পিতা-মাতার অনুসরণেই নামাজে অভ্যস্ত হয়েছি। আর এ অভ্যাসটা যখন উত্তরাধিকার সূত্রেই, তাই নামাজটা অন্তত যথাসময়ে আদায় করার পেরেশানী থাকেই। একদিন সবে মাগরিবের নামাজ শেষ করেছি। এমন সময় বাড়ীর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ এলো। দরজায় আসতেই একজন অপরিচিত আগন্তকের সাথে দেখা হলো। তাকে কখনো দেখেছি বলে মনে হলো না। তার আপাদমস্তক ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। কিন্তু অতীতে তাকে কখনো দেখেছি বা কোনভাবে চিনি এমনটা মনে করতে পারলাম না।

ক্লিন সেভড, পাজামা-পাঞ্জাবী পরা লম্বা চুলের বেটে গোছের মানুষ। যাহোক অভ্যাসবশত আমিই তাকে সালাম দিলাম। উত্তর দেয়ার কোন শব্ধ আমার কানে এলো না। শুধু একটু মাথা নড়লো বলেই মনে হলো। কোন কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই তিনি ‘ ম’ আদাক্ষরের নাম এবং তিনি আমার একটি অতি পরিচিত কলেজে বাংলায় অধ্যাপনা করেন বলে জানালেন। বাংলা পড়ান আর আমি বাংলা পড়েছি, তাই দু’জনের মধ্যে বোঝাপড়াটা যে রকম হওয়ার কথা আসলে সেভাবে জমলো বলে মনে হলো না।

সবে নামাজ শেষ করেছি, আর মাথায় টুপি তখন পর্যন্ত আছে, এই বিষয়টিই বোধ হয় দু’জনের মধ্যে একটা বিস্তর ব্যবধান তৈরি করে ফেললো। যাহোক অধ্যাপক সাহেব তার আগমনের কারণ সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনায় যা বললেন তার সারমর্মটা হলো, তিনি লোক সাহিত্যের উপর একটি সংকলন তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। আর সে জন্য লোকসাহিত্যের উপর বিভিন্ন লেখকের গবেষণামূলক লেখা সংগ্রহ ও সম্পাদনার কাজ করছেন নিরলসভাবে।

উল্লেখ্য, আমার গবেষণার বিষয় ছিল ‘আঞ্চলিক লোকসাহিত্য’। এ বিষয়ে আমার কিছু গবেষণামূলক লেখা বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। বিষয়টি জনাব অধ্যাপকের গোচরীভূত হয় এবং তিনি অনেক কষ্ট করে আমার পরিচয় ও খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে আমার সাথে কথা বলতে এসেছেন জেনে তার প্রতি অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম এবং তার অনুরোধে আমার লেখাগুলোর পান্ডুলিপিও তার কাছে সরবরাহ করলাম।

কিন্তু উভয়ের মধ্যে বোঝা-পড়াটা ব্যাটে-বলে হলো বলে মনে হলো না। তিনি আমার মাথার টুপি এবং ‘ কদমফুলা’ দাড়ির দিকেই তীর্যক দৃষ্টি রাখছিলেন এবং মনে মনে ‘পাঁড় ধার্মিক’ হিসাবেই গালমন্দ করছিলেন বলেই মনে হলো। এক সময় তার বহিঃপ্রকাশও ঘটলো। তিনি আমার ধর্ম পালনের বিষয় নিয়ে তীর্যক সমালোচনা করতে শুরু করলেন এবং ‘কাঠ মোল্লা’ বলতেও কুন্ঠাবোধ করলেন না। আমি তার কাছে ‘ কাঠ মোল্লা’ ব্যাখ্যা জানতে চাইলাম বিনীতভাবে। প্রত্যুত্তরে তিনি যা জানালেন তাতে মনে হলো ‘কাঠ’ হলো বিরস জড়ো পদার্থ। তাই সরস এই পৃথিবীতে তা পুরোপুরি অচল।

