ইতালীর নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যা নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারপক্ষ এ হত্যাকাণ্ডকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবতা তাদের লেজে-গোবরে অবস্থার সৃষ্টি করেছে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস এর দায় স্বীকার করেছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা এমন কী খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে আইএস-এর যেকোন অস্তিত্ব জোড়ালোভাবে অস্বীকার করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও বাংলাদেশে জঙ্গীবাদকে অজুহাত হিসেবেই দেখছেন। এমনকি আইন ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাসীন দলের বর্ষীয়ান নেতা বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও তাভেলা হত্যায় জঙ্গী সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৩ অক্টোবর রংপুরের মাহিগঞ্জে হোসি কোমিও নামের এক জাপানি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী বিদেশী নাগরিক হত্যাকে পরিকল্পিত বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যা বিষয়ে দেশে জঙ্গী তৎপরতা নেই বলে সরকারি দলের লোকেরা দাবি করলেও তা স্ববিরোধীতা ছাড়া কিছু নয়। তারা বিরোধী দলের আন্দোলনকে ‘জঙ্গী ও সন্ত্রাসী’ কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়েছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীও বিরোধী দলকে কথায় কথায় ‘জঙ্গী’ বলে আখ্যায়িত করে আসছেন।

গত মার্চে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘মানুষের রক্ত নিয়ে যারা খেলছে তাদের শাস্তি হবেই হবে। জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের কোন ক্ষমা নেই’।

সমাবেশে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘খালেদা জিয়া আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে’। গত ২৫ মার্চে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুল উল আলম হানিফ বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া জঙ্গী নেত্রী’। ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে জঙ্গীনেত্রী খালেদা জিয়ার ঠিকানা হতে পারে না। তার ঠিকানা হবে পাকিস্তানে’। গত ৭ মার্চ এক অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, ‘খালেদা জিয়া জঙ্গী নেত্রী’। ৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের প্রচার ও গবেষণা সম্পাদক ড. হাসান মাহমুদ বিএনপি চেয়ারপর্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ‘জঙ্গী নেত্রী আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘জঙ্গীনেত্রীর কাছে দেশ কখনো পরাজিত হতে পারে না’। এমন কী তিনি গত ২৭ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেট আলোচনায় বলেছেন, ‘তিউনেশিয়া-কুয়েত-ফ্রান্সে’ সন্ত্রাসী হামলায় খালেদা জিয়া জড়িত’। তার বক্তব্যে প্রমাণিত হয় যে, বেগম খালেদা জিয়া শুধু দেশেই জঙ্গী তৎপরতা চালাচ্ছেন না বরং তিনি আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনের নেত্রী!

এদিকে বোমা ফাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি ‘দি ওয়াশিংটন টাইমস’ পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে জামায়াতে ইসলামীকে জঙ্গী সংগঠন হিসাবে উপস্থাপন করেন। এখানেই শেষ নয় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে জামায়াতকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসাবে তালিকাভুক্তির পরামর্শ দিয়েছেন। গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে জঙ্গী ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে তার দায়ভার সরকার কোনভাবেই এড়াতে পারে না। এখন যখন তাদের কথার সূত্র ধরেই বিদেশীরা বাংলাদেশ সফরকে অনিরাপদ মনে করছেন তখন তারা স্ববিরোধী কথা বলছেন।

তাভেলা হত্যার পর নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী এই হত্যারকাণ্ডের বিষয়ে জামায়াত-বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, বিএনপি নেতা ড. আব্দুল মঈন খানকে জিজ্ঞাসা করলেই হত্যা সম্পর্কে সবকিছু জানা যাবে। রাজনীতিতে এমন অশুভ চর্চা নতুন নয়। এ বিষয়ে ২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বরের কক্সবাজারের রামুর ঘটনা স্মরণযোগ্য। সেদিন উত্তম কুমার নামের এক বৌদ্ধ যুবকের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের সূত্র ধরে ঐ অঞ্চলে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছিল। প্রধানমন্ত্রী তখন নিউইয়র্কেই অবস্থান করছিলেন। কোন প্রকার তদন্ত ছাড়াই কক্সবাজারের সহিংসতার জন্য তিনি বিএনপি এমপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছিলেন। সত্য অবশ্য প্রকাশ পেয়েছিল।

১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, সেদিনের ঘটনায় ক্ষমতাসীনরাই সহিংসতাকে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়েছিল। ঘটনার ধারাবাহিকতা সে কথায় প্রমাণ হয়েছিল।

বাংলাদেশে ইতালীয় নাগরিক হত্যার ঘটনা কোন বিদেশী হত্যার প্রথম ঘটনা নয় বরং ২০১২ সালের মার্চে ঢাকার কুটনীতিক পাড়ায় সৌদি কুটনীতিক খালাফ আল আলীকেও সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তখন সরকারপক্ষ এ ঘটনার জন্য বিরোধী দলকেই দায়ী করেছিল কিন্তু তদন্তে ও বিচারে তা প্রমাণ হয়নি। বিচারে খালাফ হত্যার জন্য যে ৫ জনকে প্রাণদণ্ডে দন্ডিত করা হয়েছে তাদের সাথে বিরোধী দলগুলোর দূরতম কোন সম্পর্ক ছিল না।

