কি দেখার কথা কি দেখছি? কি শুনার কথা কি শুনছি? কি ভাবার কথা কি ভাবছি? ৪৫ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি।
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা। কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে,বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসন্মানে সদা দুতে-ভাতে।
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে, সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে, সমান সুখের ভাগ সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।
আজ কোথায় আমার সেই প্রাণের পতাকা? আজ কোথায় আমার সেই প্রাণের স্বাধীনতা? আজ কোথায় আমার সেই শান্তি প্রিয় মাতৃভূমি? আমার সুখের স্বপ্নগুলো কেন আজ তাড়িয়ে বেড়ায় আমার নিজেকে? আজ কেন আমার দেশের মানুষ অনাহারে দিন কাটায়?
বাঙ্গালী জাতীর ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখবো প্রাচিন বাঙালি জাতি হল বঙ্গদেশ অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বসবাসকারী মানব সম্প্রদায়, যাদের ইতিহাস অন্ততঃ চার হাজার বছর পুরোনো।
এদের মাতৃভাষা বাংলা। এই নৃগোষ্ঠীর সর্বাধিক ঘনত্ব দেখা যায় বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে।
বাঙ্গালি জাতি প্রাচিন যুগ, মধ্যুযুগ পার করে বাংলার নবজাগরনের সূচনা ঘটানোর প্রাক্বালে হানা দেয় ইষ্ট-ইন্ডিয়া নামক এক হায়েনা।
তথাপি ইংরেজদের শাসনের মধ্যদিয়ে অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের জোয়ারের ফলে বহু কৃতি মনিষীর আবির্ভাব ঘটে।
মুলতঃ রাজা রামমোহন রায়ের(১৭৭৫-১৮৩৩) সময় এই নব জাগরণের শুরু এবং এর শেষ ধরা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সময়ে, যদিও এর পরেও বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ এই সৃজনশীলতা ও শিক্ষাদীক্ষার জোয়ারের বিভিন্ন ধারার ধারক ও বাহক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন।
ঊনবিংশ শতকের বাংলা ছিল সমাজ সংস্কার, ধর্মীয় দর্শনচিন্তা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, দেশপ্রেম, ও বিজ্ঞানের পথিকৃৎদের এক অন্যন্য সমাহার যা মধ্যয্যগের যুগান্তর ঘটিয়ে এদেশে আধুনিক যুগের সূচনা করে।

আধুনিক যুগের শুরুতেই বাঙালিরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে খুবই মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। বাঙ্গালি মুসলমানরা সর্বপ্রথম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সচূনা করে।
১৭৬০ খৃস্টাব্দে চট্টগ্রামে এবং ১৭৬৫ খৃস্টাব্দে বাংলার দেওয়ানি লাভের সাথে শাসন ক্ষমতাও তারা কুক্ষিগত করতে অগ্রসর হয়। পলাশীর যুদ্ধের পর এই রাজনৈতিক পট পরিবর্তন জনমনে বিশেষ রেখাপাত করেনি।
দেরিতে হলেও এদেশীয়রা ইংরেজদের অভিসন্ধি যখন বুঝতে পারলো, তখনই তারা রাজস্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ইংরেজদের দেওয়ানি রাজস্ব দিতে প্রথম অস্বীকৃতি জানায় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠী। এরই ধারাবহিকতায় দিনে দিনে ইংরেজদের শাসনের প্রতি এদেশের মানুষের আস্থার জায়গাটা বিনষ্ট হয়ে যায় অবশেষে ভারত মহাদেশ স্বাধিনতা লাভ করে।
আবির্ভাব হয় ভারত-পাকিস্তান নামক দুটি দেশের। আবারো বাঙ্গালিদের শাসনের নামে শোষণ ও নির্যাতন সইতে সইতে ১৯৭১ এর দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের পথচলা। সে এক বিভীষিকাময় চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের এই বাঙ্গালি জাতি।
"জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উল্ঙ্গ শিশুর মত বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে, মিছিলে মিছিলে তুমি বেঁচে থাকো, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তোমার হা-করা মুখে প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি হরতাল ছিল একদিন, ছিল ধর্মঘট, ছিলো কারখানার ধুলো"
তাহলে আজ কি আমরা মুক্ত? আমরা স্বাধীন? এই প্রশ্ন থেকে থেকে গুমরে উঠে জোর শব্দ করে মনের ঘহিনে। আর মনের অজান্তেই জানতে ইচ্ছে করে সেই সব শহীদদের কাছে।

তোমরা বুঝি এই বাংলাদেশের জন্যই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সম্মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে নিজের জীবন বাজি রেখে, করেছিলে যুদ্ধ । জীবনটাকে এ জাতির জন্য উৎসর্গ করে ছিনিয়ে এনেছিলে সেই সংগ্রামি স্বাধীনতা।
তাহলে আজ কি দেখার কথা কি দেখছি, কি শুনার কথা কি শুনছি? ৪৫ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি।
স্বাধীনতা কি নিরিহ লোকের অকারণে প্রাণ দণ্ড? সাধীনতা কি পানির ট্যাঙ্কে গলিত লাশের গন্ধ? সাধীনতা কি হরতাল ডেকে জীবন করা স্তব্দ? সাধীনতা কি ক্ষমতা হরণে চলে বন্দুক যুদ্ধ?
স্বাধীনতা কি সন্ত্রাসীদের হাতে মরণাস্ত্রের গর্জন? স্বাধীনতা কি অর্থের লোভে বিবেক বিষর্জন? আজ নেই বর্গি, নেই ইংরেজ নেই পাকিস্তানি হানাদার।
আজ তবু কেন আমার মনে শূন্যতা আর হাহাকার। আজ তবে কি লাখো শহীদের রক্ত যাবে বৃথা, আজ তবে কি ভুলতে বসেছি স্বাধীনতার ইতি কথা।
তবু আমি স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নে বাঁধি ঘর, আমার স্বপ্ন হবে সত্য, তাই স্বপ্নে বাঁধি সুর। তোমার আমার স্বপ্ন যেনো একি সুরা-সুর।
হে স্বাধীনতা তুমি এগিয়ে চল, অশুভ শক্তির রাহু গ্রাস ছিঁড়ে মাথা উঁচু করে তোল।
[বি. দ্র.- মতামত লেখকের একান্ত নিজেস্ব, টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সস্পর্ক নেই। ]
এসএম





