রাজনৈতিকভাবে গত ৪০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ এখন সর্বোচ্চ আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশটিতে একদলীয় শাসন ফিরিয়ে এনেছে। ইতিহাস আমাদের বলছে, পরবর্তী পদক্ষেপ হবে একদলীয় শাসনকে সমন্বিত করে একদলীয় রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা।
কিন্তু ইতিহাস সবসময় রাজনীতির নিয়তি নির্ধারণ করে না। বাংলাদেশের পণ্ডিতরা বলে থাকেন, কোন কিছুর শেষ না হওয়া পর্যন্ত শেষ বলা যায় না। এক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের বিখ্যাত ভবিষ্যৎবাণীর কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। যখন বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হবে।
এখন সবকিছু আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচনী জরিপগুলো বলছিল, যে কোন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করতো। নির্দলীয় সরকারের অনুপস্থিতিতে পরাজয় দেখতে পাওয়ায় দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় ফলাফল ছিল অনুমেয়, আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে এবং বিএনপি পুরোপুরি নাস্তানাবুদ হয়েছে।
কিন্তু রাজনীতির বাইরেও বাংলাদেশের পরিচিতি রয়েছে। ১৯৭৫ সালের আগে যে ধরনের অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা, দরিদ্রতা ছিল দীর্ঘদিন থেকেই তা সেখানে অনুপস্থিত। অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ এখন দরিদ্র রাষ্ট্রের স্তরে থাকলেও গার্মেন্টস পণ্য এবং অন্যান্য দ্রব্য রপ্তানি করে দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত দুই দশক ধরে অর্থনীতি শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং দেশ উন্নতির পথে রয়েছে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাতে বাংলাদেশ ভাল করেছে। এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, যে ১৪৭টি আসনে নির্বাচন হয়েছে এসব আসনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
কিন্তু নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিপুল পরিমাণে জাল ভোট পড়া সত্ত্বেও ২০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। তবে বিশেষজ্ঞ সূত্র আমাকে জানিয়েছে, নির্বাচনে ১২ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়েছে। অথচ ২০০৮ সালে ৮৬, ২০০১ সালে ৭৪, ১৯৯৬ সালে ৭৫ এবং ১৯৯১ সালে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল।
ইতিহাসে দেখা গেছে, একদলীয় সরকারগুলো, তারা বৈধ অথবা অবৈধ যা-ই হোক তাদের অবস্থান সমুন্নত করার জন্য বিরোধীদের দমনের পথ বেছে নেয়া হয়, বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। নিয়ন্ত্রণমূলক পদ্ধতির অংশ হিসেবে তারা বিরোধীদের দেশদ্রোহী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনের আগেই এ প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। বিএনপি নেতাদের একটি বড় অংশকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং নির্বাচনের পর আরও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকতে আওয়ামী লীগ জামায়াত-বিরোধিতাকে ব্যবহার করে এবং শেষ পর্যন্ত একদলীয় শাসন কায়েমে সক্ষম হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আবার নির্বাচন আসবে। কিন্তু তার আগেই কি বাংলাদেশে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বিরোধী দল কি সেই ভবিষ্যৎ নির্বাচনের সময় পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে একদলীয় শাসনের যাঁতাকলে? এসব বিএনপির জন্য ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ। বিএনপির টিকে থাকা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একই সূত্রে গাঁথা।
গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও বৃদ্ধি করবে এমন একটি এজেন্ডা দেশটির ৪৮ মিলিয়ন ভোটারকে কাছে টানবে। বেগম জিয়ার উচিত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ত্যাগ করা।
১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে তার সমর্থন করা উচিত। এ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতার ভঙ্গের অভিযোগ আর থাকবে না। এর পাশাপাশি পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি থেকে বিএনপিকে একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দলে পরিণত করতে হবে। সেটা করাও এক বড় চ্যালেঞ্জ এবং তা খুবই কঠিন।
লেখক: ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
উৎস: মানবজমিন
মতামত
বাংলাদেশ, একদলীয় শাসনে ফেরা: উইলিয়াম বি মাইলাম
রাজনৈতিকভাবে গত ৪০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ এখন সর্বোচ্চ আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশটিতে একদলীয় শাসন ফিরিয়ে এনেছে। ইতিহাস আমাদের বলছে, পরবর্তী পদক্ষেপ হবে একদলীয় শাসনকে সমন্বিত করে একদলীয় রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা।





