বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধ দ্বিতীয় মাসে পা দিয়েছে। এর মধ্যে মাঝে দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচিও চলছে। বিভাগ ও জেলাওয়ারি পালাক্রমে হরতাল চলছে প্রায় প্রতিদিনই।
পুলিশ, র্যাব, বিজিবির সর্বশক্তি নিয়োগ করে রাজধানী ঢাকাকে অনেকটা 'কোরামিন' দিয়ে সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও আতঙ্কমুক্ত নয় কেউ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সর্বত্র সর্বদা নিরাপদ নন।
নিজেরা ঝুঁকিতে অনিরাপদ থেকে সাধারণ মানুষকে কিভাবে তাঁরা নিরাপত্তা দেবেন বোঝা যাচ্ছে না। অবরোধ শুরুর সেই প্রথম থেকেই রাজধানী ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে আন্দোলনকারীরা।
বলা চলে, তারা সফল। লীগ সরকার দলীয় শক্তির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাষ্ট্রশক্তিকে পরিপূর্ণ ও দৃষ্টিকটু ব্যবহার করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
সরকারের অতিকথক ও বাক্যবাগিশ মন্ত্রী-মিনিস্টার এবং বিভিন্ন আতিনেতা-পাতিনেতা গেল মাসের ১৫ তারিখে ঘোষণা করেছিলেন যে সাত দিনের মধ্যে সব 'ঠাণ্ডা' করে ফেলবেন তাঁরা, বিএনপির চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে দায়িত্বশীল অনেকেও সুর মিলিয়েছিলেন।
কিন্তু প্রায় চার সপ্তাহ গত হতে চলল সেই হুংকারের পর; পরিস্থিতি 'ঠাণ্ডা' বা নিয়ন্ত্রণ করা তো দূরের কথা, সংকট-সহিংসতা দিন দিন আরো বাড়ছে।
বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি একাদশ সংসদ নির্বাচন কবে হবে, একটার বদলে কয়টা লাশ পড়বে, টক শোওয়ালারা কিছু বোঝে কী বোঝে না- এসব রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে সোচ্চার, অন্যদিকে লীগ সরকার ও শাসক লীগের 'রাজনৈতিক' ব্যক্তিরা একের পর এক পুলিশি হুংকার দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সংকট উত্তরণে কারো কোনো কার্যকর ভূমিকা আছে বলে দৃশ্যত মনে হচ্ছে না।
৮ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত দুটি সংবাদ একদিকে খুব তাৎপর্যপূর্ণ, অন্যদিকে খুবই উদ্বেগজনক। একটি বক্তব্য লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রীর এবং অন্যটি পুলিশের মহাপরিদর্শকের।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে আছে সরকারের ব্যর্থতার স্বীকৃতি, আইজিপির বক্তব্যে আছে দায়িত্বশীলতার অভিব্যক্তি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, অবরোধ-হরতালে ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি মারাত্মক।
তিনি বলেছেন, 'চলমান হরতাল-অবরোধের প্রভাব রাজধানীতে তেমন একটা না পড়লেও ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।'
গত ৭ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে পূর্বনির্ধারিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। অন্যদিকে পুলিশের মহাপরিচালক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক রাত ৯টার পর মহাসড়কে দূরপাল্লার গাড়ি না চালাতে মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার বিকেলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের টেলিকম ভবনে বাস মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় একই সঙ্গে তিনি হরতাল-অবরোধে দিনে গাড়ি চালানোরও আহ্বান জানান। আইজিপি বলেন, 'হরতাল-অবরোধে দিনের তুলনায় রাতে বেশি সহিংসতা হচ্ছে।'
তিনি অবশ্য বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংবাদ দুটি প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে বাংলাদেশ প্রতিদিন ও আলোকিত বাংলাদেশে গত ৮ ফেব্রুয়ারি, রবিবার।
২০ দলীয় জোটের হরতাল-অবরোধের মধ্যে এ পর্যন্ত যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছে ৪৯ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের, বাকি ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬২ জন। এর মধ্যে ১১ জন ব্যবসায়ী, ১৭ জন চাকরিজীবী আর ১২ জন গাড়ির চালক ও সহকারী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ১২৩ জন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে আটজন।
