দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাইস্কুল, কলেজ ও মাদরাসা একই শিক্ষাক্রমে পরিচালিত হলেও আর্থিক দিক থেকে উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক বেতনবৈষম্য বিরাজমান। অথচ দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে নিয়োজিত রয়েছেন এমপিওভুক্ত প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। এই এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই এর অন্তর্ভুক্ত হন। কিন্তু এবারই প্রথম অষ্টম বেতন স্কেলের গেজেটে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সম্পর্কে একটি শব্দও উল্লেখ ছিল না। এতে সারা দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ২০ ডিসেম্বর ’১৫ প্রজ্ঞাপন জারি করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শর্তসাপেক্ষে পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়। সব ক’টি শিক্ষক সংগঠন ২০ ডিসেম্বর ’১৫ প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করে তা প্রত্যাহারের দাবি করেন।

তারা অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকরের দিন থেকেই শর্তহীনভাবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের তাতে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সব সময় শিক্ষকদের সোনার মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

দুনিয়ায় এমন আরেকটি পেশাও নেই, যা সম্মানের দিক থেকে শিক্ষকতার সমান। অথচ দেশের ৯৮ শতাংশ নিরবছিন্নভাবে শিক্ষাদানকারী এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের গত ১৫ ডিসেম্বরে প্রকাশিত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদিও সরকার বারবার শিক্ষকদের আশ্বস্ত করেছেন যে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বেতন প্রদান করা হবে। কিন্তু নতুন নতুন পরিপত্র জারি করে সরকারের পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করছে। গত ২০ ডিসেম্বর জারি করা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অপমান করা হয়েছে।

সরকারের এই অদূরদর্শী, অযৌক্তিক ও হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে এ দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মরত প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী চরমভাবে হতাশ হয়েছেন। শিক্ষক নেতারা বলছেন, সরকার আমলাতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শিক্ষকদের নিয়ে এক ধরনের কানামাছি খেলছে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এমনিতেই দেশে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক সমাজের মধ্যে বেতন, পদোন্নতি ও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। যা এক দিক থেকে অনৈতিক ও অযৌক্তিক এবং অন্য দিক থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের হতোদ্যম করে রেখেছে।

উদাহরণস্বরূপ দেখা যায়, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বাড়িভাড়া পান ৫০০ টাকা। অন্য দিকে সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বাড়িভাড়া পান মূল বেতন বা বেসিকের ৫০ শতাংশ।

শহর এবং নগর এলাকায় তারও বেশি। প্রজাতন্ত্রের সব সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসাভাতা পান ৭০০ টাকা, পক্ষান্তরে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা চিকিৎসাভাতা পান ৩০০ টাকা।

আবার সরকারি স্কুল-কলেজে উৎসবভাতা মূল বেতনের ১০০ শতাংশ, অন্য দিকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা মূল বেতনের ২৫ শতাংশ উৎসবভাতা পেয়ে থাকেন।

আবার সরকারি চাকরিজীবীরা উৎসবভাতা ও চিকিৎসাভাতা ছাড়াও টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা, ঘর-গেরস্থালির সহায়তা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, প্রেষণ ভাতা, শিক্ষাসহায়ক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা, অনেকে পাহাড়ি ভাতা পেয়ে থাকেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুরূপ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের পর্যায়ক্রমে এই ভাতাগুলো দেয়া উচিত।

সরকারি সব চাকরিজীবীর অভিজ্ঞতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি হয়ে থাকে এবং তাদের চাকরি বদলিযোগ্য। অন্য দিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।

যেমন বেসরকারি কলেজে এমন অনেক মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন যারা এসএসসি থেকে অনার্স-মাস্টার্স পর্যন্ত অনেক বিষয়ে প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত এবং তাদের অনেকেই আবার এমফিল ও পিএইচডির অধিকারী হয়েও পদোন্নতিতে অনুপাত থাকার কারণে সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না।

তাদের এত উচ্চ মানের ডিগ্রি থাকার পরও ট্র্যাজেডি হলো তাদের অনেক হতভাগ্য শিক-শিকিাকে পুরো চাকরিজীবনে প্রভাষক হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।

