সম্প্রতি ঢাকায় নজিরবিহীন জলজটের পটভূমিতে নগরের নানা দুর্বলতার কথা আবার উঠে এসেছে। নগর প্রশাসন পরিচালনায় কেন্দ্রীয় সমন্বয় বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবই এর কারণ।
আমরা বহু আগেই বলেছি, ‘নগর সরকারই’ এর সমাধান। নানা কারণে ‘নগর সরকার’ কাঠামোর ওপর আস্থা আনতে রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের সময় লাগছে। একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর প্রবর্তন করা সহজ কাজ নয়। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি থাকাও স্বাভাবিক।
আমরা আশা করব, বর্তমান জলজট-বিধ্বস্ত রাজধানী ঢাকার পটভূমিতে সরকার ‘নগর সরকার’ সম্পর্কে ভাবনার সূচনা করবে এবং বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করবে। আমাদের আশপাশে বিভিন্ন দেশের বড় শহরে (দিল্লি, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, ম্যানিলা ও অন্যান্য) নগর সরকার কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা পাঠ করারও প্রয়োজন রয়েছে। আশা করি, সরকার অনতিবিলম্বে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করবে।
যত দিন আইনানুগভাবে নগর সরকার গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না, তত দিন ঢাকার প্রধান ১০টি (সংখ্যা বাড়তেও পারে) সেবাদানকারী সংস্থার কাজে সমন্বয় করার জন্য একটি ‘ঢাকা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। সম্প্রতি দুই মেয়র ও নগর বিশেষজ্ঞরাও এই প্রস্তাব দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বা মন্ত্রীর পদমর্যাদার অন্য একজন নির্বাচিত ব্যক্তিকে এই কমিটির প্রধান করা যেতে পারে। নির্বাচিত দুই মেয়র (নারায়ণগঞ্জ কি যুক্ত হবে?) কমিটির সহসভাপতি, ১০টি সেবা সংস্থার প্রধানদের সদস্য, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি ও নগর বিশেষজ্ঞকে ‘বিশেষ সদস্য’ করে এই কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব বা সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে এই কমিটির সদস্যসচিব মনোনীত করা যেতে পারে। তাঁর তত্ত্বাবধানে একটি ‘সমন্বয় অফিস’ থাকবে দাপ্তরিক কাজের জন্য।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এ রকম একটি ‘সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা যায়। প্রয়োজন হলে আইন মন্ত্রণালয় এর আইনগত ভিত্তি দেবে। যাতে মামলা করে এই কমিটির সিদ্ধান্তকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে না পারে।
শুধু কমিটি গঠন করলেই হবে না, কমিটির টিওআর (টার্মস অব রেফারেন্স) বা এজেন্ডা প্রণয়ন করাই হবে আসল কাজ।
আমাদের মতে এই কমিটির প্রধান কাজ হবে:
১. ঢাকা মহানগরের (আপাতত সিটি করপোরেশন এলাকা, তবে কর্ম-এলাকা আরও বাড়ানো যেতে পারে) প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা।
২. সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে একমত হওয়া (একমত হওয়া খুব সহজ নয়)।
৩. কমিটির সদস্যদের উদ্যোগে সম্মিলিতভাবে সমস্যার সমাধানগুলো বাস্তবায়ন করা। প্রতিটি সমস্যার সমাধান করতে কত দিন সময় ও কত বাজেট লাগতে পারে, তা সিদ্ধান্তের সঙ্গেই উল্লেখ থাকতে হবে। ওই বাজেট ও সময়ের মধ্যেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. বর্তমান অর্থবছরে বরাদ্দ বাজেটে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে অর্থমন্ত্রী বিশেষ বাজেট বরাদ্দ করবেন। কারণ, অনেক প্রকল্প বর্তমান অর্থবছরের পরিকল্পনায় নাও থাকতে পারে।
৫. কমিটি প্রতি ১৫ দিন অন্তর বৈঠক করে পূর্ববর্তী সভার কার্যবিবরণী অনুসরণ করে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
৬. প্রতি মাসের কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে হবে। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে বা বাধাগ্রস্ত হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সেখানে হস্তক্ষেপ করবে। ‘ঢাকা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি’র কাজ মনিটরিং করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবেন। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, এই কমিটির কোনো প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হতে পারবে না। বিলম্বিত হতে পারবে না।
৭. এই কমিটির সভায় প্রত্যেক সদস্যকে (প্রতিষ্ঠানপ্রধান) উপস্থিত হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তিকে কমিটির সভায় পাঠানোর সুযোগ থাকবে না। (সভাপতির বিশেষ অনুমতি ছাড়া)।