এ ছাড়া আরো চার বার্ন ইউনিটের মধ্যে রাজশাহীতে ১৮ জন, চট্টগ্রামে আটজন, বগুড়ায় ১৮ জন ও রাজশাহীতে ভর্তি হয়েছে ৪০ জন। এদিকে এক রাতের নাশকতায় গাইবান্ধা ও গৌরনদীতে নিহত হয়েছে ১০ জন। গাইবান্ধায় নাশকতা ঘটে গত ৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাতে যাত্রীবাহী বাসে এবং গৌরনদীতে ৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। গাইবান্ধায় নিহত হয় সাতজন, গৌরনদীতে তিনজন। এই অমানবিকতা, নৃশংসতা কখন, কোথায় গিয়ে থামবে আমরা এখনো জানি না।
জাতীয় অর্থনৈতিক জীবন এর প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়ার দুর্ভাবনা এবং জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহতাই ফুটে উঠেছে অর্থমন্ত্রী ও আইজিপির ভাষ্যে। অর্থমন্ত্রী বলেই খালাস, সংকট থেকে উত্তরণের কোনো দিকনির্দেশনা দেননি বা দিতে পারেননি।
তবে তাঁর বক্তব্যে সরকারের অসহায়ত্ব স্পষ্টভাবেই ধরা পড়েছে। পুলিশের মহাপরিচালক রাত ৯টার পর মহাসড়কে গাড়ি না চালানোর আহ্বান জানিয়ে অবশ্যই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি সরকারি বাগাড়ম্বরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলতে পারতেন যে আপনারা গাড়ি চালান, আমরা আছি। কিন্তু তিনি তা করেননি, একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার মতোই তিনি গাড়ির মালিকদের সম্ভাব্য ক্ষতির কথা বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিয়েছেন।
সরকারের এখানে লুকোছাপা করার কিছু নেই যে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পেট্রলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে শুধু মানুষই মারা যাচ্ছে না, দেশের অর্থনীতিরও শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার মতো অবস্থা।
বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশের সব আর্থিক সেক্টর মিলিয়ে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কাবু করতে না পারলেও মাসাধিককালের অবরোধ-হরতাল এখন সেই সর্বনাশ করে ছাড়ছে।
বিজিএমইএর একজন নেতা বলেছেন, তাঁরা এখনো গত বছরের কার্যাদেশের বিপরীতে কাজ চালাচ্ছেন। নতুন কার্যাদেশের ক্ষেত্রে আগের গতি নেই। বিদেশি ক্রেতারা সংশয় প্রকাশ করছেন এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি গার্মেন্ট মালিকরা সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে পারবেন কি না?
তাই কার্যাদেশ দেওয়ার ব্যাপারে তাঁরা বারবার সময় নিচ্ছেন, পিছিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সময়মতো উৎপাদন ও সরবরাহ ক্ষমতা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে হাতের কাজ শেষ হওয়ার পর সব ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাবে।
ক্রয়াদেশের অভাবে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ থাকলে বন্ধ হয়ে যাবে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং বেকার হয়ে পড়বে লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক। সৃষ্টি হবে নতুন সামাজিক সমস্যা। শাকসবজি, তরিতরকারি, মাছ, মাংস- সব কিছুর দাম বাড়ছে সরবরাহের অভাবে। কৃষকের উৎপাদিত ফসল পচছে ক্ষেতেই। পুঁজির অভাবে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক উৎপাদনেই যেতে পারবে না।
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আটকে গেছে হরতালের কারণে। বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা বাতিল করে গত ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে নেওয়া হয়েছে। রবিবার থেকে আবারও চলছে ৭২ ঘণ্টার হরতাল।
আবার পিছিয়েছে পরীক্ষা। পাবলিক পরীক্ষা ও কোমলমতি পরীক্ষার্থীরা হয়ে গেছে জিম্মি। সরকারপক্ষ বলছে ছি ছি এমন কাজ কেউ করে? ছাত্রছাত্রীদের পাবলিক পরীক্ষার ব্যাপারেও কোনো ছাড় দিচ্ছে না বিএনপি-জামায়াত জোট। এ যেন সাত শ ইঁদুর মেরে বিড়াল তপস্বী ভাব।
কে না জানে যে ১৯৯৬ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা তৎকালীন খালেদা সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে দুই মাস পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন লীগ সরকার পরীক্ষা নিয়ে যেসব কথা বলছে, তখন বিএনপি সরকারও একই কথা বলেছে।
