বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ১৯৯৬ সালে এর শুরু হয়ে এখন দুর্নীতি এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে।
ছাত্রদের টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের দলীয় নেতা ও নেতৃস্থানীয় কর্মী এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা দুর্নীতি অবাধে চালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা বোধ করে না।
কারণ সরকারের উচ্চতম পর্যায়ে এই দুর্নীতির বর্ষণ হয় এবং সরকার ও তার পুলিশ দুর্নীতির বিরোধিতা না করে তার প্রশ্রয়দাতা হিসেবেই কাজ করে। দুর্নীতির ধরন এক রকম নয়।
আওয়ামী ঘরানার শিল্পী, বুদ্ধিজীবী থেকে নিয়ে তাদের দলের লোকজন শুধু যে দুর্নীতিকে অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপকতা দিয়েছে তাই নয়। কত রকম উপায়ে দুর্নীতি করা যায় সেটাও তারা দেখিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়টি এদেশের মানুষের এত ভালোভাবে জানা যে, এ নিয়ে কোনো বিস্তারিত বিবরণের প্রয়োজন নেই।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক স্থানীয় সরকার ও সমবায়মন্ত্রী, পরবর্তী সময়ে দফতরবিহীন হওয়ার কয়েকদিন পর জনপ্রশাসনমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ধানমণ্ডিতে তাদের এক অফিসে ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের এক সভা আহ্বান করেন।
সেই সভায় বর্তমান সরকারের এক মহাদুর্নীতিবাজ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়া (এদের নাম নিতেও ঘৃণা হয়) বলেন যে, আগামী ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের মৃত্যুদিবস উপলক্ষে ঢাকায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে শোকসভার যে নানা অনুষ্ঠান হবে তার খরচের জন্য চাঁদাবাজি করতে হবে এবং তা বন্ধ করা যাবে না। বন্ধ করলে অর্থের অভাবে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না (ডেইলী স্টার, ২১.০৭.২০১৫)।
শেখ মুজিবের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ৪০ দিনব্যাপী শোক প্রকাশ কর্মসূচি পালনের উদ্দেশ্যে আহূত সেই সভায় ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়া বলেন, ‘এতদিন ধরে যেভাবে শোক দিবস পালন হয়ে আসছে, এবারও তাই করতে হবে। কর্মসূচির জন্য চাঁদা না তুললে কর্মীরা টাকা পাবে কোথায় (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৪.০৭.২০১৫)।
তাদের হিসাব মতো প্রত্যেক সিটি ওয়ার্ডে শোক কর্মসূচির জন্য একদিনে খরচ হয় ১০ লাখ টাকা। ঢাকায় ওয়ার্ডের সংখ্যা ১০৩। এই হিসাবে ৪০ দিন শোক দিবস কর্মসূচিতে কী পরিমাণ খরচ শুধু ঢাকাতেই হবে তার হিসাব নিলে সেটা দাঁড়াবে কোটি কোটি টাকায়।
এই টাকা ব্যাপক চাঁদাবাজি, জুলুম, দুর্নীতির মাধ্যমেই প্রত্যেক বছরে তোলা হয়। এবারও সেভাবেই টাকা তুলতে হবে বলে মন্ত্রী মায়ার দাবির বিরোধিতা করেন আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা।
তারা বলেন, এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নীতি হচ্ছে ‘জিরো টলারেন্স’! কাজেই শেখ মুজিবের মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি উপলক্ষে কোনো চাঁদাবাজি করা যাবে না।
কিন্তু এই সাধু প্রস্তাব কীভাবে কার্যকর করা যাবে এ বিষয়ে তারা নির্দিষ্টভাবে কিছুই বলেননি। অর্থাৎ চাঁদাবাজি না হলে টাকা কোথা থেকে আসবে এ বিষয়ে তারা কিছুই বলেননি।
টাকা কোথা থেকে আসবে এই সমস্যার সমাধান না করে ৪০ দিন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত যে ‘জিরো টলারেন্সে’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় তা বলাই বাহুল্য।
কাজেই আনুষ্ঠানিক ‘জিরো টলারেন্সে’র সঙ্গে ৪০ দিন বা ১ দিনেরও কর্মসূচি চাঁদাবাজি ছাড়া পালনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
কারণ টাকার অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকলে স্থানীয়ভাবে শুধু ঢাকাতেই নয়, কোনো জায়গাতেই চাঁদাবাজি ছাড়া তাদের শোক কর্মসূচি পালন সম্ভব নয়।
ফ্যাসিবাদের একটা চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিথ্যা প্রচার করে তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা। ফ্যাসিস্ট দল ও ফ্যাসিস্ট সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ মিথ্যা প্রচারে একেবারে সিদ্ধহস্ত।
‘জিরো টলারেন্সে’র কথা বিভিন্ন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন; কিন্তু তিনি একথা যতই বলেন এক্ষেত্রে তাদের ‘টলারেন্স’ ততই বেশি দেখা যায়!