৮. প্রতি মাসে কমিটির কাজের অগ্রগতি নির্দিষ্ট তারিখে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জনগণকে জানাতে হবে। অগ্রগতি না হলেও তার কারণ জনগণকে জানাতে হবে।
৯. প্রথম পর্যায়ে এই কমিটির মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
আগেই বলেছি, কমিটি গঠন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কমিটির টিওআরও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক সময় সরকার মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য কমিটি গঠন করে। এই কমিটি যেন সেই কমিটি না হয়। কমিটিতে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা আমরা খুব জরুরি বলে মনে করি।
কোনো কোনো প্রকল্প চূড়ান্ত করার আগে কমিটির বাইরে ওই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বড় দলের সঙ্গেও মতবিনিময় করা যেতে পারে। তবে বিভিন্ন বিষয়ে সব বিশেষজ্ঞ একমত হতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে কমিটিকে একটি পদ্ধতি বের করতে হবে।
সরকারের কোন কোন সংস্থা এই সমন্বয় কমিটির সদস্য হতে পারে? আমাদের প্রস্তাব: দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, পূর্ত বিভাগ, রাজউক, মেট্রোপলিটন পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, সড়ক ও যোগাযোগ, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআরটিএ ইত্যাদি। চিন্তাশীল ব্যক্তিরা আরও কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করতে পারেন।
এই ‘সমন্বয় কমিটি’ কী কী সমস্যার সমাধান করবে? রাজধানী ঢাকায় সমস্যার অন্ত নেই। তবু আমরা প্রধান কয়েকটি সমস্যার কথা এখানে উল্লেখ করছি। যেমন: জলজট, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত হকারমুক্ত করা, হকারদের জন্য ভিন্ন স্থান নির্ধারণ বা পুনর্বাসন, পাবলিক টয়লেট স্থাপন, গণপরিবহন (বাস সার্ভিস) ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা ও রুট পুনর্বিন্যাস, বিভিন্ন স্থানে (যেখানে জায়গা পাওয়া যাবে) বহুতল পার্কিং ভবন নির্মাণ ও প্রধান সড়কে গাড়ি পার্কিং কড়াকড়িভাবে বন্ধ করে কাছাকাছি ভিন্ন পার্কিং এলাকা নির্ধারণ (প্রয়োজন হলে অনেক দূর হেঁটে পার্কিং এলাকায় যেতে হবে) এবং যানজট হ্রাস করতে প্রাইভেট গাড়ি চলাচলে ও রুট পারমিট প্রদানে কিছু নতুন নিয়ম চালু করা।
বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা শহরে আসা জনস্রোত ঠেকাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া, (ঢাকার লোকসংখ্যা কত দেখতে চাই) রিকশা ও বেবিট্যাক্সি (সিএনজি) পর্যায়ক্রমে ২০২০ সালের মধ্যে সব প্রধান সড়ক থেকে উঠিয়ে দেওয়া এবং আগ্রহী রিকশা ও অটোমালিকদের বাস বা মিনিবাস আমদানিতে বিশেষ ব্যাংক সুবিধা দেওয়া, এক বছরের মধ্যে ঢাকা শহর থেকে পুরোনো লক্কড়, আনফিট বাস, মিনিবাস উঠিয়ে দেওয়া এবং নতুন নিয়মের অধীনে বিভিন্ন রুটে বিভিন্ন রঙের নতুন ঝকঝকে বাস বা মিনিবাস চালু করার ব্যবস্থা নেওয়া।
নতুন বাস আমদানিকারকদের বিভিন্ন প্রণোদনা ও ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া, আগামী ৫০ বছরের জন্য ঢাকার একটি ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান তৈরি করা ও বাস্তবায়নে সরকারের কমিটমেন্ট দেওয়া, ঢাকা শহরের ট্রাফিক-ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, ট্রাফিক বাতির আধুনিকায়ন, আন্ডারপাস, ওভারপাস ইত্যাদি ব্যবস্থাকে কার্যকর করা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গের জন্য অর্থদণ্ডের ব্যবস্থা ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা রাখা।
আমরা মাত্র কয়েকটি কাজের কথা বলেছি। তবে কাজের তালিকা দীর্ঘ করার চেয়ে কম দায়িত্ব দিয়ে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হোক সরকারের লক্ষ্য।
এখানে যা লেখা হয়েছে, তা একেবারেই প্রাথমিক চিন্তা। আমরা যখন টাস্কফোর্স, সমন্বয় কমিটি বা কমিশনের কথা বলি, তখন অনেকের কাছে তার কোনো অবয়ব থাকে না। বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে কর্মমুখী কমিটি যেমন গঠন করা হয়, তেমনি নানা শৌখিন কমিটিও গঠন করা হয়।
সে জন্য আমাদের প্রস্তাবিত এই ‘সমন্বয় কমিটি’ কেমন হতে পারে, তার একটা প্রাথমিক রূপরেখা এই লেখার মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, নির্বাচিত মেয়র, সরকারি কর্মকর্তা ও নগর বিশেষজ্ঞরা এ রকম একটি কমিটির আরও কার্যকর কাঠামো ও কার্যকর টিওআর প্রস্তাব করতে পারবেন। এই লেখা তাঁদের ভাবনাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে, এটুকুই শুধু প্রত্যাশা।সূত্রঃপ্রথম আলো
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।
এমআর





