মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক এ কে খন্দকার হয়তো শেষ বয়সে এসে সত্যের সাথে সংসার করতে চেয়েছিলেন। হয়তো ধরে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের এ উচ্চারণ—‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা।’ অথবা তার মনে ছিল কাউকে না কাউকে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতেই হয়। সে কাজটা যতই বিপজ্জনক হোক। কাউকে না কাউকে সত্য প্রকাশের ভার বহন করতেই হয়।

হয়তো সেজন্যই ‘সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধার’ মতোই কয়েকটি কথা তার ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ গ্রন্থে সত্যিকারের যথার্থ ইতিহাসের স্বার্থেই লিখেছেন। তিনি জানিয়েছেন জয়বাংলার পর বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিব ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন। তিনি বলেছেন, জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে বার্তা পাঠানোর বিষয়ও আওয়ামী লীগের উদ্ভট মস্তিষ্কের সংযোজন। কারণ জহুর সাহেব মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাসই আফসোস করেছেন যে ‘বঙ্গবন্ধু’ কেন যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যাননি! তাছাড়া টেলিগ্রাফ নিয়ে যে গল্প সেটাও তিনি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। কারণ যদি সঠিক হতো তাহলে এদিনে সেই বার্তাবাহককে জাতির সামনে হাজির করা হতো।

এ কে খন্দকার বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এ কথা তো একা খন্দকার দাবি করেননি—তাজউদ্দিন আহমদও বলে গেছেন। এ কে খন্দকার বলেছেন, ‘মুজিববাহিনী’ মুজিব সরকারের সাথে যুক্ত ছিল না। এদের বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যও সন্দেহাতীত ছিল না। কথা তো সত্য, কারণ এই বাহিনীর জনকের নাম জেনারেল উবান। ভারতের কর্তৃত্বের বাইরে যাতে মজিবনগর সরকার বা মুক্তিযুদ্ধ না যায় সেজন্যই জেনারেল উবান মুজিব বাহিনীর জন্ম দেন।

মোদ্দাকথা এইটুকুই। এর সঙ্গে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। কিন্তু সে-সব পাঠের সময় কোথায় আমাদের শাসক দলের মন্ত্রী-নেতাকর্মীদের। তারা তো গায়ের জোরে, খুন করে, পিটিয়ে, পুড়িয়ে, জেল-জুলুমের মাধ্যমে তাদের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক ইতিহাস লিখিয়ে নিতে ওস্তাদ। ভিন্নমত, ভিন্ন চিন্তা সহ্য করার মতো সুশিক্ষা তো ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের নেই। এ কর্মে তাদের গলার ও গায়ের জোরের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার মতো কেউ নেই এদেশে।

এজন্যই তাদের দলের নেতাকর্মীরা যেভাবে চায়, সবকিছু শুধু তারাই, আর কেউ কিছু নয়—এর বাইরে সত্যিকার ইতিহাস চর্চাকারীদের তারা স্বাধীনতাবিরোধী, আইএসআইয়ের এজেন্ট, মৌলবাদী, যুদ্ধাপরাধী হিসাবে কষে গালমন্দ করে তার টুঁটি টিপে ধরে। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান সহায় একশ্রেণীর গণমাধ্যম, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নামধারী কিছু দলকানা লাঠিয়াল। যারা আবার বাংলাদেশের মঙ্গলের চাইতেও ভ্রাতাবেশী দেশটির বন্ধুত্ব পাহারা দেয়ার ‘ওয়াচডগ’।

তারা এবং তাদের নেতা যত ভুলই করুক, তাদের যত দোষই থাকুক সে-সব যত মিথ্যাই হোক—তার বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না। বললেই তারা একযোগে হুক্কা হুয়া দিয়ে ওঠে। চিত্কার, চেঁচামেচি, লাঠালাঠি, গলাবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে দেশ মাথায় তোলে। গেল গেল সব গেল। আর ইতিহাস বিকৃতির ধোয়া তুলে এমন হুলস্থুল কাণ্ড বাধিয়ে বসে যে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায় পুরো জাতির। এটা তাদের কোনো নতুন কৌশল নয়। পুরনো কৌশল। এই কৌশলটাকেই বার বার প্রয়োগ করে সত্যকে হত্যা করে মিথ্যাকে মহিমাময় করে তারা বাজিমাত্ করে এসেছে।

