একটি স্বাধীন দেশের প্রধান মৌলিক কিছু কাজের মধ্যে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা হলো দেশেটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রত্যেক দেশেই সরকারকে জনগণ দায়িত্ব দেন তাদের অধিকার রক্ষা করতে। কিন্তু প্রকৃত দৃশ্য হলো জনগণের ভোট পাওয়ার পর আর কোন সরকারই জনগণের স্বাধীনতা, অধিকার ও মুল্যায়নের কথা মনে রাখে না।
এভাবেই স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী মুক্ত, স্বাধীন জীবন যাপনের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক মানবাধিকার।
এই অধিকার কোনো ভাবে, কোনো আইনের দ্বারা অথবা ধারা দ্বারা যদি ক্ষুণ্ণ হয়, তাহলে ওই আইনটি অথবা যতোটুকু সাংঘর্ষিক, ততোটুকু বাতিল হয়ে যাবে।
সংবিধানের ২৬ ধারা অনুযায়ী, যদি কোন আইনও সংবিধানের এই অংশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে ওই আইনটি সম্পূর্ণ অথবা ওই আইনের অংশ বিশেষ সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সম্পূর্ণ আইনটি অথবা সাংঘর্ষিক আইনের অংশ বিশেষ বাতিল হয়ে যাবে।
বাস্তবতা হলো সংবিধানের এই দায়বদ্ধতা আদৌ রক্ষা করতে পারছে না আমাদের সংবিধান।
যুগের পর যুগ শুধু ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রয়োগ হয়ে আসছে।
এই অন্যায় গ্রেপ্তার ও আটকাদেশ সংবিধানের উল্লিখিত বিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার পরও ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিককে নির্বিচারে গ্রেপ্তারের যে ক্ষমতা পুলিশের উপর অর্পণ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী। জনগণের ওপর ৫৪ ধারা প্রয়োগও ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত হানার শামিল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদিন মালিক বলেন, ৫৪ ধারা আসলে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। তবে দেশের প্রত্যেকটি সরকার বিরোধীদল দমনের জন্য এই ধারাকে ব্যাহার করে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক করে তোলা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ঢালাওভাবে পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে এভাবে ৫৪ ধারার দোহাই দিয়ে গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শাহদীন মালিক আরো বলেন, ৫৪ ধারায় গ্রেফতার হলো বিরোধীদল দমনের সব থেকে বড় ও অভিনব পদ্ধতি। এইভাবে বেআইনীভাবে আইন প্রয়োগ করলে জনগণের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে না।
তবে, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি অবশ্য বলেন, ৫৪ ধারা কোনোভাবেই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
তিনি বলেন, বিরোধীদলকে দমনের অজুহাত দিলে এই আইন অকেজ হয়ে যাবে। তাছাড়া এই সুযোগে বিরোধীরা দেশে সংঘাত বাড়াবে। এই দিক লক্ষ্য রাখা খুবই জরুরী যে, পুলিশ যেন আইনকে কখনো কারো মনরঞ্জন করতে ব্যাহার না করে।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শম রেজাউল করিম বলেন, কোন আইনকেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিৎ নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেকোন লোককে আটক করতেই পারে।
তিনি বলেন, সেই ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে আইনের নামে আইনের যেন অপপ্রয়োগ না হয়। আর তা নিশ্চিত করতে না পারলে আইন আর আইন থাকবে না।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব যে, ১৮৮৯ সালে ইংরেজরা সর্ব প্রথম গণ আন্দোলনকে রুখতে এই আইন তৈরি করে। ফৌজদার আইনের এই ধারা তৈরি করা হয়েছিল মুসলিমদের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে।
পাকিস্তান আমলেও বাংলাদেশীদের নির্যাতনের জন্য এই আইনকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই আমরা বুঝতে পারব যে, শত বছর আগে যে আইন তৈরি করা হয়েছিল জনগণকে নির্যাতনের জন্য অথবা ইংরেজদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। তা কখনো জনগণের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
একারণেই আজও ইংরেজদের এই আইন জনগণকে নির্যাতনের জন্যই ব্যাবহার করছে শাসকগোষ্ঠী। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়েছি। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, আজ পর্যন্ত আমরা ইংরেজদের শাসন থেকে বের হতে পারিনি। তৈরি করতে পারিনি নিজেদের মতো করে কোন আইন। যার ফলে শাসক গোষ্টী সব সময় জনগণকে শাসনের নামে নির্যাতনের পথ খুজেঁ নেয়। আর আইনের শাসনের নামে বেআইনীভাবে আইন প্রয়োগ করে জনগণকে দেশ প্রেম থেকে বঞ্চিত করছে। এভাবে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে নির্যাতনে চললে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ও জনগণের সঙ্গে দূরত্বের সৃষ্টি হবে।
ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী, যেকোনো পুলিশ কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বা পরোয়ানা ছাড়াই যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন।
৯টি কারণে এ ধারায় পুলিশকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্য উচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগও সুনির্দিষ্ট কিছু মাইলফলক দিয়েছেন যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অধস্থন আদালতগুলোর জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
হাইকোর্টের ওই রায়ে ৫৪ ধারার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতাকে অসাংবিধানিক ও মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী বলে ঘোষণা করা হয়।
রায়ে আদালত আরো বলেন, ‘৫৪ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগে চরমভাবে স্বেচ্ছাচারিতা লক্ষ্য করা যায়। এ ধারার ভাষাতেও অস্পষ্টতা আছে।
আদালত ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, কেবল সন্দেহের বশে হেফাজতে নেয়া হলে নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করা হয় যা অবিচার, অন্যায় ও অসাংবিধানিক।
কারণ ৫৪ ধারায় ওয়ারেন্ট ছাড়া আটক এর যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত বিধানগুলোর পরিপন্থী।
আদালত তার রায়ে আরো বলেন, ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে হলে সুনির্দিষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য ও যুক্তিসঙ্গত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি ছাড়া করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, কোনোক্রমেই যেন কোনো নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা অবিচারে হরণ করা না হয়।
মতামত
সন্দেহবশত গ্রেফতারের ইতিহাস ও মৌলিক অধিকার
একটি স্বাধীন দেশের প্রধান মৌলিক কিছু কাজের মধ্যে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা হলো দেশেটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রত্যেক দেশেই সরকারকে জনগণ দায়িত্ব দেন তাদের অধিকার রক্ষা করতে। কিন্তু প্রকৃত দৃশ্য হলো জনগণের ভোট পাওয়ার পর আর কোন সরকারই জনগণের স্বাধীনতা, অধিকার ও মুল্যায়নের কথা মনে রাখে না।





