প্রতিনিয়তই আমাদের মধ্যে নতুন নতুন সংস্কৃতি প্রবেশ করছে। বিদেশী সভ্যতার দ্বারা আমরা প্রভাবিত হচ্ছি। নীরবে স্বীয় সভ্যতা-সংস্কৃতিকে কুরবানি দিচ্ছি। ভুল করেও ভাবতে পারছিনা নিজ সভ্যতা সংস্কৃতির প্রতি অবহেলার পরিণতি। গুড নাইটে ঘুম শুরু আর সকালে গুড মর্নিং শুনে ঘুম ভাঙ্গে আমাদের তরুণ প্রজন্মের। সকালের নাস্তাটাও হয় হিন্দী বা ইংলিশ গানের সুরে।

গোসলখানাকে আমারা বানিয়েছি ওয়াশরুম। দুপুরের খাবার এখন লান্স হয়ে গেছে। ডিনার করছো নাকি? প্রিয় জনকে এমন প্রশ্ন করে ভাবতে থাকি আমি মোটামুটি ইংরেজি বলতে পারি। এভাবে আমাদের প্রতিদিনের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে আমরা অহরহ বিদেশী শব্দ ব্যবহার করি।

আমরা কি আপনা আপনি নিজের ভেতর থেকেই এই বিদেশী শব্দ ব্যবহার করছি? না কি কেউ আমাদের বলার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করছে। আর আমরা নির্বোধের মতো নিজেকে সঁপে দিচ্ছি। বিনিময়ে কি পাচ্ছি তা একটু পরে বলছি। আসুন আগে কে বা কিসে আমাদের বিদেশী শব্দ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছে সেটা বের করার চেষ্টা করি।

মানুষ বই পড়ে সংস্কৃতিকে যতটা গ্রহণ করতে না পারে তার চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণ করতে পারে স্বচিত্র সংস্কৃতি দেখে। আমরা বিদেশী গণমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার সভ্যতা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে থাকি। এতে আমরা নিজের মনের অগচরেই সেটাকে গ্রহণ করে বসি। তার প্রমাণ প্রতিটি মানুষ খুব সহজেই পেতে পারে।

যখনই বাস্তব জীবনের কোন ঘটনা আমার দেখা কনো ঘটনার সাথে মিলে যেতে বসে, তখনই আমি সেই ঘটনায় নিজের অজান্তেই আমার দেখে উক্তিটি ব্যবহার করে বসি। আমি আগে বলতাম “দয়াকরে আমাকে বিশ্বাস করুন”। একদিন একটি বাংলা নাটক দেখছিলাম। ঘটনাচক্রে নায়িকা নায়ককে বলছে “প্লিজ বিলিভ মি”। এর পর থেকেই “আমাকে বিশ্বাস করুন” কথাটি বলার পরিবেশ সৃষ্টি হলে “বিলিভ মি” এসে মনের দরজায় হাজির হয়। মাঝে মাঝে বলেই ফেলি।

আসলে আমাদের শেখার সুযোগ করে দেবেন আর তা বলার বা করার সুযোগ কর দেবেন না তা হয় না। টিভি চালু করলেই বিদেশী চ্যানেলের জালায় দেশি চ্যানেল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বিশেষত ভারতের চ্যানেল।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। ঢাকা কমার্স কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর একটি ভিডিও গণমাধ্যমে ব্যাপক সারা ফেলে। ভিডিও টিতে দেখা যাচ্ছে, একটি মেয়েকে একটি ছেলে প্রেমের প্রস্তাব করছে। চার পাশে বন্ধুরা তাদের দু’জনকে ঘিরে আছে। ঘটনাটি খোলা রাস্তায়। আশপাশ দিয়ে লোকজন চলাফেরা করছে। এক পর্যায়ে মেয়েটি ছেলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছে। আর অন্য বন্ধুরা এই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করেছে। পরে ভিডিও টি কলেজ প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হলে উক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

এতে প্রমাণ করে যে এই নিয়ম-নীতি আমাদের সমাজ অনুমোদন করে না। আমাদের বিবেক এটাকে গ্রহণ করে না।

এখন প্রশ্ন হলো এই অল্প বয়স্কা ছেলে-মেয়েরা কি নিজে নিজেই এই সব আবিষ্কার করেছে না কি কোথাও থেকে শিখেছে? অবশ্যই নির্দ্বিধায় বলা যায় বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাবেই এটা সম্ভব হয়েছে।

এমন হাজার হাজার চলচিত্র বা নাটক এদেশের গণমাধম্যে প্রচার কারা হয় যাতে এই ঘটনার মিল পাওয়া যাবে। শিক্ষার্থীরা ওই সব নাটক বা চলচ্চিত্র দেখেই এসব শিখেছে। তাদেরকে দেখার এবং শেখার সুযোগ করে দেবেন কিন্তু বাস্তবে তা করতে দেবেন না তাতো হতে পারে না।

শাস্তি দিয়ে, বহিষ্কার করে তরুণ প্রজন্মকে এসব থেকে ফেরান যাবে বলে মনে হয় না। প্রতিরোধ করতে হলে অবশ্যই আমাদের মূল উৎস নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের গণমাধ্যমে প্রচারিত নাটক, চলচ্চিত্রসহ সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠনগুলো যদি আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি বিরোধী হয় তাহলে এমন ঘটনা রোধ হবে না বরং এক দিন অপসাংস্কৃতিই আমাদের নিজেস্ব সংস্কৃতিকে গ্রাস করে বসবে।

আমরা বুঝেও বুঝিনা। এদেশের নাটক-চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মগজ পরিচালিত হয় ভিনদেশী প্রভুদের ইচ্ছায়। নির্মাতারা নিজের কর্মে নিজের চিন্তা চেনতার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ। যা জাতিসত্ত্বা এবং নিজেস্ব সংস্কৃতির জন্য হুমকি। ইতোমধ্যে আমরা তাদের চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতির কাছে নিজেদের সঁপে দিয়েছি। নিজকে হারিয়ে বসেছি। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি। না হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা বাংলা ভাষা ও বাঙালী জাতিসত্বা এবং দেশীয় সাংস্কৃতি হারিয়ে বসব।

উদ্দোগটা সচেতন সমাজকেই নিতে হবে। যারা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করেন তাদেরকেই নিতে হবে। আমাদের রচিত, নির্মিত, অভিনিত নাটক বা চলচ্চিত্রে মাধ্যমে যেন আমাদের সাংস্কৃতি ব্যতীত অন্যের চিন্তা-চেতনা প্রচার না হয়।

[বি. দ্র.- মতামত লেখকের একান্ত নিজেস্ব, টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সস্পর্ক নেই।]

এমআইএস