সরকারের এই মুদ্রাদোষ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। সফর শুরুর আগেই মার্কিন প্রশাসনের কাছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে Politics of Bangladesh : Democracy versus religious fundamentalism- বইটি ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই বইটি পড়ার পর বাংলাদেশ সফরকালীন সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও গ্রামীন ব্যাংকের প্রকল্প পরিদর্শন কর্মসূচী বাতিল করেছিলেন। নিজেরা ক্ষমতায় থাকতে দেশে জঙ্গীবাদের উত্থানের কথা বিদেশীদের গোচরে আনা ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ’ নয় কী ? এতে কী সরকারের সফলতা প্রমাণ হয়?

মূলত আওয়ামী লীগ দেশে জঙ্গীবাদের প্রসার ও উত্থান ঘটেছে বলে প্রচার করে আসছে। তারা রাজনৈতিক কর্মসূচীগুলোকেও জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের সাথে তুলনা করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। তাভেলা হত্যার পরও খোদ প্রধানমন্ত্রী প্রবাস থেকেও সে কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন কিন্তু সরকারি দলের কথার সূত্র ধরেই যখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুগো সোয়্যার ও অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত এবং পশ্চিমা কয়েকটি রাষ্ট্র সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য ট্রাভেল এলার্ট ঘোষণা করলো তখন সরকার তখন তারা নিজেদের পাতানো ফাঁদেই আটকা পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। এতে সরকার ও সরকার দলীয় সংগঠন আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

তারা বলছেন, দেশে এমন কোন অবস্থার সৃষ্টি হয়নি যাতে কোন বিদেশী নাগরিকের বাংলাদেশ সফর ঝুঁকিপূর্ণ। তারা দাবি করছেন যে, বিরোধী দলের সহিংস কর্মসূচী চলাকালেও বিদেশীরা বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং বিরোধী দলের পক্ষে দুতিয়ালীও করেছেন। অথচ দেশে যখন শান্তির সুবাতাস বইছে, তখন তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সফর বাতিল করছেন। যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার কথায় কথায় দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান হয়েছে বলে যে ফাঁদের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতা নিতে চেয়েছিল সেই ফাঁদেই তারা আটকা পড়েছে। এখন এ বিষয়কে কেন্দ্র করে সরকারের সাথে পশ্চিমি দেশগুলোর শীতল সম্পর্ক চলছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জ্ঞাত হওয়া গেছে যে, ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো প্রকাশ্যেই তাদের উদ্বেগ-উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম নিয়েও তাদের আপত্তি ছিল। যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মান নিয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ও সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনাকে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রকাশ্যেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সরকারের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষোভ ছিল। কিন্তু নিজ দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার কৌশলগত কারণে হয়তো কঠোর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তবে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। সরকার অবশ্য বলেছিল এতে আমাদের কোন সমস্যা হবে না। এখন তারা অবশ্য এটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসাবে দাবি করছে।

দেশে কোন ঘটনা সংগঠিত হলেই তার দায়ভার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের উপর চাপিয়ে সরকার পুলকবোধ করলেও অপরাধীরা কিন্তু আস্কারা পেয়ে যায়। ফলে দেশে অপরাধ প্রবণতার বিস্তার ঘটে। মূলত রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তাসহ সকল ক্ষেত্রে সুশাসান প্রতিষ্ঠা করা। আর বিদেশী নাগরিকরা তো আমাদের দেশের সম্মানিত মেহমান। তাই তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও অধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব সেটিই। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) রাষ্ট্রের একটি সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, ‘কোন নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মধ্যে আইনের মাধ্যমে সংগঠিত জনসমূহকে রাষ্ট্র বলে। (A state is a people organized for law within a define rerritory).

সরকারের অদূরদর্শী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর কারণেই দেশে কূটনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক বিশ্বব্যাবস্থা হচ্ছে গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু সরকারের একদেশদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণেই দেশ এখন কূটনৈতিকভাবে কোনঠাসা। তারা বিরোধীদল ও জনমতকে তো পাত্তাই দিচ্ছেন না। এমন কী বন্ধু রাষ্ট্রের মন্ত্রী ও কূটনীতিকদের অপদস্ত করতে ছাড়ছেন না। বিরোধী দলগুলোকে জঙ্গী ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাইলেও সময়ের প্রয়োজনে তা হিতে বিপরীত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কলেজে বন্ধুকধারীরা হামলা চালালে বেশ হতাহতের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এজন্য মার্কিন কর্তৃপক্ষ দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান হয়েছে বলে দাবি করেন নি। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সকল পক্ষকেই নেতিবাচক রাজনীতি পরিহার করতে হবে। এতে সরকারের দায়িত্বটা অন্যদের তুলনায় বেশি। তাই কোন ঘটনার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি দায়ী না করে বাস্তবতা উপলব্ধি করা উচিত। দেশ ও জাতি ক্ষমতাসীনদের কাছে সেটিই আশা করে।

কেএইচ