এক.
গত ১৬ জানুয়ারি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট বাংলাদেশের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রথম প্রস্তাবে সারা দেশে সহিংসতার বিস্তৃতি, বিশেষত সংখ্যালঘু ও অন্যান্য দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, হরতাল ও অবরোধে জীবনযাত্রার ব্যাঘাত ঘটানো ও দুই পক্ষেরই, সরকার ও বিরোধী দলের, সহিংসতা এবং সন্ত্রাসের নিন্দা করা হয়। প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, শুধু বিরোধী দল সন্ত্রাস করেছে, এটা বলা হয়নি; আওয়ামী লীগকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার সরকারকে সরাসরি আইন-শৃংখলা বাহিনীর সব ধরনের দমন-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করতে বলা হয়েছে। শুধু জেল-জুলুম হয়রানির কথা বলা হয়নি, বরং এই দমন-নিপীড়নের মধ্যে রয়েছে নির্বিচার গুলি ও ‘প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র’ (live ammunition) ব্যবহার, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মানুষ মেরে ফেলা ইত্যাদি। এগুলো ভয়ানক অপরাধ। বাংলাদেশে যারা এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তাদের জানা দরকার যে, আন্তর্জাতিক মহল যখন এভাবে সুনির্দিষ্ট করে কোনো কিছু চিহ্নিত করে, তার মানে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে থেকে এ অপরাধ করে আপাতত পার পাওয়া গেলেও কোনো না কোনো সময় জবাবদিহি করতে হতে পারে।
নির্বাচনের আগে ও পরে যেসব হত্যার ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর ‘দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ’তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। এটাও তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, আইন-শৃংখলা বাহিনীর যারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত তাদেরও যেন বিচারের অধীন আনা হয়। এই প্রস্তাব ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে খুবই কড়া প্রস্তাব। প্রস্তাবটি মূলত মানবাধিকার ও জনগণের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের পক্ষে নেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবের তাৎপর্য হচ্ছে, সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও সহিংসতার নিন্দা; ক্ষমতাসীনরা মানুষ হত্যা করছে তার স্বীকৃতি। প্রথম প্রস্তাবের পরপরই দ্বিতীয় প্রস্তাব তোলারও তাৎপর্য আছে। সারা দেশে সহিংসতার বিস্তৃতির জন্য দুই পক্ষকে দায়ী করার পরও আলাদা করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নিন্দা করা হয়েছে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের যখন তখন গ্রেফতারেরও নিন্দা জানায়।
তৃতীয় প্রস্তাবে প্রথম প্রস্তাবের অনুসরণে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আরও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ একটি সহনশীল দেশ, তা স্বীকার করেই প্রস্তাবটি করা হয়েছে। কোথাও বলা হয়নি যে, বাংলাদেশে মৌলবাদী কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তাণ্ডব করছে। কিংবা বাংলাদেশ তথাকথিত মৌলবাদীতে ভরে গেছে। এটা পরিষ্কার, বাংলাদেশের গরিব এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর নানা সময়ে নির্যাতন ঘটে। প্রস্তাবে শেখ হাসিনাকে বলা হয়েছে, যারাই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রদায়ের বিবাদ উসকে দিয়েছে, সবাইকেই যেন ‘কার্যকর’ শাস্তি দেয়া নিশ্চিত করা হয় (ensure effective prosecution of all instigators of inter communal violence)। অপরাধীদের মধ্যে ক্ষমতাসীনদের স্থানীয় লোকজনও অন্তর্ভুক্ত।
চতুর্থ প্রস্তাবে প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে তাদের সরকার পছন্দের সুযোগ দেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এই কাজটি দ্রুত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। রাজনীতির দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় আসতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সব দিক বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে। দরকার হলে আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির যারা সমর্থক এটা তাদের দাবিকেই সমর্থন করে। বিশেষত বাংলাদেশের সুশীল সমাজ এই দাবি করছে। আমি এর আগে আমার লেখায় অনেকবার বলেছি, বাংলাদেশের সুশীল সমাজের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রধান বিরোধ হচ্ছে সুশীলরা গণতন্ত্র চায় না, অর্থাৎ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার কিংবা রূপান্তর তাদের দাবি নয়। তারা বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই জোড়াতালি বা তাপ্পি মেরে চলার পক্ষপাতী। তারপরও বলব, খালেদা জিয়ার যদি কিছু করার হিম্মত না থাকে তো তাড়াতাড়ি আরেকটি নির্বাচন হলেই বা খারাপ কী? যদি হয়!
উপরের প্রস্তাব কার্যকর করার জন্য পঞ্চম প্রস্তাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে সব রকম ‘উপায়’ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও এনজিওদের অর্থ সাহায্যের কথাও বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব থেকে বোঝা যায় কয়েকটি ইউরোপীয় সংস্থা বাংলাদেশ নিয়ে এবং বাংলাদেশে খুব সক্রিয় হয়ে উঠবে। যেমন, European Instrument for Democracy and Human Rights and the Instrument for Stability, Office of the Promotion of Parliamentary Democracy (OPED) ইত্যাদি। বাংলাদেশে যেসব এনজিও নির্বাচন নিয়ে কাজ করে তাদের আরও অর্থ পাওয়ার ভালো একটি সুযোগ হল। তারা তাদের প্রজেক্ট এপ্লিকেশন করা শুরু করে দিতে পারে।
ছয় নম্বরে গিয়ে জামায়াত ও হেফাজত নিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। সাত নম্বর প্রস্তাব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে। প্রস্তাবের সার কথা ব্যাখ্যা করলে যা দাঁড়ায় তা হল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বলছে, তোমরা তো উভয়ে গণতন্ত্রী, এরকম একটা প্রচার আছে। তাহলে তোমরা পরস্পরকে সম্মান বা শ্রদ্ধা করতে শিখছ না কেন? শেখ। আদব-কায়দার সংস্কৃতি রপ্ত কর। এটা হল পাশ্চাত্য দেশগুলোর দেশীয় গোলামদের আদর-সহবত ঠিকমতো রপ্ত করার জন্য মধুর তিরস্কার।
ছয় নম্বরের উল্লেখযোগ্য দিক হল, বিএনপিকে জামায়াত বা হেফাজতে ইসলামকে সরাসরি ছাড়তে বলা হয়নি, কিন্তু তাদের কাছে থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। দূরত্বটা এমন হতে হবে, যাতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তাও সেটা কাতর অনুরোধ। কোনো হুমকি-ধমকি কিংবা কড়া নির্দেশ নয় (urges the BNP to unequivocally distance itself from Jamaat-e-Islami and Hafezat-e-Islam)। পরে মনে হয় ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে যারা বিশেষ বিশেষ লবির পক্ষে প্রস্তাব নেয়ার জন্য তদবির করে বেড়ায় তাদের মধ্যে দিল্লিওয়ালারা আছেন। দিল্লিকে খুশি করার জন্যই এই লাইনটি ঢুকল।
এরপর সাত নম্বরে বলা হয়েছে, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে সেসব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হবে এমন কথা কোত্থাও বলা হয়নি। বরং ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের যুক্তি মানলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ করা সম্ভব। সেটা প্রমাণ করাও কঠিন কিছু না। অসুবিধা কী? সাধারণ মানুষকে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলই সন্ত্রাসী। সহিংসতা ছাড়া তাদের কেউই রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারত না। সেটা দলীয় সন্ত্রাস হোক, কিংবা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। বিএনপিরও অতীত রেকর্ড ভালো নয়।
বাকি কয়েকটি প্রস্তাব আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বিডিআর বিদ্রোহের মামলার রায় সংক্রান্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অপরাধ বিচার করার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করে নিয়েছে পার্লামেন্ট। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডাদেশ সংক্রান্ত রায়ের ব্যাপারে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়ার বিধান বিলুপ্ত করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানানো। এর ফলে নাগরিকদের হয়রানি বাড়বে এবং সহজে নাগরিকদের ‘অপরাধী’ বলে অভিযুক্ত করা যাবে, যা বিপজ্জনক। বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি আইন বাতিলের দাবিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু।
দুই.
ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রস্তাব ব্যাখ্যা করে লেখা শুরু করলাম, কারণ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও সহিংসতার সহযোগী গণমাধ্যমগুলো দাবি করছে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রস্তাবের মূল সুরই নাকি বিএনপিকে জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলা। এটা ডাহা মিথ্যাচার। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রস্তাব আসলে ভারসাম্যের দিক থেকে বিএনপির দিকে, ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে কতিপয় গণমাধ্যমের চিৎকারের চোটে বিএনপি ভড়কে গেছে। ইসলামপন্থী দলগুলোর কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে পরাশক্তিগুলোকে খুশি করার ভুল চিন্তা বিএনপির মাথায় আবারও ভর করেছে বলে মনে হয়। বিএনপির মধ্যে এক দঙ্গল দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজ ভাবতেই পারে, কোনো আন্দোলন সংগ্রাম না করলেও ঢাকার কূটনৈতিক মহল তাদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেবে। যাতে তারা আবার লুটপাট করতে পারে। আফসোস, এরকম দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা এখনও পর্যন্ত ক্ষীণ! মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে বিএনপির মহাসচিব পদে বসিয়ে দিলেও সেটা সম্ভব কি-না সন্দেহ! খালেদা জিয়াকে আন্দোলনেই থাকতে হবে। রাস্তায় যারা জনগণের অধিকারের জন্য মরছে, পঙ্গু হয়ে ঘরে কাতরাচ্ছে, তারা যে দলেরই হোক, একবার তার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করলে তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বাংলাদেশে ‘জাতীয়তাবাদী’ রাজনীতির উদ্ভব ঘটেছিল তিন ঐতিহাসিক ধারার সন্ধিস্থল হিসেবে। এক. ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এ দেশের আলেম-ওলামাদের লড়াই এবং তার সঙ্গে যুক্ত জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগ্রাম, যাদের অধিকাংশই ছিল ধর্মসূত্রে মুসলমান- যারা পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছিল। দুই. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা- স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের জন্য যারা অস্ত্র ধরেছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক জিয়াউর রহমান যাদের কাছে নেতা, শেখ মুজিবুর রহমান নন। শেখ মুজিবুর রাজনীতিবিদ ছিলেন সন্দেহ নেই। তার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব তাকে দিতেই হবে। কিন্তু জিয়া বাংলাদেশের জনগণের বিশাল একটি অংশের কাছে সৈনিকতা ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মিলন চিহ্ন। বিএনপির ভুল রাজনীতির কারণে যা ম্লান হয়ে যেতে বসেছে। তিন. ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে যারা দিল্লির আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসন মেনে নেয়নি। লড়েছে। যদিও এদের অনেককে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে খালেদা জিয়া র্যা ব গঠন করে হত্যা করেছেন। জিয়াউর রহমান যা করেননি খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতার জন্য সেই কাজই করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারার কাছে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির নেতা হিসেবে খালেদা জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। অতীত কর্মকাণ্ড ও ইতিহাস বিচার এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে এখনকার শত্র“মিত্র চিনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই বিএনপির এখনকার কাজ। যেমন- ইসলামপন্থীরা বিএনপির মাথার ওপর বোঝা নয়, শক্তি। যদি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল হিসেবে খালেদা জিয়া তার দলকে গড়তে চান তাহলে বামপন্থীরা এ মুহূর্তে তার শত্র“ নয়, ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে মিত্র। অথচ এসব ইতিহাস ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তার দল পিছিয়ে আছে বিপজ্জনকভাবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি প্রণয়নে তার অস্পষ্টতা ও সঠিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, দোদুল্যমানতা ও ত্রুটি তাকে দ্রুত এমন এক গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গৌণ হয়ে যেতে পারেন।
ইসলামপন্থীদের দূরে ঠেলে দেয়া নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতন্ত্র কায়েমের জন্য কী ধরনের কর্মসূচি ও পদক্ষেপ দরকার সে বিষয়ে আন্দোলনে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে অবিলম্বে আলাপ-আলোচনা শুরু করাই এখনকার কাজ। প্রকাশ্যে সবার সঙ্গে বসে আন্দোলনের ভুল-ত্রুটি নির্ধারণ করা এবং প্রয়োজনে আত্মসমালোচনাই তাকে জনগণের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। খালেদা জিয়া ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র’ রক্ষার কথা বলেছেন। তার জন্য তিনি কমিটি গড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকে খোঁজ নিতে হবে কেন এই কমিটিগুলো গড়ে ওঠেনি। কারা বাধা দিয়েছে? আর যদি গড়ে উঠেই থাকে, তবে সেগুলো কোথায়? কই?
অন্যদিকে যদি কর্মসূচির কথা বলি, তাহলে আদতে তিনি তো এক দফা কর্মসূচি দিয়েই দিয়েছেন, সেটা হচ্ছে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা করা। এই কথাটাই বারবার জনগণের কাছে তাকে বলতে হবে। কিন্তু নিজের দেয়া কর্মসূচি তিনি নিজেই বারবার আড়াল করে দিচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে লম্বা থিসিস পেশ করা রাজনৈতিক নেতাদের মানায় না। লিখিত বক্তব্যও নয়। সরাসরি নিজের মনের কথা জনগণকে পেশ করার মধ্য দিয়েই তিনি আসলে কী চাইছেন সেটা সাধারণ মানুষ বুঝে নেবে। আর ওই একটি দাবিই বাংলাদেশের জনগণের এখনকার একমাত্র কর্মসূচি। একমাত্র গণদাবি। তিনি নিজে এই কর্মসূচিতে বিশ্বাস করেন আশা করি। তাহলে ভাঙা রেকর্ডের মতো সমঝোতা, আলোচনা, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ইত্যাদি পুরনো ও অর্থহীন কথাবার্তা তাকে পরিহার করতে হবে। এসব বারবার শেখ হাসিনার কাছে চেয়ে, হাত পেতে, তিনি নিজেকে তামাশার বস্তুতে পরিণত করছেন। সেই হুঁশটুকুও তিনি হারাতে বসেছেন।
এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা মনে করে তিনি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাদের রাস্তায় নামতে বলছেন। অন্যদিকে যারা জনগণের অধিকার হরণ করেছে তাদের দয়ায় ক্ষমতায় যেতে চান। শেখ হাসিনাকে সরিয়ে শুধু তাকে ক্ষমতায় নেয়ার জন্য জনগণ গুলির মুখে বুক পেতে দেবে? এটা আশা করা কি ঠিক? এটা অবশ্যই ঠিক যে, বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশেরই সমর্থন রয়েছে। কিন্তু সেই দাবির অর্থ তখনই থাকে, যখন শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন সংগ্রাম করার সুযোগ ক্ষমতাসীনরা দেয়। জনগণ আন্দোলনে নেমে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছে তত্ত্বাবধায়কের দাবি নিয়ে শুরু হলেও রাজনীতির মূল ইস্যু নির্বাচনকালীন সরকারের ধরনের মধ্যে আর আটকে নেই, বরং খোদ ক্ষমতার বিদ্যমান চরিত্র মোকাবেলা করাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। অতএব ক্ষমতাসীনদের পরাস্ত করা ও ক্ষমতার গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি সামনে চলে এসেছে আন্দোলনের নিজস্ব লজিক অনুযায়ী। আন্দোলন সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এ ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। অতএব এখনকার গণদাবি হচ্ছে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। এই উপলব্ধি না ঘটলে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। এই উপলব্ধির অভাব ঘটলে খালেদা জিয়া কোনোভাবেই আর সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন না।
শুধু বাংলাদেশের জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও এখন, তামাশার নির্বাচনের পরে, এই সাধারণ সত্যটুকু বোঝে, কিন্তু বিএনপি সম্ভবত বোঝে না। দিল্লির ভূমিকা সবার কাছেই পরিষ্কার। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও দিল্লির ভূমিকা বিপজ্জনক। পুরা দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। গত নির্বাচন যে নির্বাচন নয়, আর ক্ষমতাসীন সরকার যে আসলে বাংলাদেশের বৈধ কর্তৃত্ব নয়, এটাও সবার কাছে পরিষ্কার। মুখে বললেও বিএনপির কাছে এর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মানে পরিষ্কার কি-না সন্দেহ। যে কারণে এ পরিস্থিতিতে বিএনপি কী করতে চায়, সেটা পরিষ্কার নয়। দেশের মানুষের কাছে যেমন পরিষ্কার নয়, তেমনি বিদেশীদের কাছেও না- কারও কাছেই না। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জনমতের সুযোগ নিয়ে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার এক দফাকে সামনে রেখে পরিষ্কারভাবে একটি বিস্তারিত কর্মসূচি প্রণয়নই এখনকার কাজ। উদার রাজনৈতিক মতাদর্শের কাছে যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। জনগণের দিক থেকে বিচার করলে রাজনীতির যে মেরুকরণ ঘটেছে, তাতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পর্যায় অতিক্রম করে যাওয়ার এটাই একটি মাত্র পথ।
রাজনৈতিক অস্পষ্টতা থেকে দ্রুত নিজেকে মুক্ত না করলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া নিজেকে গৌণ করে তুলবেন। আন্দোলন ছাড়া তার সামনে কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি বিপ্লবী দল নয়, বুর্জোয়া দল। ঠিক আছে। কিন্তু বুর্জোয়া দল আর বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক আছে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল হিসেবে দেশে-বিদেশে সব পক্ষের কাছে আন্দোলনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার নীতি ও কৌশল নিয়ে অনেক কিছুই ভাবার আছে। অবশ্যই। কিন্তু তিনি দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের দলনেতা হবেন নাকি জনগণের গণতান্ত্রিক আশা-আকাংক্ষায় সাড়া দিয়ে তাদের ‘আপসহীন নেত্রী’ হবেন, সেই সিদ্ধান্ত একান্তই তার।
ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি(টাইমনিউজবিডি)// ইএইচ/জেআই