বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে একটি মুক্তির নাম, একটি মানবিক শক্তির নাম, একটি চেতনার নাম। ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আজ ১৫ই আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙ্গালি জাতির জন্য একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কলঙ্কিত দিন। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বাঙ্গালির ইতিহাসের এই মহান প্রবাদ-প্রতিম পুরুষকে।
সেদিন কিছু বিপদগামী সেনা কর্মকর্তা ও তার পেছনে ইন্ধনদাতারা মনে করেছিল শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারলেই বাংলার আকাশ থেকে এই উজ্জল নক্ষত্রটি খসে পড়বে। কিন্তু সময়ের পথ পরিক্রমায় ও বিভিন্ন ঘটনা-প্রবাহ বিশ্লেষণের আলোকে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে তিনি ইতিহাসের সন্তান নন, বরং তিনি ইতিহাসের নির্মাতা। তাই ইতিহাসের পক্ষে তাকে কখনও উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
আজকের বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে আসে, আর তা হল যে ত্যাগের মন্ত্রে শেখ মুজিব একজন পাহাড়সম মানুষ ছিলেন, তার উত্তরসূরিদের আজ কি অবস্থা? বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কতটা ধারণ করতে পেরেছেন তার অনুসারীরা? এর উত্তরে হয়ত একেকজন ভিন্ন ভিন্ন মতামত পোষণ করবেন। তবে আমার দৃষ্টিতে বিষয় ঠিক এ রকম-- বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বা তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন অনেক পরের কথা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বা স্বপ্ন সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কি ছিল তা তার অধিকাংশ উত্তরসূরিরাই সঠিকভাবে আজ তা জানেন না।
বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার সপ্ন দেখেছিলেন, সেই সোনার বাংলার রূপ বা তার প্রকৃতি কেমন ছিল তা তার উত্তরসূরিদের কাছে আজও বোধগম্য নয়। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ অনুসারীরা কিভাবে বাস্তবায়ন করবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বা তার স্বপ্নকে।
বাস্তবতার বিশ্লেষণে যদি ফিরে আসি তাহলে আমরা দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরিরা আজ তার আদর্শের জায়গা থেকে অনেকটা বিচ্যুত। বঙ্গবন্ধুকে আজ তারা একটি বাণিজ্যিক পণ্য বা নামে রূপান্তর করেছে। যে নামের জিকির করলে কোটি কোটি টাকার ব্যাবসা করা যায়, যে নামের উছিলায় রাতারাতি বড়লোক হওয়া যায়, যে নামের বরকতে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার সুযোগ থাকে, যে নাম নিলে চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজি অনায়াসে কোনোরকম বাধা ছাড়াই করা যায়, যে নাম নেওয়ার কারণে সব অবৈধ কাজ বৈধভাবে করা যায়, ঠিক এমন একটি পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেছে তার অনুসারীরা।
কিছুদিন পূর্বে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক রাজনৈতিক সভায় নেতাকর্মীদেরকে শোক দিবসের নামে চাঁদাবাজি না করার জন্য সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, শোক দিবসের নামে চাঁদাবাজি করার মানেই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার শামিল। যোগাযোগ মন্ত্রীর এ ধরনের কথাবার্তা থেকে প্রমানিত হয় যে অতীতে শোক দিবসের নামে চাঁদাবাজি সংগঠিত হয়েছে যা অনেকাংশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ম্লান করে। এসব নিচু ও হীন কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে চাটুকার বৈশিষ্ট্যের নেতাকর্মীরা স্বাধীনতার এই স্বপ্নদ্রষ্টার উপর জাতির অধিকারকে খর্ব করে দলীয় সম্পদে পরিণত করেছে। যার ফলাফল হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সমালোচক হিসেবে যারা আছে তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ করে দেয় এসব আওয়ামী নেতাকর্মীরা।
আমাদের মনে রাখা উচিৎ যে সম্পূর্ণ দলীয় বৃত্তের বাইরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু জয় করেছিলেন জনগণের হৃদয়কে। তাই তাকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর ভেতর আবদ্ধ করে রাখা পক্ষান্তরে তাকে নিচু করার নামান্তর। অতএব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া উচিৎ নয় যা বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে বিতর্কিত করে কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ করে দেয়।
যে ত্যাগ ও নিষ্ঠার রাজনীতি বঙ্গবন্ধু করে গিয়েছেন, যিনি আপামর জনগণের স্বার্থে ও তাদের কল্যাণার্থে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, যিনি জনগণের অকৃত্রিম ভালবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন, ঠিক তার বিপরীতে তার দল ও উত্তরসূরিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখে বঙ্গবন্ধুকে চিনতে খুবই কষ্ট লাগে। আজ ভোগের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে তার দলের নেতাকর্মীরা লুটপাটের রাজনীতি করছেন।
বঙ্গবন্ধুকে আজ শুধু স্মরণ করা হয় রাজনৈতিক বক্তৃতায় কিংবা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে কথার ফুলঝুরির মাধ্যমে উপস্থাপনের মধ্যে দিয়ে। নীতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনই বঙ্গবন্ধুর ইতিবাচক কর্মকাণ্ডকে সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে না। আর সেজন্যই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী সকল ধারক ও বাহকদের এই দায়িত্ব নিতে হবে বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে সুন্দর ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চার ভেতর দিয়ে সুউচ্চ করে তুলে ধরার। তাই জাতি হিসেবে এটি সকলের প্রত্যাশা যে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করা হোক তার মহৎ রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বপ্নকে বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে।
সর্বোপরি, বঙ্গবন্ধু আমাদের গর্বের জায়গা, একটি সুন্দর জাতি বিনির্মাণের প্রেরণার উৎস এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আশা-আকাঙ্কার মিলনস্থল। আর তাই ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন "আমি হিমালয় দেখিনি, দেখেছি বঙ্গবন্ধুকে। তাঁর ব্যাক্তিত্ব ও নির্ভীকতা হিমালয়ের মতো। এভাবেই তার মাধ্যমে আমি হিমালয়কে দেখেছি।"
ভিনদেশী হয়েও ফিদেল ক্যাস্ট্রো চিনেছেন বঙ্গবন্ধুর মত হিমালয়সম ব্যাক্তিত্বকে। কিন্তু শুধু চিনতে পারিনি আমরা। অতএব সংকীর্ণ দলীয় মানসিকতা ও সকল মতামতের ঊর্ধ্বে উঠে বঙ্গবন্ধুকে এমন একটি স্থানে রাখা উচিৎ যাকে পুরো জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে, আর তার প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হবে জাতি। উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তির পানে ছুটে যাবে বাংলাদেশ। গড়ে উঠবে তার মত মহৎ হৃদয়ের মানুষ। ভালবাসা রইল বঙ্গবন্ধুর জন্য।
লেখক: শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ৪র্থ বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা, ১৫ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি, কেএইচ