আগামী ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের মৃত্যুদিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের ৪০ দিনের কর্মসূচি যে চাঁদাবাজির ব্যাপারে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’কে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই হবে এটা সবারই জানা।
দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রী মায়ার এখন জেলে থাকার কথা। কিন্তু মায়া যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের একজন, সে কারণে তিনি জেলের বাইরে! দুর্নীতির জন্য তার কুখ্যাতির শেষ নেই।
কাজেই দলের বৈঠকে বসে বৈঠকী আলোচনায় চাঁদাবাজির বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্সে’র কথা বলা হলেও মায়ার একথা ভালো করেই জানা আছে যে, এসব হল একেবারে দেঁদো বা ফাঁকা কথা।
বেপরোয়া চাঁদাবাজি তারা বরাবর করে এসেছেন এবং এখনও করবেন। এতে বাধা দেয়ার কেউ নেই। এর একটা বড় কারণ যারা এই ‘জিরো টলারেন্সে’র কথা বলছেন, তারা নিজেরাও বড় মাপের দুর্নীতিবাজ!
দুর্নীতি এখন বাংলাদেশে এত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মী, ছাত্রনেতা থেকে নিয়ে তাদের সঙ্গে যে কোনোভাবে, এমনকি সামান্য সম্পর্কিত লোকজনও এখন সুযোগমতো চরমভাবে দুর্নীতি করছে। দুর্নীতি ও দস্যুতার মাধ্যমেই বাংলাদেশে এখন লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি বলা দরকার তা হল, শেখ মুজিবের জন্ম-মৃত্যু দিবস যেভাবে আওয়ামী লীগ পালন করছে, তার সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
শেখ হাসিনার কৃপা লাভের জন্য উচ্চপর্যায়ের নেতারা শোক প্রকাশ করেন এবং বিশাল আকারে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে শোক দিবস পালন করা হয়।
এবারও আওয়ামী লীগের হাস্যকর ‘জিরো টলারেন্স’ সত্ত্বেও তা-ই হবে। সরকারি ক্ষমতার জোরেই এসব করা হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার যখন থাকবে না তখন এই শোক দিবস পালনের কী অবস্থা হবে বর্তমানে যেভাবে আওয়ামী লীগ শোক দিবস পালন করে, এটা কোনো শোকের ব্যাপার নয়!
এটা হল চাঁদাবাজির মাধ্যমে লুটপাটের এক সুযোগ এবং বাস্তবত দুর্নীতিবাজদের এক উৎসবের ব্যাপার!! এই কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্নও বটে। কাজেই জাঁকজমক সত্ত্বেও এর মধ্যে আওয়ামী লীগের করুণ অবস্থার পরিচয় বেশ স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়।
আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও মিথ্যাচারের আর এক দৃষ্টান্ত হল, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য এবং সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত।
২০ জুলাই সদ্যনিযুক্ত জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার প্রশাসনের দলীয়করণে বিশ্বাস করে না! তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সরকারি কর্মচারীরা যেখানেই কর্মরত থাকুন, তারা যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করবেন!’ (ডেইলী স্টার, ২০.০৭.২০১৫)।
তিনি সরকারি কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশ দেন যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার!! এর থেকে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার কীভাবে, কত নগ্নভাবে প্রশাসনের দলীয়করণ করে এসেছে এবং এই মুহূর্তেও করছে এটা সবারই জানা।
এটা এক খোলামেলা ব্যাপার। সেই সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বলছেন আওয়ামী লীগ প্রশাসনের দলীয়করণের বিরুদ্ধে!! তার নেত্রী শেখ হাসিনাও সভা-সমিতিতে প্রায়ই একথা বলে থাকেন, অথচ এ মুহূর্তেও প্রশাসনে নিজেদের দুর্নীতিবাজ দলীয় আমলা-কর্মচারীদের আইনের আওতা থেকে রক্ষা করার জন্য তারা ব্যবস্থা করছেন।
তাদের প্রণীত ঢ়ঁনষরপঝবৎারপবঅপঃ ২০১৫ অনুযায়ী দুর্নীতি বা অন্য কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করার আগে আইন প্রয়োগকারীদের সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।
সাধারণ নাগরিকদের থেকে সরকারি আমলা-কর্মচারীদের জন্য এই পৃথক ব্যবস্থা তাদের আইনের আওতার বাইরে রাখারই উপায় ছাড়া আর কিছু নয়।
আমলা-কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি এমনিতেই ব্যাপক, তার ওপর এখন তাদের জন্য এই রক্ষা ব্যবস্থা যে তাদের দুর্নীতিকে আরও ব্যাপক ও বেপরোয়া করবে এতে সন্দেহ নেই।
দলীয় আমলাদের রক্ষায় এর থেকে বড় আইনি ব্যবস্থা আর কী হতে পারে অথচ যারা এ কাজ করলেন তারাই অহরহ বলে চলেছেন দুর্নীতির ক্ষেত্রে তাদের ‘জিরো টলারেন্সে’র কথা!!!
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
এমকে