বেসরকারি শিাপ্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় মেধাবী শিার্থীরা এখন এই সম্মানিত পেশায় আসতে অনীহা প্রকাশ করেন। পৃথিবীর কোনো উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এমন অদ্ভুত প্রথা আছে বলে আমাদের জানা নেই।

আমাদের সার্কভুক্ত পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপ তাদের শিক্ষকদের যে বেতনসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা দেন, তা আমাদের দেশ থেকে কয়েকগুণ বেশি। তাই অবিলম্বে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিক্ষতা, যোগ্যতা ও মেধার সমন্বয়ে বিভাগীয়ভাবে পদোন্নতির ব্যবস্থা গ্রহণ ও চাকরি বদলিযোগ্য করা প্রয়োজন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আর এস দেবনাথ দেশের একটি দৈনিকে এক নিবন্ধে লিখেছেন ভারতের একজন হাইস্কুলের শিক তাকে জানালেন, নির্দিষ্ট ডিগ্রি নিয়ে হাইস্কুলে একজন শিক সেখানে যোগদান করলেই ২০-২৫ হাজার ভারতীয় রুপি পান, যা চাকরিতে যোগদান করলে বাংলাদেশের একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকও পান না।

তাই এই স্বাধীন দেশের একজন শিক যখন তার জন্য নির্ধারিত বেতনের মাধ্যমে পরিবারের ভরণপোষণ না পেয়ে হতাশায় আত্মহত্যা করেন কিংবা এই মহান পেশা ছেড়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে অন্য কোনো অসম্মানের পেশায় জড়িয়ে যান। তখন স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত হওয়ার কথা। বর্তমান সরকারের কাছে বিনীতভাবে আমাদের আবেদন, দেশের সেরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিকতা পেশায় আগ্রহী করতে তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অবশ্যই সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্ত নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দেশে দ মানবসম্পদ তৈরি হবে।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমাদের সংবিধানে শিা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। শিা মৌলিক অধিকার না হওয়ার কারণে মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘনের দায়ে রাষ্ট্র বা সরকারকে আইনগত বাধ্য করা যায় না বা তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না।

মৌলিক অধিকার সংরণ করার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের, যা সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এবং এই মৌলিক অধিকার ুণœ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ১০২(১) বিধান মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মামলা করতে পারবেন।

আইনগত অধিকার না থাকায় বেসরকারি শিকেরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য পেতে অষ্টম পে-স্কেলে শর্তহীনভাবে অন্তর্ভুক্তির জন্য রাষ্ট্রের করুণার ওপর নির্ভর করতে হয়।

অষ্টম পে-স্কেলের গেজেটে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সম্পর্কে একটি শব্দও উল্লেখ না থাকায় এবং পরে ২০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে শিক্ষকদের শর্তসাপেক্ষে পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ করায় তাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, অভিভাবকসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের নিকট চরম হেয়প্রতিপন্ন করা হয়েছে এবং এতে শিক্ষকসমাজ খুবই অপমানিত বোধ করছেন।

সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, দেশের ৯৮ শতাংশ শিক্ষা দানকারী বেসরকারি শিক্ষকসমাজকে কোনো শর্তের বেড়াজালে ফেলে পে-স্কেলের বাইরে রাখার কোনো অশুভ পদক্ষেপ নেবেন না। অবিলম্বে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের শর্তহীনভাবে জাতীয় পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তি করে বকেয়াসহ জানুয়ারি মাসের এমপিওর সাথে দিতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো হবে। শিক্ষকেরা নিজের আত্মসম্মানের প্রশ্নে আপসহীন এ আত্মসম্মানে যখন আঘাত আসে, তখন তা রক্ষায় সচেষ্ট হওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ থাকে না।

আর দেশের প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক তখন তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় না গিয়ে রাস্তায় নেমে আসবেন । বর্তমান চলমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যৌক্তিক আন্দোলন থেকেও সরকার শিক্ষা নিতে পারে।

কারণ, মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে তারা কিছুতেই পিছু হটবেন না।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, লক্ষ্মীপুর। (সূত্র: নয়া দিগন্ত)

[email protected]

এআই