এ কে খন্দকার সাহেবের এসব অজানা এমন নয়। কিন্তু বিবেক বলে তো একটা কথা আছে। হয়তো সেই বিবেকের তাড়নায়ই তিনি আওয়ামী লীগ সৃষ্ট মিথ্যাচারের সীমাহীন এবং অথৈ কুয়াশা সরিয়ে কিছু সত্য কথা বলার চেষ্টা করেছেন। আর যায় কোথায়! এখন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ও প্রধানমন্ত্রীর লোকজনদের কাছে তাকে শুনতে হচ্ছে, তিনি কুলাঙ্গার। তিনি বিশ্বাসঘাতক। তিনি ষড়যন্ত্রকারী। তিনি বিএনপি-জামায়াতের সাথে চক্রান্ত করেছেন। তিনি আইএসআইয়ের এজেন্ট। তার বই নিষিদ্ধ করো ইত্যাদি আরও কত কি। বিশেষণের বিষে তিনি এখন জর্জরিত।

এই বিষের সাথে আরও খানিকটা বিষ ঢেলে দিয়েছে তারই হাতে গড়া সেক্টর কমান্ডার ফোরাম। তারা বলেছে তার বই ‘বাস্তবতাবর্জিত’। বাস্তবতাটা কি সেটাও তারা জানিয়েছে। সেটা হলো আওয়ামী লীগের চাহিদা মাফিক কথা বলতে হবে। সেক্টর কমান্ডার ফোরামের বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে দেখলাম হারুন হাবীব আর ম. হামিদের নাম। তারা কোন সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন— আল্লাহ মালুম।

এই আগুনে আরও কিছু ঘি ঢেলে দিয়েছেন তরুণ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তিনি এ কে খন্দকারের বইটি আগুন দিয়ে পুড়িয়েছেন আনুষ্ঠানিকভাবে। বলেছেন, ইতিহাস বিকৃতকারীদের আমরা সমাজের সর্বস্তর থেকে প্রতিহত করতে চাই। তাই ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ইতিহাস বিকৃত করা এই বইটি পুড়িয়ে আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’—

১৯৭১ সালে প্রতিমন্ত্রী সাহেবের বয়স কত ছিল আমরা জানি না। অতি আবেগ থেকে হয়তো তিনি এ কাজটি করেছেন। যেমন অতি আবেগের মহড়া আমরা দেখলাম জাতীয় সংসদে। সেখানে তো শেখ সেলিম এ কে খন্দকারকে রাষ্ট্রদ্রোহী পর্যন্ত বলেছেন। বলেছেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ সাহেবরা। তবে রাশেদ খান মেননের বক্তব্য আর মইনুদ্দিন খান বাদলের আহাজারী শুনে হাসি চেপে রাখতে পারিনি।

আওয়ামী লীগের এই হিংস্রতা মূর্খতা ও দম্ভের বাইরে গিয়ে এই প্রথম একজন মন্ত্রী বয়োবৃদ্ধ আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, এ ধরনের অভিযোগে একটা বই নিষিদ্ধ করা ঠিক হবে না। প্রয়োজনে আরও একটা বই লিখে এর প্রতিবাদ করো।

যে আবুল মালকে আমরা ‘রাবিশ’ আর ‘ফটকাবাজ’-এর কথক বলে চিনতাম, তার মুখে যুক্তির ভাষা দেখে মনে হলো, আওয়ামী লীগ হয়তো ১০০% পচে গেছে। হয়তো তারা দেশকে মাইনাস ১০০ ডিগ্রির নিচে নিয়ে গেছে। তারপরও তাদের মধ্যে এক-দুইজন আছে আমাদের আবুল মাল সাহেবের মতো। এই প্রথম আবুল মাল সাহেবকে ধন্যবাদ দিতে পেরে ভালো লাগছে।

যা হোক, সত্য প্রকাশের অপরাধে রাজরোষে পড়ে জেলখানায় অসহনীয় নির্যাতন ভোগ করছেন বাংলাদেশের সাহসী বিবেকের কণ্ঠস্বর আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তরুণ প্রজন্মের নেতা জনাব তারেক রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে, বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট নিয়ে কথা বলে যাচ্ছে তাই ভাষায় গালমন্দের শিকার হয়েছেন।

স্বাধীনতার ঘোষকের পুত্র বলেও আওয়ামী লীগ তাকে ছাড় দেয়নি। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদকে সহ্য করতে হয়েছে শাসকদের হুমকি ধমক। এখন এই কাতারে সত্যের সৈনিকদের কাফেলায় যুক্ত হয়েছেন জনাব এ কে খন্দকার।

দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ যত তর্জন-গর্জনই করুক, হয়তো তারা সাময়িকভাবে চাপা দিতে পারছে অনেক কিছু। কিন্তু সবটুকু নয়। নয় বলেই, সত্যের সৈনিকদের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। বাংলাদেশের আশার আলো তাহলে নিভে যায়নি! রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?

লেখক:আবদুল হাই শিকদার
ঢাকা, ৮ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