এখনো দুই পক্ষ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। সরকার চাচ্ছে এ ইস্যুতে বিএনপিকে পচিয়ে দিতে। হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহারে তাদের বাধ্য করতে আর বিএনপি ও তার সঙ্গীরা চাচ্ছে এ ইস্যুতে হলেও তাদের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করতে, সরকারের ওপর এ ব্যাপারে অভিভাবক এবং একটি নাগরিক চাপ সৃষ্টি করতে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কেউ পিছু হটছে না।
অবরোধ, হরতাল, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সংকট- বর্তমান জাতীয় সংকটের উপসর্গ। মূল অসুখ সারানো না গেলে একটার পর একটা উপসর্গ বাড়তে থাকবে। পরিত্রাণের পথ হচ্ছে মূল রোগের ডায়াগনসিস এবং সেই রোগের চিকিৎসা।
দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা ও বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা ইতিমধ্যেই রোগ নির্ণয় করেছেন এবং বলছেন যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটাই মূল অসুখ। তাঁরা বলছেন, সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদের প্রতি যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি।
কেউ কেউ এমনও বলছেন যে লীগ সরকার সংবিধানের সেই ধারাটির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। ৬৫(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, 'একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিনশত সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে (সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যগণ লইয়া সংসদ গঠিত হইবে; সদস্যগণ সংসদ সদস্য বলিয়া অভিহিত হইবেন।)'
পাঠক, আমরা জানি যে ৩০০ আসনের সংসদে ১৫৩ আসনে প্রত্যক্ষ কোনো নির্বাচনই হয়নি। তাঁরা সব অটো এমপি। ৫ জানুয়ারি বাকি যে ১৪৭ আসনে নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে কথা যত কম বলা যায় তত ভালো। নির্বাচনটি হয়েছে ক্ষমতাসীন লীগ সরকারের অধীনে।
বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের শরিকরা ছাড়া আরো অনেক দলই বলছে নির্বাচন হতে হবে একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে। সরকার তা মানেনি। সংবিধানের ৫৮(গ) অনুচ্ছেদে সর্বদলীয় মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের যে বিধানটি সংযোজিত ছিল, ইতিপূর্বে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে লীগ সরকার সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করে দিয়েছে।
প্যাঁচটা লেগেছে মূলত সেখান থেকেই। নির্দলীয় সরকারের দাবি তো মানাই হয়নি, উপরন্তু দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে ক্ষমতাসীনরা। প্রতিবাদে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি, বিকল্প ধারা, গণফোরাম, সিপিবি, জাসদ (রব), বাসদসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলই সে নির্বাচন বর্জন করেছে। সবাই বলছে, এই আসল ইস্যুটির প্রতিই নজর দেওয়া বেশি জরুরি।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মঈনুল ইসলাম বলেছেন, 'শেখ হাসিনাকে মনে রাখতে হবে যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি ও তাঁর দলের নেতারা নিয়ম রক্ষার দশম নির্বাচন হিসেবে অভিভূত করে ঘোষণা করেছিলেন যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বরে প্রদত্ত শেখ হাসিনার বক্তব্য ছিল হুবহু নিম্নরূপ : সমঝোতায় আসলে দশম সংসদ ভেঙে দিয়ে সংবিধান অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।...কিন্তু নির্বাচনের পর তাঁর ও তাঁর দলের নেতাদের কথার সুর পাল্টে গেল, ২০১৯ সাল পর্যন্ত মহাজোট সরকার নাকি ক্ষমতায় থাকবে।
এখন এক বছর পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যখন আলোচনা ২০১৯ সালের নির্বাচনের এত আগেভাগে শুরু করার কোনো যুক্তি নেই বলে ক্ষমতাসীন জোটের পক্ষ থেকে অনড় অবস্থান প্রকাশ করা হচ্ছে, তখন খালেদা জিয়ার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে তাকে অযৌক্তিক বলা যাবে কি?' একেবারেই পরিষ্কার; নির্ভুল রোগ নির্ণয়।
