তালাক শব্দটি শুনতে একটু কেমন বিশ্রী মনে হয় । তাই আমাদের সমাজে তালাকের বিপরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে কিছুটা শ্রুতিমধুর শব্দ ডিভোর্স (বিবাহ-বিচ্ছেদ) শব্দটি । ডিভোর্স শব্দটি শুনতে যতই মধুর হোক কিন্তু এর দ্বারা যা বোঝানো হয় তা মোটেই ভালো কাজ নয় । একেবারেই যে ভালো কাজ নয় তা বলারও সাধ্য নাই । ধর্মীয়, নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ডিভোর্সেরও বৈধতা রয়েছে । স্বামী যেমন স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারে তেমনি স্ত্রীও স্বামীকে ত্যাগ করতে পারে । তবে সকল ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট কতগুলো কারণ থাকতে হবে ।

স্বামী যদি নপুংশক, ব্যভিচারী, অত্যাচারী এবং মদ্যপ হয় তবে স্ত্রী ইচ্ছা করলে স্বামীকে ত্যাগ করতে পারবে । আবার স্ত্রীর ক্ষেত্রেও এমন কিছু দোষ রয়েছে যার কারণে স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারে । কিন্তু আমাদের সমাজে প্রত্যহ ডিভোর্সের সংখ্যাটা এত অধিক পরিমানে বেড়ে যাচ্ছে যা সুশৃঙ্খল পারিবারিক জীবনের জন্য প্রায় হুমকির হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

যেসকল অজুহাতে বিবাহ-বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে সেগুলোর বেশিরভাগ যৌক্তিক কোন কারণ নয় । বর্তমান সময়ে ঠুনকে ঠুনকো কারণে ডিভোর্সের ঘটনা ঘটছে । গত অর্ধযুগের হিসাবে দেখা যায়, দেশে ডিভোর্সের সংখ্যা ছাড়িয়েছে লাখের কোঠা । বিবাহ-বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিভিন্ন কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, অতি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মনো-মালিন্যের পরিণতিতেই ডিভোর্সের ঘটনা ঘটেছে বেশি । এছাড়া পরকীয়ার (স্বামী/স্ত্রী’র) ঘটনা ফাঁস হওয়াতেও অধিক সংখ্যক ডিভোর্সের ঘটনা ঘটেছে । আমাদের সামজে যে কারণগুলোতে বেশিরভাগ ডিভোর্সের ঘটনা ঘটে, তেমন কিছু কারণ উল্লেখ করার প্রয়াস-

* বিয়ে শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় । বরং বিয়ের মাধ্যমেই সূচিত হয় দু’টো পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তা । আমাদের সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের পরের দিন সকাল থেকেই স্ত্রীটি তার স্বামীকে এককভাবে দখল করে নিতে চায় । এ থেকে উদ্ভূত ঠুনকো ঠুনকো কারণে শুরু হয় ঝগড়া । কখনো তা গড়িয়ে পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি করে । শুরু হয় নানা জটিলতার ।

অথচ স্ত্রীটি মানতেই চায়না তার স্বামীটি একটি পরিবারে জন্ম নিয়েছে, সেখানের মানুষগুলোর প্রতি তার দায়বদ্ধতা রয়েছে । যখন স্ত্রী এককভঅবে স্বামীর সকল অধিকার শুধু নিজের জন্য বরাদ্দ করে নিতে চায় তখন খুব কম সম্পর্কেই টিকে থাকে । যদিও বা টিকে যায়, তারপরেও শুরু হয় দূরত্ব । সূচনা করে একক কিংবা অনু পরিবারের । স্ত্রীর মনে রাখা উচিত, নিকট ভবিষ্যতে স্বামীটি একান্তভাবেই তার হবে । হঠাৎ করে সম্পূর্ণভাবে কিছু পেতে চাওয়া ঠিক নয় । এতে বিপত্তির সম্ভাবনাই বেশি

* ডিভোর্সের জন্য পুরুষেরাও বহুলাংশে দায়ী । আমাদের সামজে এমন অধিক সংখ্যক পুরুষের দেখা মেলে, যারা ঘরে তাদের স্ত্রী রেখে নতুন কিছুর তালাশে দৌঁড়ায় । একটা সময় স্ত্রীর কাছে সে ধরাও পড়ে যায় । এর সূত্রপাত থেকেও ডিভোর্সের ঘটনা শুধু ঘটেই না বরং তখন ডিভোর্স অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায় ।

* পরকীয়ার কারণে অধিক সংখ্যক বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে । পরকীয়ার ক্ষেত্রে (স্বামী/স্ত্রী-উভয়ের) কে যে কার চেয়ে পিছিয়ে তার হিসাব আমার কাছে নাই । দাম্পত্য সম্পর্কের অধিকাংশের অশান্তির মূলে আজ পরকীয়াই প্রধান ক্রীড়ানকের ভূমিকা পালন করছে ।

* বিবাহ পূর্ব সময়কালীন প্রেম বিবাহ বিচ্ছেদের খাঁটি উপাদান হিসেবে কাজ করছে । একজন মানুষও হয়ত বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে, সে তার বিবাহপূর্ব জীবনে এক-আধখানা প্রেমে জড়ায়নি । বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমের পরিণতি বিবাহ পর্যন্ত গড়ায় না কেননা প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে । কিন্তু বিবাহের পর যখন ছেলে/মেয়ে বুঝতে পারে তার স্বামী/স্ত্রীর চেয়ে তার সাবেক প্রেমিক/প্রেমিকার গুণ অধিক ছিল তখন ভয়াবহ রকমের বিপত্তি ঘটে ।

আর এর পরিণতি তো আমাদের চারপাশেই দেখা যাচ্ছে । কাজেই আমি স্পষ্ট করে বলি, যদি কেউ সত্যিকারার্থের প্রেম করে তবে বিবাহের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এক্ষেত্রে অভিভাবকের সিদ্ধান্তের চেয়ে নিজের পছন্দের ওপর গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক । কেননা এমন কোন পিতা-মাতা নাই যারা সন্তানের দেয়া সাময়িক কষ্ট মনে রাখে কিংবা সন্তানকে স্থায়ী অভিশাপ দেয় । কিন্তু যখন পূর্ব প্রেমের কারণে কারো বৈবাহিক জীবনে ঘোর অমানিসা ভর করে তখন সে দহন সারা জীবন বহন করতে হয় । সন্তানের কষ্টে তখন পিতামাতাও কষ্ট পায়

* পারস্পরিক সন্দেহের কারণেও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বিবাহ-বিচ্ছেদ । স্বামী-স্ত্রীর পরস্পর পরস্পরের প্রতি অমূলক সন্দেহের জের ধরে সম্পর্ক ক্রমাগত তিক্ততার দিকে ধাবিত হয় । এবং এক সময় সন্দেহ বাতিক পাকাপাকিভাবে একজনের থেকে আরেকজনকে দূরে সরিয়ে দেয় ।

* ডিভোর্সের অন্যতম প্রধন কারণ পাত্র/পাত্রীর পরিবারের মধ্যে সঙ্গতি না থাকা । পাত্র-পাত্রীর মধ্যে যখন সামাজিক, অর্থনৈতিক মর্য্যাদার ব্যবধান যোজন যোজন হয় তখন সে ধরণের বেশিরভাগ সংসারে ভাঙ্গন ধরেই । বিশ্বাস না হলে, আশেপাশে অসম বর-কনের দিকে তাকান ।

* বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান পার্থক্য মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা । পুরুষেরা স্বীকার করুক না করুক-আজও অধিকাংশ পুরুষ তাদের দাদা/পরদাদাদের মানসিকতা আঁকড়ে রয়েছে । অনেকের ধারণা পুরুষ মানেই প্রভূ । নারীরা শিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার কারণে নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে । যেকারণে পুরুষেরা আজও নারীর প্রতি তাদের অযৌক্তিক কর্তৃত্ব বহাল রাখার মানসিকতা পোষণ করার কারণে পারস্পরিক সম্পর্কে ছেদ পড়ছে ।

* বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে হয় সম্বোধনও বিশেষ ভূমিকা রাখছে । যে সময়টাতে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে আপনি সম্বোধন করতেন তখন বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্য একেবারেই কম ছিল । কিন্তু যখন এটা তুমিতে নেমে এল তখন থেকেই ডিভোর্সের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে । যদিও তুমিবাদীরা মনে করেন আপনি থেকে তুমি’র সম্বোধন অধিক আপন মনে হয় । কিন্তু তারা ভুলে গেছে, আপনির পরের সম্বোধন হচ্ছে তুমি আর তুমির পরের ধাপের সম্বোধন হচ্ছে তুই । স্বামী-স্ত্রীর বেলায় কোন কারনে তুমির সম্পর্ক যদি তুইতে নেমে আসে তবে সেখানে গন্ডগোল লাগাটা কি অস্বাভাবিক কিছু ?

* পরস্পরকে সময় না দেওযার কারণেও বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটছে । এছাড়া, বিজ্ঞানের অপব্যবহার, চাহিদার অতিরিক্ততাসহ আরও কতগুলো কারণ বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করছে ।

আমরা পারস্পরিক সহাবস্থানের সমাজ গড়ে তুলতে চাই । চাই মিলেমিশে আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িয়ে থাকতে, জড়িয়ে রাখতে । যে কারণগুলোর কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে সেগুলোকে শনাক্ত করে সেগুলো ত্যাগ করা আমাদের দায়িত্ব এবং সময়ে দাবী ।

একটি পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সন্তানদের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি । এ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে দু’টো পরিবারের সুখ-দুঃখের অবস্থান । কাজেই সকল ধরণের উগ্রতা ত্যাগ করে চিরমধুর সম্পর্কে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা প্রত্যেক মানব সন্তানের দায়িত্ব । কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও শুধু সুন্দর আগামী দেখার জন্য সম্পর্কগুলো বেঁচে থাক যুগ-যুগান্তরজুড়ে ।

রাজু আহমেদ, কলামিস্ট।

ওএফ