আমি সবিনয়ে উত্তর দিয়ে বললাম, কাঠ তো আমাদের অনেক উপকারেই আসে। গৃহসজ্জার জন্যও তো কাজে লাগে। এমনকি কাঠ ছাড়া মানবজীবন তো একেবারে অচল। এতোক্ষণে তার গোমরা মুখে কিছুটা হলেও হাসির সঞ্চার হলো এবং হাসিমুখেই বললেন, এসবে শুধু সোভাবর্ধনই চলে কিন্তু কোন সৃজনশীল কাজে আসেনা। আর একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়জয়কারের মধ্যে একসব কাঠ মোল্লারা একেবারেরই অপাক্ততেয়। এরা উন্নয়ন, মুক্তচিন্তা ও প্রগতির শত্রু। বর্তমান সমাজে এরা শুধু অচলই নয় বরং উটকো বোঝা।

আমি আর কোনভাবেই নিজের হাসিটা ধরে রাখতে পারলাম না। অনেকটা কৌতুক করেই বললাম, এসব মোল্লারা তো এই সমাজেরই অংশ। তারাও মানুষ। মানবীয় সকল দোষ-গুণ তাদের মধ্যেও আছে। এমনকি তাদেরকে শেরোয়ানী পরে মাথায় পাগরী বেধে বিশেষ শোভাযাত্রা মধ্যমণি হিসাবেও দেখা যায়, শ্বশুরবাড়ীতেও তাদের আনাগোনা থাকে, আবার বাজারে তাদেরকে ‘ বেবী ফুড’ কিনতেও দেখা যায়।

তিনি এবার উচ্চস্বরে হেসে জবার দিলেন, ঐ কাজটায় এদের দ্বারা ভালভাবেই হয়। উৎপাদনটা বেশ ভাল। সমস্যা নেই। ভিক্ষা করে খাওয়াতে তো কোন সমস্যা হয় না। একজন অধ্যাপকের সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণী নিয়ে এমন তীর্যক ও অনাকাঙ্খিত মন্তব্যে বিস্মিত হলাম । এখন কী বলা উচিত, আর কী বলা উচিত নয়, তা ঠাহর করতে পারলাম না। আমি তার সামনে ঠাঁই দাঁড়িলে রইলাম।

তিনি আমাকে উপদেশ খয়রাত করে যা বললেন তার সারকথা হলো ধর্মই হচ্ছে পৃথিবীতে সকল অনাসৃষ্টি, অনাচার ও অধর্মের মূল। তাই পৃথিবীটাকে কিছু দিতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে ধর্মতাত্ত্বিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি আমার লেখার কখনো ভূয়সী প্রশংসা ও কখনো তীর্ষক সমালোচনাও করলেন।

তিনি আমাকে ধর্মচর্চার পরিবর্তে মূল্যবোধের চর্চা করার পরামর্শ দিয়ে বললেন, ধর্মীয় গোঁড়ামীর মধ্যে মানুষের জন্য ভাল কিছু করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যারা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত তাদেরকে ভাল কিছু করতে হলে ধর্মতাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণা বাদ দিয়ে বেশী বেশী মূল্যবোধের চর্চা করতে হবে। তার সাথে এই বিষয় নিয়ে বিতর্কে জড়িত হওয়ার চেয়ে নিরব থাকাটায় শ্রেয়তর মনে করলাম।

তখনো এক সপ্তাহই হয়নি। খবরের কাগজে চোখ বুলোতেই একেবারে হতচকিত হয়ে পড়লাম। শিরোনাম হলো ‘ কেন্দ্রের বাইরে উত্তর পত্র লেখার সময় শিক্ষক আটক’ । ক্যাপশনে পিঠমোড়া দিয়ে হাত বাঁধা শিক্ষকের ছবি। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে ঘটনা স্থল থেকে তাকেসহ আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

আমার ‘ ম’ আদাক্ষরের সেই সেই গবেষক বাংলা সাহিত্যের শিক্ষককে চিনতে কোন

সমস্যা হলো না। ...................শিক্ষকেরমূল্যবোধবলেকথা !!!! (ফেসবুক থেকে সংগৃহিত)

বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।