এখন দরকার চিকিৎসা। দেশের বিজ্ঞজনরা সুনির্দিষ্টভাবেই চিকিৎসা দিচ্ছেন। বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রগুলো এবং উন্নয়ন সহযোগীরা বলছেন একই কথা। আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী ঘরানার লোকজন ছাড়া দেশে-বিদেশে প্রায় সবাই একমত যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, শান্তি ও স্থিতির স্বার্থে দ্রুত একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জরুরি। এ জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে কার্যকর সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনরাও বলেছেন সংলাপের কথা।
শুধু আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনই নয়, তার পরও একটা টেকসই নির্বাচনী ও শাসনব্যবস্থার ব্যাপারেও ঐকমত্যে পৌঁছার কথা বলেছেন ড. কামাল হোসেন, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার শামসুল হুদা, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, শফি সামি, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ।
কিন্তু সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে লীগ সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা এবং শাসক লীগের নেতারা বলছেন, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনাই তাঁরা করবেন না। তাঁরা বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করে নিঃশেষ-নির্মূল করে দেওয়ার হুংকার দিচ্ছেন।
দেশ-বিদেশের সুস্থচিন্তার কোনো মানুষ এখনো বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে বিবেচনা করে না। বিএনপি প্রকৃত অর্থেই একটি নির্বাচনপন্থী ধর্মানুরাগী বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল।
গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সাংবিধানিক সব পথ একে একে রুদ্ধ করে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও সিনিয়র নেতাদেরসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে জেলে ঢুকিয়ে লাখো মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত করে খালেদা জিয়া ও তাঁর দলের সামনে অবরোধ-হরতাল ছাড়া আর কোনো বিকল্প কি খোলা রেখেছে সরকার?
তবে এটাও ঠিক যে অবরোধ-হরতালের ছাতার নিচে থেকে সহিংসতা-নাশকতা চালানো হচ্ছে। বিএনপি এই সহিংসতার দায় স্বীকার না করলেও নৈতিকতার মানদণ্ডে তা নাকচ হয়ে যায়। মানুষ সন্দেহ করে, বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দলের নেতাদের রক্ষা, বিচার বানচাল এবং দলের নিষিদ্ধকরণপ্রক্রিয়া বিঘ্নিত করার জন্য নাশকতায় জড়িয়ে গিয়ে থাকতে পারে। এসব ব্যাপারে জামায়াতের অতীত পরিচ্ছন্ন নয় মানুষের কাছে।
সরকার বিএনপি সম্পর্কে অনেক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে। মনে হয় ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি; কিন্তু এই ঘুরে দাঁড়ানো নিরীহ মানুষের রক্তের সিঁড়িতে পা দিয়ে হবে কেন? সহিংসতা-নাশকতা বন্ধে বিএনপিকে প্রকাশ্য উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে প্রমাণ করতে হবে দলের চেয়ারপারসন স্বীয় কণ্ঠে সন্ত্রাস-নাশকতার সঙ্গে বিএনপি জড়িত নয় বলে যে কথা বলেছেন, তা সঠিক।
দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সরকারকে বিএনপির সঙ্গে কথা বলতে হবে। যদি দুই তরফ থেকে একই সঙ্গে যুগপৎ সংলাপ শুরুর ও অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে, তাৎক্ষণিক বন্ধ হয়ে যাবে সব ধরনের সহিংসতা ও নাশকতা।
১৯৯৬ সালে এর আগে আমরা তা দেখেছি। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ও বিচারাধীনরা ছাড়া অন্য রাজবন্দিদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার এবং পাবলিক পরীক্ষা নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়ার অঙ্গীকারের মাধ্যমে বিএনপি যার যার সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে পারে।
৩৩-৩৪ দিনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের টানা অবরোধ-হরতালে এবং সরকারের দমন-দলনে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, জাতি এ পরিস্থিতির বোঝা আর বইতে অক্ষম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া যদি তা উপলব্ধি না করেন, জনগণ তখন তাঁদের বিকল্পের কথা ভাবলে দোষের কিছু হবে কি?
লেখক : সাংবাদিক
সূত্র: কালের কণ্ঠ
এমকে





