সংসদের বাইরে বৃহৎ বিরোধী জোটের প্রধান দল বিএনপিতার বর্হিদুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগটা আরও ঝালাই করে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এক সময়কার সহকারি জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধু মাহাবুব রাব্বি তনয়ের হত্যাকানণ্ডের পর পশ্চিমাবিশ্বসহ বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের মনোসংযোগটা সরকারের দিকেই ঝুঁকে ছিল বলে মার্কিন সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিসা দেশাই বিসওয়াল ভারতের হাইকমিশনার শ্রী শ্রিংলার সঙ্গে বৈঠক করলেও, খালেদা জিয়ার সঙ্গে কোন বৈঠক করেননি।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিদেশী রাষ্ট্রের কেউ বৈঠক না করাটা রাষ্ট্রাচারের (প্রটোকল) দিক থেকে অসুদ্ধ নয়। তবে সৌজন্যতার দিক থেকে তা ছিল অনেকটা দৃষ্টিকটু। কারণ, খালেদা জিয়া হচ্ছেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়াও তিনি দু’বারের সংসদে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তাই সফরে আসলেই বিদেশী রাষ্ট্রের গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিরা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিতেন।

কিন্তু এবারই এ ধরনের ব্যতিক্রম ঘটার কারণে বিএনপি বন্ধু রাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্কটিকে আরও ঘনিষ্ঠ করতে মনোযোগী হয়। এ কারণে বিএনপির পক্ষে যিনি পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়টি দেখভাল করতেন সেই সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরীকে দলে ফিরিয়ে আনারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত বছরের ২৯ অক্টোবর বিএনপির সহসভাপতিসহ দল থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। এদিকে সরকারও তার ভেঙ্গে পড়া বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে।

বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যেসব দেশের সঙ্গে নানা কারণে সম্পর্ক শীতল হয়েছিল, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তেই নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে জানা গেছে।

এই তৎপরতারই অংশ হিসেবে বিএনপির ‘বৈদেশিক যোগাযোগের শক্তি’টাকে ভেঙ্গে ফেলতে চায় সরকার। অবশ্য এর আগে থেকেই সরকার বিএনপির যেসব নেতা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষা করতেন, তাদের উপর চড়াও হন। এসব কারণে রিয়াজ রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকদিনই নিশ্চুপ ছিলেন। সাবিহ উদ্দিন আহমেদও ছিলেন নিষ্ক্রিয়।

তবে রাজনীতিতে তারা দু’জনই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেছেন। সম্প্রতি হোটেল ওয়েস্ট ইন-এর বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত কূটনীতিকদের ইফতারে এদু’জনকে বেশ সক্রিয় দেখা গেছে। শুধু সাংবাদিক শফিক রেহমান একটি মামলায় এখন জেলখানায়। সর্বশেষ স্বাধীনতা বিরোধী তৎপরতার অভিযোগ পাওয়া যাওয়ায় ড. ওসমান ফারুক কিছুদিন আগে দেশান্তরি হন।

২০১৫ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের লাগাতার আন্দোলনের সময় শমশের মবিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে মুক্ত হয়ে কোন রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিতে তাকে আর দেখা যায়নি।

এক সময় হঠাৎ করেই সেই বছরের ২৯ অক্টোবর পদত্যাগ করেন তিনি। তখন মিডিয়ায় এ পদত্যাগের ব্যাপারে অন্য অনেক কারণের পাশাপাশি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে সরকারের চাপেই যে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তা এতদিনে পরিষ্কার হয়ে যায়।

কেননা, চিকিৎসা নেয়ার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও তাকে তার জব্দ করা পাসপোর্ট সরকার ফেরত দিতে টালবাহানা করছিল। কিন্তু পদত্যাগ করার পরই তা ফেরত পেয়েছিলেন তিনি। এতেই সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়।শমশের মবিন চৌধুরীসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা যখন সরকারের কোপানলে, তখন বিএনপির বর্হিদেশগুলো দেখভালের দায়িত্ব পালন করে গেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.আবদুল মঈন খান।

অবশ্য তিনি একা এ কাজ করেননি।তাকে দলের নিচের পদের আরও বেশ কয়েকজন নেতা সহযোগিতা করেছেন। বিএনপির এবার যে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে এসব নেতার কয়েকজনকে ভাল পদ দেয়া হয়েছে।

গত ১৬ মে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের বাসভবনে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক মুখ্য উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম টডের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা। স্থায়ী কমিটির সদস্য মঈন খানসহ বিএনপির ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এ বৈঠক করেন।

বৈঠকে মঈন খান ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, ইনাম আহমেদ চৌধুরী ও সাবিহ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এভাবে আরও বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গেও বিএনপি নেতারা বৈঠকে অংশ নেন।

দেশের বাইরে অবস্থানরত বিএনপি নেতা ড. ওসমান ফারুক পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন বলে জানা গেছে। আসলে বিএনপি বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক উন্নয়নে নিরব কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে।এদিকে বিদেশীদের বাগে নিতে সরকারও কিন্তু বসে নেই। বেশ কয়েকটি মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে যে, বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সরকার ‘কোমর বেঁধে’ মাঠে নেমেছে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিদেশী একাধিক দেশের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক শীতল হয়। এর পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে মুক্তমনা ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের হত্যা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা মিশনের কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান খুন হওয়ার পর এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। দেশটির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ঢাকা সফরে এসে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ঘটনার অগ্রগতি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে যান।

সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অধিবেশনে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনায় একাধিক ইউরোপীয় দেশের বক্তব্যে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা উঠে আসে। বাংলাদেশ বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলেও মত দেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা।

এসব সমালোচনা ও অসন্তুষ্টির বিষয় পর্যালোচনা করেই সরকারের উচ্চ পর্যায় পশ্চিমা বিশ্বসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে নির্দেশ দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।

আগামী ২৩ জুন ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ- যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারিত্ব বৈঠকের পর দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক অনেক বেশি উষ্ণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সহায়তার ক্ষেত্র ও পথরেখা সুনির্দিষ্ট করা হবে।

সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদনও দেওয়া হবে। এরই মধ্যে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে বলেও জানা যায়।

এছাড়াও আগামী মাসে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলন বাটরে অনুষ্ঠিতব্য এশীয়-ইউরোপীয় দেশের জোট আসেম সম্মেলন চলাকালে প্রধামমন্ত্রী শেখ হাসিনা জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলসহ একাধিক ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলেও আশা করা হচ্ছে।

এর মধ্য দিয়ে ওই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও সরাসরি অবহিত করা হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ জাপান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতেও কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। আসলে দেখা যাচ্ছে, বর্হিবিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কটাকে দুই মেরুর দুই দল বেশ গুরুত্বে সঙ্গেই

নিয়েছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট