চলতি বছরের ৭-৯ জানুয়ারি ফ্রান্সে ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছিল। প্রথম দিনে ২ বন্দুকধারী ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক ‘ শার্লি এবোদা’র প্যারিস কার্যালয়ে হামলা চালায়।

গুলীতে ৮ কার্টুনিষ্ট ও সাংবাদিক এবং ২ দু’ পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১২ জন নিহত হন। ৯ জানুয়ারি ১ বন্দুকধারী একটি ইহুদী বিপনী কেন্দ্রে ঢুকে কয়েকজনকে পণবন্দী করে ৪ জনকে হত্যা করে। ‘শার্লি এবোদা’য় হামলাকারীরাও নিহত হয়।

এরপর গত ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ঘটে গেল এক ভয়াবহ ও বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলা এবং হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। যা ২০০৪ সালে স্পেনের মাদ্রিদে ট্রেনে বোমা হামলার পর ইউরোপের মাটিতে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের মাটিতে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা।

গত ১৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় সন্ত্রাসী হামলায় রক্তে রঞ্জিত হল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাজপথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নিহত হয়েছেন দেড় শতাধিক। আহতের সংখ্যা দু’শরও অধিক।

হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে আইএস বলেছে, বিস্ফোরক বেল্ট পরে ও অস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদের ৮ ভাই ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সফল হামলা করেছে। হামলার পর প্যারিসকে ‘ব্যভিচার ও পাপাচার’ এর রাজধানী বলা হয়েছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠির পক্ষ থেকে।

হামলার প্রতিক্রিয়ায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ বলেছেন, ‘প্যারিসে হামলার মাধ্যমে আইএস ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’। হামলায় অংশ নেয়া ৮ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। ১৩ নভেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীরা প্যারিস শহরের কেন্দ্রস্থলে জনপ্রিয় বাটাক্লাঁ কনসার্ট হল, স্টেডিয়াম, শপিং সেন্টার ও রেস্তোরাসহ ছয়টি স্থানে একে ৪৭ মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে এ হামলা চালায়।

সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বাটাক্লাঁ কনসার্ট হলে ঢুকে এলোপাথারি গুলী চালিয়ে হলের দখল নিয়ে দর্শকদের পণবন্দী করে। অন্য হামলাগুলো হয়েছে কয়েকটি বার ও রেস্তোরাঁয়। এসব হামলা কম্বোডিয়ান একটি রেস্তোরাঁয় ১০ জন, একটি পানশালার বাইরে ১৫ জন, একটি এভিনিউতে ৪ জন এবং নগরের বাইরে একস্থানে ৪ জন নিহত হয়েছেন।

এ ঘটনার পর ফ্রান্সও আইএস অবস্থানের উপর হামলা জোরদার করেছে। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন পাল্টা হামলায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই বরং তিক্ততা ও বৈরিতা আরও বাড়বে।

এ হামলার তাৎক্ষণিক নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিট ক্যামরুন, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। হামলার পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ তার এ হামলাকে ‘ অভূর্তপূর্ব’ হিসবে উল্লেখ করেছেন। এ হামলাকে ‘জঘন্য’ উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের পাশে থাকবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জানান, ফ্রান্সে হামলায় তিনি ‘ হতভম্ব ও ব্যথিত ’ হয়েছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল জানিয়েছেন, ফ্রান্সে সন্ত্রাসীদের হামলায় তিনি পুরোপুরি ‘ হতভম্ব ’ হয়েছেন। তিনি বলেন, এধরনের ভয়াবহ ঘটনা ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর শহর এলাকায় আমরা আর দেখিনি।

হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান বলেছেন, সন্ত্রাসী হামলার পরিণতি কী তা আমরা ভালভাবেই জানি। কেননা, আজ ফরাসীরা যে দুর্ভোগ সহ্য করছে একদিন আমরাও তা সহ্য করেছি।

তিনি এই দুর্দিনে ফরাসী জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গত অক্টোবরে আঙ্কারায় কুর্দিদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয় এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল গার্সিয়া মারগাল্লো বলেছেন, আমরা সবাই এক কঠিন সময় পার করছি। ২০০৪ সালে মাদ্রিদের ওই ট্রেনে বোমা হামলার ঘটনায় ১৯১ জন নিহত হয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে হোতাদের বিচারের বিচারের মুখোমুখী করার আহবান জানিয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফ্রান্সের পাশে থাকার কথা বলেছে ইউরোপীয় ও ন্যাটো। বিশ্বের অন্যান্য দেশের নেতারাও হামলার নিন্দা ও শোক জানিয়েছেন।

মুসলিম বিশ্ব প্যারিসে হামলার কঠোর সমালোচনা করেছে। ইরান, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও কুয়েতসহ বিশ্বের প্রায় সকল মুসলিম রাষ্ট্রই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। শুধু মুসলিম রাষ্ট্র নয়, বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনও নিরীহ সাধারণ মানুষের উপর আইএসের জঘন্য আক্রমণের প্রবল নিন্দা করেছে।

কথিত জিহাদের নামে যারা এই নির্মমতা চালিয়েছে তারা কখনোই প্রকৃত মুসলিম হতে পারে না বলেও বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন মন্তব্য করেছে। কিন্তু এরপরও এর দায়ভার ইসলামের উপরই চাপানো হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি বিষয়টির একটি ইতিবাচক দিকও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখন বিশ্বের সচেতন মানুষ ইসলাম মানেই জঙ্গীবাদ আর মুসলিম মানে জঙ্গী একথা বিনাবিচারে মেনে নিতে চাচ্ছেন না। তারা এখন অনেকটাই আত্মসচেতন।

গত ১৩ নভেম্বর প্যারিস ট্রাজেডি পশ্চিমা বিশ্বে নতুন উপলব্ধির সৃষ্টি করেছে। এক দশক আগে যে মিডিয়ার মাধ্যমে জনমত গড়ে পশ্চিমা দেশগুলো মুসলিম বিশ্বের উপর কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ( ওয়ার অন টেরর ) চাপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ওয়ার অন টেরর নীতির কঠোর সমালোচনায় সরব প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো। তারই অংশ হিসাবে ১৪ নভেম্বর ব্রিটেনের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর এটা পরিস্কার যে, সিরিয়ায় আমাদেরকে আরো বেশী সহায়তা পাঠাতে হবে শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।

উইলিয়াম পাইনের লেখা নিবন্ধটিতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ‘ রংহেডেড পলিসি’ ( পাগলের মস্কিষ্কপ্রসূত নীতি ) বলে অভিহিত করা হয়।

পাইন লিখেছেন, ‘ সোজাসোজি বললে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে কোন কাজেই আসেনি। প্যারিস হামলার পর পশ্চিমা মিডিয়ার পক্ষপাতমূলক কভারেজের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, আমি ও আমার স্ত্রী হামলার পর নিয়মিত টিভিতে খবরাখবর দেখছিলাম। কিন্তু খেয়াল করলাম বিবিসির খবরে কেউ এই কথাটা ঠিকমত বলছে না যে, একজন হামলাকারী বলছে ‘ এটা ফ্রান্স কর্তৃক সিরিয়ায় হস্তক্ষেপের প্রতিশোধ’। অথচ তারা (বিবিসি) বারবার বলছিল এটা পুরো মানবতার উপর এক জঘন্য হামলা।

সবচেয়ে হতাশার বিষয়, রাজনীতিবিদরা এটা স্বীকার করবেন না যে, তারা ভুল করছেন। এটাও স্বীকার করবেন না, তাদের গ্রহণ করা নীতিই আমাদেরকে ( পশ্চিমা নাগরিক ) অনিরাপদ করে তুলেছে। আইএস-এর বিরুদ্ধে আমরা যদি সামরিক অভিযান আরও জোরদার করি তাহলে উগ্রপন্থার আরও ভয়ঙ্কর ঘটবে।

পাইন লিখেছেন, পশ্চিমা সামরিক অভিযান মানুষের জীবনকে কতটা ভয়াবহ করে তুলেছে তার দিকে একবার তাকান। এর ফলাফল আমরা যতটা ধারণা করেছিলাম তার চেয়েও বেশিভাবে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন মানবিকতার সময়, যুদ্ধের নয়।

লেখক বলেছেন, আইএস কিছু যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত একটি গ্রæপ নয় বরং একটি আদর্শ। আর আমি যতটুকু বুঝি, আপনি চাইলেই একটি আদর্শকে ধ্বংস করে দিতে পারবেন না। আদর্শকে অপ্রাসঙ্গিক বা অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে হয়।

আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন পশ্চিমা বিশ্ব এবং মুসলিম উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে শক্তিগুলো সেসব দেশে সন্ত্রাসবাদ ভিত্তি গেড়েছে সেখানে আরও বেশী বিনিয়োগ করে। ওইসব দেশের অর্থনীতি এবং অবকাঠামো যদি উন্নত হতে থাকে তাহলে উগ্রপন্থা আবেদন হারাবে।

প্যারিসে হামলার দায়ভার আইএস স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু আইএস কারা বা কেনই তাদের উত্থান ? বিষয়টি জবাব দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক চাঞ্চল্যকর অভিব্যক্তি ব্যাক্ত করেছে।

আইএসের উত্থানের জন্য জর্জ ডব্লিউ বুশকে দায়ি করলেন তিনি। ভাইস নিউজকে দেয়া এক বক্তব্যে ওবামা অভিযোগ করেন, বুশের আমলেই ইরাকে আক্রমণের ফলে ‘ অনিচ্ছাকৃতভাবে’ আইএস-এর উত্থান হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এমন মন্তব্য বিশ্ববাসীর অন্তরদৃষ্টি খুলে দিতে সাহায্য করবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, প্যারিস হামলার নেপথ্য নায়ক ইসরাইল। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর আগে পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। এমন কি মধ্যপ্রাচ্যেও নয়। মাহাথির বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এধরনের হামলা বন্ধ হওয়ার সম্ভবনা নেই।

কিউবার সাবেক নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন, আইএসআইএস সৃষ্টির পেছনে রয়েছে আমেরিকা ও ইহুদীবাদী ইসরাইল। কিউবার স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বহু মিডিয়া এ খবর দিয়েছে।

ক্যাষ্ট্রো বলেছেন, আইএসআইএস সৃষ্টির জন্য ইসরাইলের কুখ্যাত গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ ও আমেরিকার যুদ্ধবাজ সিনেটর জন ম্যাককেইন ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে।

ক্যাষ্ট্রো তার নিবন্ধে পরিস্কার করে বলেছেন, জন ম্যাককেইন হচ্ছেন ইসরাইলের নিঃশর্ত মিত্র এবং মোসাদের সঙ্গে গোপন পরিকল্পনায় আইএসআইএস সৃষ্টি করা হয়। সেই অনিষ্ট শক্তি এখন ইরাকের বিরাট অংশ এবং সিরিয়ার আয় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

কানাডা ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ গ্লোবার রিসার্চ ’ এক প্রতিবেদনে বলেছে, আইএস মার্কিন গোয়েন্দাদের সৃষ্টি। আর এতে সহযোগিতা করছে বৃটেন ও ইসরাইরসহ আরো কিছু দেশের গোয়েন্দাসংস্থা। আসলে আইএস রহস্য উদঘাটন করা গেলে বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের গডফাদারদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতো।

প্যারিস হামলার বিষয়ে রীতিমত বোমা ফাটিয়েছে উইকিলিকস। হামলার পর এক টুইট বার্তায় উইকিলিকস বলেছে, বছরের পর বছর ধরে সিরিয়া ও লিবিয়ায় চরমপন্থীদের অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দেয়ার ফল প্যারিসের এই হামলা।

পরের দিন টুইট বার্তায় বলা হয়েছে, প্যারিস সন্ত্রাসী হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে। ইরাক ও সিরিয়াও ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এই দুই মৃত্যুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট ও যুক্তরাজ্য যে উগ্রপন্থীদের প্রতিপালন করেছে তার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

আরেক টুইট বার্তায় উইকিলিকস বলে, প্যারিসে ইসলামি সন্ত্রাসীদের হামলায় ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় আড়াই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। এই ব্যাপারটা তখনো মজার বিষয় ছিল না, এখনও মজার না।

প্যারিস হামলা ও আইএস-এর উত্থান নিয়ে মন্তব্যের মধ্যে কিছুটা রকমফের থাকলেও এর নেপথ্যের কুশিলবদের ব্যাপারে সকলেই একমত। মূলত আইএস-এর প্রতিষ্ঠা ও উত্থানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও ইসাইলী গোয়েন্দা সংস্থাকেই দায়ি করা হচ্ছে।

কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও মার্কিনীদের ভ্রান্তনীতি এর অন্যতম কারণ হিসাবেও চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিষয়টি স্বীকৃতি মিলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বক্তব্য থেকেও।

আসলে সন্ত্রাসের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কটা উস্কে দিয়েছিল প্যারিসই। সোশ্যাল মিডিয়ার একাংশের দাবি, পৃথিবীজুড়ে জঙ্গী হামলার দায়ভার ইসলামের। জঙ্গি হামলায় প্যারিসের মাটি রক্তাক্ত হওয়ার পর থেকেই নানা ইসলাম বিরোধী মন্তব্যে সরগরম ফেসবুক-টুইটার। সমান্তরালে এর প্রতিবাদও হচেছ।

জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বহু মানুষ বলেছেন, সন্ত্রাসের কোন ধর্ম হয় না। যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। কিন্তু ক্রমেই দানা বাধলেও এর সমাধান কিন্তু আসছে না।

মূলত মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক সুদুরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই প্যারিসে জঙ্গীবাদী হামলা চালানো হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ফ্রান্স এক সময় পশ্চিম আফ্রিকার অনেক মুসলিম দেশ দখল করে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ চালিয়েছে। ই্উরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সেই মুসলিম জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশী। তাই ফ্রান্সসহ ইউরোপীয়দের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক তিক্ত করা সহজতর মনে করেছে প্যারিস হামলার নেপথ্যের কুশিলবরা।

আর সে সুদুরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ফ্রান্স হামলার নেপথ্যে কাজ করেছে বলেই মনে করেন পর্যক্ষেক মহল। এতে বিশ্বব্যাপী মুসলিম বিরোধী সেন্টিমেন্ট আরও জোরালো করা সম্ভব হয়েছে বলেই মনে হয়।

বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও সিরিয়ার ডামাডোলের মধ্যে ইসরাইল সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের তৎপরতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিশ্বময় চলমান অস্থিরতায় তারা আল আকসার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতেও সক্রিয়।

অধিকৃত ভূখন্ডকে ইসরাইলে অন্তর্ভূক্ত করার ষড়যন্ত্র করা হচেছ। তবে ইসরাইল এখন অনেকটা কোন ঠাসা। তাদের ব্যাপারে পশ্চিমিদের মোহভঙ্গ হতে শুরু করেছে। স্পেনে ইসরাইলী নেতা বেনি আমিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা জারি করা হয়েছে।

প্যারিস হামলা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন শরনার্থীরা। প্রাণ বাঁচাতে, পরিবার বাঁচাতে সিরিয়া ছেড়ে যারা পাড়ি দিতে শুরু করেছিলেন ইউরোপের দিকে, বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ এবার তাদের আশ্রয় দিতে চাচ্ছেন না।

শরণার্থীদের ভিড়ে মিশে সিরিয়া থেকে কোনো আইএস জঙ্গী ঢুকে পড়েছিল ফ্রান্সেপ্রাথমিক এমনটাই ধারণা ফরাসি সরকারের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেসব দেশ সিরীয় শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে শুরুতে রাজি হয়নি, তারা এখন সোচ্চার।

শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া মোটেই উচিত হয়নি বলেছেন অনেক রাষ্ট্র প্রধান। শরনার্থী বিষয়ে উদার জার্মানিও প্যারিসের ঘটনায় পর কিছুটা হলেও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছে।

মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্যারিস হামলা নিয়ে বলেছেন, ‘ এটা ফরাসি জনগণের ওপর শুধু আঘাতই নয় বরং এটা মানব শালীনতা ও আমাদের সব প্রিয় জিনিষের ওপর হামলা।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন গণমাধ্যমকে কখনোই ইয়েমেন, পাকিস্তান বা ফিলিস্তিনে মানুষের মৃত্যুর ব্যাপারে এমন তীর্ষক মন্তব্য করতে দেখা যায় না।

উল্লেখ্য যে, ২০০৩ সালে ফ্রান্স আমেরিকাকে ইরাক যুদ্ধে সহায়তা দিতে অস্বীকার করেছিল। এ যুদ্ধে ফ্রান্সের অবস্থান হলো, মার্কিন যুদ্ধ হবে হিতে বিপরীত, বয়ে আনবে সর্বনাশা বিপদ।

৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূমি জ্ঞাপন করেছিল ফ্রান্স। কিন্তু ফ্রান্স সেদিন আমেরিকাকে পরামর্শ দিয়েছিল, ওই হামলার বিপরীতে বিবেচনাবোধ, শালীনতার পরিচয় দিতে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে কথা আমলে নেয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কতখানি ইতিবাচক হয়েছে ? উত্তরটা পুরোপুরি নেতিবাচক। গত ১৪ বছরের বৈশ্বিক যুদ্ধে কেবল নতুন করে সন্ত্রাসের জন্ম হয়েছে। মূলত এ যুদ্ধের কোন সাফল্য নেই।

আগের ফ্রান্স পাল্টে গেছে। এখনকার ফ্রান্স অতি উৎসাহী হয়ে যুদ্ধবাজদের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করছে। তারা এখন সিরিয়া এবং ইরাক ভিত্তিক আইএসের বিরুদ্ধে পশ্চিমি শক্তির অন্যতম মিত্র শক্তি। তাই বৈশিক রাজনীতিতে ফ্রান্স এখন নতুন অবয়বে আবির্ভূত।

প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্বজুড়ে মুসলিম বিদ্বেষ আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় কানাডার এক মসজিদে আগুন দেয়া হয়েছে।

কানাডার কেন্দ্রীয় ওনটারির প্রদেশের পিটারবোরো নগরীর মসজিদে আস-সালামে এই আগুন দেয়া হয়েছে। নগরীর একমাত্র মসজিদটিতে ১৪ নভেম্বর আগুন দেয়া হয়।

এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মসজিদ বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে মার্কিন ধনকুবের ও রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি বলেন, দেশে সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ করতে কিছু মসজিদ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ দৃঢ়ভাবে বিবেচনা’ করা উচিত।

গত ১৪ নভেম্বর ‘এমএসএনবিসি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, মসজিদে গিয়ে আপনাকে অবশ্যই দেখতে হবে এবং জরিপ করতে হবে সেখানে কি হয় ? কারণ, সেখানে অনেক ধরনের আলোচনা হয়।

একই দিন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালাস বলেছেন, যেসব মসজিদ এবং গ্রুপ দেশের মূল্যবোধে আঘাত করে সেসব বন্ধ করে দেয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ সেদেশের কিছু মসজিদ বন্ধই করে দিয়েছে।

মুসলমানদের পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী বানানো হলেও তা এখন ‘সাপে-বর’ হিসাবে দেখা দিয়েছে।

২০০১ সালে টুইন টাওয়ারের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পরও পাশ্চাত্যে মুসলিম বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করে। কিন্তু তা সত্ত্বে ইউরোপে ইসলামের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়নি বরং তা আরও বিকশিত হয়েছে এবং তা ক্রমবর্ধমান।

ডেইলি মেইল জানাচ্ছে, ইউরোপে প্রতি দশকে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে ১ শতাংশ হারে। ১৯৯০ সালে ইউরোপের মোট জনসংখ্যার ৪ ভাগ ছিল মুসলমানরা। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ শতাংশে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টার দেয়া তথ্য মতে, ইউরোপে এখন মুসলমানের সংখ্যা ৪ কোটি ৪০ লাখ। ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলোতেও এই সংখ্যা ১ কোটি ৯০ লাখ।

আর ইউরোপীয় দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান ইসলামী শক্তিকে বিশ্ববাসীর কাছে বিতর্কিত করতেই ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ পরিকল্পিতভাবে এসব হামলার ঘটাচ্ছে বলেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাসীর ইসরাইল কে নিয়ে মোহভঙ্গ হতে শুরু করেছে।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ ব্যাপক আকার ধারণ করলেও সময়ের ব্যবধানে মুসলমানরা সে ধকল অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু সে ক্ষত পুরোপুরি না শুকাতেই ১৩ নভেম্বর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা নেভানো আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলে দেয়া হলো।

যদিও এবারের প্রেক্ষাপটটা অনেকটাই আলাদা। কারণ, বিশ্ববাসী আগের তুলনায় অনেক সচেতন। তারা আর বিনা প্রমাণে ইসলাম মানেই সন্ত্রাস আর মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী মানতে রাজী নয়।

মুসলিম বিশ্বও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, জঙ্গীবাদের সাথে ইসলাম ও মুসলমানের কোন সম্পর্ক নেই। প্যারিস হামলার সে বিষয়টিই বারবার উঠেছে। দাবি উঠেছে আইএস-এর গডফাদারদের মুখোশ উম্মোচনের। তবুও একথা স্বীকার করতেই হবে যে, এ হামলায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতির সম্মুখীন ইসলাম ও মুসলমানরা।

তাই আগামী দিনের জন্য মুসলমানদের যেমন আত্মসচেতন হতে হবে, ঠিক তেমনি ভাবে বিশ্ববিবেককেও জাগ্রত ভূমিকা পালন করতে হবে। সনাক্ত করতে হবে প্যারিস হামলাসহ জঙ্গীবাদের নেপথ্যের কুশীলবদের এবং শান্তিময় ও বসবাসযোগ্য বিশ্ব গড়তে বিশ্ববাসীকে একযোগে কাজ করতে হবে। বেড়িয়ে আসতে হবে সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে।

(বি.দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।)

এসএইচ