্রুত না হলেও চলছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকরণ কাজ তেমন একটা দৃশ্যমান হচ্ছে না।

গভীর সমুদ্র নির্মাণ অর্থনৈতিক বাণিজ্য বিকাশে গভীর ভূমিকা রাখবে। তাই গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মার্ণের কাজকে আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

দুই: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি আমাদের শিল্প বাণিজ্য বিকাশে সব চেয়ে বড় অন্তরায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতির জন্য বিগত ৭ বছর ধরে শিল্প স্থাপনের গতি একেবারই ঝিমিয়ে পড়েছে।

ঢাকা চট্টগ্রামে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে এখন চালু করতে পারেনি। নতুন শিল্প স্থাপনতো বিগত কয়েক বছর ধরে গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে।

অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধিও প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পড়ে রয়েছে। এই সকল শিল্প কারখানায় গ্যাসের প্রেসার বৃদ্ধির অনুমোদন দিতে পারলে উৎপাদন আয় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া কোন কঠিন ব্যাপার নয়।

তিন: আমাদের দেশে বিগত ৭ বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান। মাসে মাসে এই অস্থিরতা এমন রূপ লাভ করে , তখন সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড আমাদের বন্ধ হয়ে যায়।

রাজনৈতিক বিষয় গুলো দ্রুত রাজনৈতিক ভাবে মিমাংসা করা খুবই জরুরি। রাজনৈতিক স্থিতি যত দ্রুত দেশে ফিরে আসবে , তত দ্রুত দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধারা চালু থাকবে।

বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক মতানৈক্য বিরাজমান। এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আমাদের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে।

সরকার ও বিরোধী উভয় শক্তিকে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে হবে। দেশ আজ রাজনৈতিকভাবে দ্বিধা বিভক্ত। দ্বিধা বিভক্ত জাতি কোন দিন উন্নতি লাভ করতে পারে না।

দ্রুত রাজনৈতিক ঐক্য আমাদের প্রয়োজন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক প্রধান প্রধান বিষয় এক্যমত গঠন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

জোর করে শাসন, আর ঐক্যমতের শাসন অনেক পার্থক্য বিরাজমান। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা খুবই জরুরি।

চার: আমরা প্রতিদিন আমাদের উৎপাদিত পণ্যের আর্ন্তজাতিক ও আভ্যন্তরিন বাজার হারাচ্ছি। আমাদের নীতি ও কৌশলগত দূর্বলতার জন্য ব্যবসায়ীগণ তাদের উৎপাদনের মূল্য পাচ্ছে না।

বিদেশি বাজারের পণ্য আজ আমাদের আভ্যন্তরিণ বাজারে ভরপুর। ভারত, চায়না, মালয়শিয়া ও থাইল্যান্ড প্রভৃতি প্রতিবেশি দেশের পণ্যে আমাদের বাজার দখল।

আমাদের দেশের বড় বড় কোম্পানী গুলো এই সকল দেশের পণ্য বিক্রির জন্য বড় বড় শো-রুম খোলে বসে রয়েছে। তাই অনেক ক্ষেত্রেআমাদের দেশীয় পণ্যের বাজার হারাচ্ছে।

অন্য দিকে আমাদের পণ্য নানা বাধার কারণে ভারতসহ অনেক দেশে রপ্তানিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সকল টেরিপ ও নন টেরিপ বাধা অতিক্রমের জন্য সরকারকে আরও বেশি অগ্রিম ভ’মিকা পালন করতে হবে।

দেশীয় পণ্যকে নীতিগত প্রটেকশান না দিতে পারলে আমরা আমাদের অভ্যন্তরিন পণ্যের বাজার দ্রুত হারাতে থাকব।

পাঁচ: দেশে দূর্নীতি প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়ছে। সমাজের এমন কোন স্তর নেই দুর্নীতি নামক মাদক গ্রাস করেনি। দুর্নীতি মাদক আজ আমাদের সমাজকে একেবারে খেয়ে ফেলেছে।

এই দুটি বস্তু থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে আজ দুর্নীতি ভরপুর। ঘুষ বাণিজ্য যেন আজ আমাদের সমাজের সাধারণ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।

এক সময় সমাজে ঘুষখোরকে ঘৃণা করতো, ঘুষখোরের সঙ্গে মানুষ সামাজিক ভাবে আত্মীয়তা করতে ঘৃণা বোধ করত। আজ ঘুষখোর ব্যক্তিগণ যেন সমাজের সম্পদ।

সমাজে ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত ধনী ব্যক্তিগণ প্রভাবশালী। তাদের কদর বেশি। যারা সৎ, নিষ্ঠাবান তারা যেন সমাজের অপ্রয়োজনীয়। এই ধারণার পরিবর্তন আনতে হবে।

সৎ লোকের সম্মান সব চেয়ে বেশি থাকবে। ঘুষখোর ব্যক্তিদের আমরা ঘৃণা করবো। সমাজে তাদেরকে সম্মানের চোখে না দেখে , ক্ষতিকর দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

তখন সমাজের দৃষ্টি ভঙ্গিগত পরিবর্তন আসবে। তাই ঘুষকে 'না'বলতে হবে। ঘুষ কে ঘৃণা করতে হবে। স্কুল ,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সকল সকল শিক্ষা স্তরে ঘুষকে 'না'বলার শিক্ষা দিতে হবে।

তেমনি মাদককে আমাদের 'না'বলতে হবে। মাদক আমাদের দেশের তরুণ সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে। বিরাট একটি তরুণ সমাজ আজ মাদকে আক্রান্ত।

উচ্চ বিত্ত সমাজের তরুণ তরুণীগণ মাদকে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। দেশের আইন, বিচার বিভাগ ও পুরিশ প্রশাসনকে মাদকের বিরুদ্ধে আরও বেশি সোচ্ছার হতে হবে।

সকলে মাদককে 'না' বলে এগিয়ে আসতে হবে। মাদক ক্রেতা, বিক্রেতা ও এজেন্টদের জন্য কঠোর শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সমাজ থেকে মাদক নিমূল করতে হবে। তা না হলে আগামি প্রজম্ম আমাদেরকে দায়ী করবে। দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারময় হয়ে উঠবে।

সুশাসন আজ সকলের কাম্য। সুশাসন ছাড়া কোন ক্রমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সুশাসন ও আইনের শাসন কার্যকরি করতে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। কিন্তু জাতি এখনও সুশাসন ও আইনের শাসন কাঙ্খিত অর্জন দেখতে পাচ্ছে না।

ছয়: আগামী বাজেট অধিবেশন ১ জুন শুরু হচ্ছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী বিশাল বাজেট আসন্ন অধিবেশনে পেশ করবেন। বাজেট বাস্তবায়নে উল্লেখিত ৫ বাধা বড় অন্তরায়।

তাই বাজেট বক্তিৃতায় পাঁচ বাধা দূর করার জন্য একটি সুনিদিষ্ট প্রস্তাবনা থাকা দরকার। বাজেটে এই সকল বাধা দূও করার একটি সুনিদিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা , আর্থিক বরাদ্দ থাকা জরুরি।

আমরা আশা করি আসন্ন বাজেট ও মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তিৃতায় জাতির জন্য আগামী বছর গুলিতে সকল বাধা অতক্রম করে জাতি কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে আসবে।

লেখক: সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমএ, বিজেএমইএ

এসএইচ