যাহা বলিব সত্য বলিব… কথাটি পুরাতন। বিচারকের সামনে সাক্ষী প্রদানের পূর্বে এই কথাগুলো বলে শপথ করানো হয়। সিনেমায় দেখা যায় ভিলেন বা তার লোক এই শপথ পড়ে মিথ্যে সাক্ষ্য দেয়। বাস্তবে যে এ রকম হয় না তা নয়। এই রকম কথার কথা শপথের কি মূল্য আছে, যারা অন্যায়ের সাগরে হাবুডুবু খায়। যাই হোক।
আজকের বিষয়টা সত্য সাক্ষ্য দেয়ার প্রসঙ্গ নয়। বর্তমান সময়ে সত্য গোপন কিংবা সত্য বলার খেসারত কিংবা সত্য দেখেও না দেখার তীব্র প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গে।
ঘটনা ১: ১৯৭২-৭৫ সালে তৎকালীন ছাত্র মৈত্রী নেত্রী বেগম মতিয়া চেীধুরী শেখ মুজিববিরোধী আন্দোলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন, শেখ মুজিবের গায়ের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজানো হবে। তার এই কথা তখন স্বাভাবিক মনে হলেও এখন নিশ্চয়ই তিনি তা স্বীকার করবেন না বা স্বীকার করলেও বলবেন তথ্য বিকৃতি ঘটেছে। কারন তিনি বর্তমানে আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা।
ঘটনা ২: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারসহ হত্যা করার পর ট্যাংকের উপর দাড়িয়ে পতাকা নাড়াচাড়া করেছিলেন তৎকালীন জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রশংসাকারীদের বা তোষামোদকারীদের মধ্যে অন্যতম। সেই সত্যটাও হয়তো তিনি স্বীকার করবেন না।
ঘটনা ৩: ২০০৭ সালে জরুরী সরকারের সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই নেতা শেখ ফজলুল করীম সেলিম এবং ওবায়দুল কাদের গ্রেফতার হয়ে ডিজিএফআইএর কাছে শেখ হাসিনা সম্পর্কে যে সকল কথাবার্তা বলেছিলেন তাতে শেখ হাসিনা তাদের উপর খুশী থাকার কথা নয়। এরপরও বহাল তবিয়তে আছেন কারন সেই সত্যকে তারা এখন স্বীকার করেন না।
ঘটনা ৪: জরুরী সরকারের সময় প্রয়াত আব্দুল জলিলও শেখ হাসিনা সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলেছিলেন এবং ২০০৯ সালে নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নেতিবাচক সত্য কথা বলার কারনে তাকে পাগল উপাধী দেয়া হয়েছিল। এবং পাগল উপাধী নিয়েই তিনি মৃত্যু বরন করেন।
ঘটনা ৫: বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের কন্যা শারমিন তাজ তার লেখা ‘তাজউদ্দিন আহমেদ: নেতা ও পিতা’ বইতে কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলেছেন যার দরুন তিনি এখন রাজাকার(!) এর তালিকায় চলে এসেছেন। সত্য না বললেই তার জন্য ভালো ছিলো।
ঘটনা ৬: কিছু দিন আগে রাজনীতির মাঠে আগুন ঝরানো বোলিং করে আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের ভুমিকা,শেখ মুজিবুর রহমানের ভুমিকা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও উপ অধিনায়ক এ কে খন্দকার ‘১৯৭১: ভিতর বাইরে’ বই লিখে রাজাকারের(!) খাতায় নাম লিখিয়েছেন।
কি দরকার ছিলো শেষ বয়সে এসে সত্য উপস্থাপন করার। ৪২ বছর ধরে যে মিথ্যার ভিত্তির উপর দেশ গড়ে উঠেছে সেই ভিত্তি ভাঙ্গার দরকার কী? খামোখা উনি সত্য বলতে গেলেন আর আওয়ামী লীগের চোখে দালাল,বেঈমান ইত্যাদি বিশেষ নামে ভূষিত হলেন। উনি হয়তো জানেন না আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সত্য বলতে নেই।
ঘটনা ৭: সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার করছে। ভালো কথা। এ জন্য বিরোধী নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার,দন্ড,ফাসী ইত্যাদি সাজা ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভিতরে যে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধাপরাধী আছে তাদের তো গ্রেফতার করা বা বিচারের আওতায় আনা হয়নি। ও সে তো সরকারী দলে আছে! নো টেনশন ওখানে থাকলে ১০০% নিরাপদ!
ঘটনা ৮: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী লীগের অনেক হম্বিতম্বি। তারা মুক্তিযুদ্ধ নেতৃত্বদানকারী ইত্যাদি ইত্যাদি। আচ্ছা কেউ কি কখনো প্রশ্ন করেছেন, তোফায়েল সাহেব আপনি কয় নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন? আমীর হোসেন আমু, নাসিম আপনারা কত নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা? প্রশ্নটা করেই দেখুন না আপনি গুমও হতে পারেন। কমপক্ষে তো রাজাকারের(!) খাতায় নাম লেখাবেন। কারন আপনি চেতনাকে নিয়ে টানাটানি করছেন, যা মারাত্বক অপরাধ!
ঘটনা ৯: আমাদের দেশে মিডিয়ার ভুমিকা সবসময় প্রশংসনীয়(!)। ‘যে দিকে বৃষ্টি পড়ে সে দিকে ছাতা ধর’ তত্ত্বের কারনে তোষামদিটা ভালোই পারে। একটা ঘটনাকে অন্য দিকে নিয়ে যেতে তাদের জুড়ি নেই। তবে ব্যতিক্রমও আছে। ব্যতিক্রম না থাকলে তো দুনিয়া চলেনা। একই ঘটনা সরকারী দলের জন্য একরকম আবার বিরোধী দলের জন্য আরেক রকম। সাবাস মিডিয়া!!!
ঘটনা ১০: আবার য্দ্ধুাপরাধী বিচার প্রসঙ্গ। যুদ্ধাপরাধী বিচারের রায়কে না মানলে আদালত অবমাননা হয় কিন্তু গনজাগরন মঞ্চ যখন রায়পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করে তখন আদালত অবমাননা হয় না। মান সন্মান কী এতো সহজ জিনিস, যে সামান্য ঘটনায় যায়।
ঘটনা ১১: পুলিশের ভুমিকার কথা সংক্ষেপে বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না। আমাদের দেশের পুলিশের সুন্দর(!), দ্বৈত, চতুর্মুখী ইত্যাদি ভুমিকা লিখলে বাজারে কলম এবং কাগজের শুন্যতা তৈরী হতে পারে। চামচামীর সীমার বাইরে যাওয়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসম্ভব কর্মদক্ষতায়(!) দেশ আজ সন্ত্রাস মুক্ত। মাঝে মধ্যে কিছু ঘটনা ঘটে যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই প্রতিদিন গোটা দশেক খুন, ১৫-২০টা চাঁদাবাজী ও ছিনতাই, ২০-২৫ টা নারী নির্যাতন, ৫-১০টা গুম, দুই একটা মানুষের গলাকাটা, কোটি কোটি টাকা লুট ইত্যাদি ছোটখাটো ঘটনা না ঘটলেতো পত্রিকার সার্কুলেশন বন্ধ হয়ে যাবে। পত্রিকার ব্যবসার কথা চিন্তা করে তারাএটুকু করতে দেয় এ জন্য পত্রিকাওয়ালারা তাদের বিশেষ ধন্যবাদ দিতে পারেন।
ঘটনা১২: এক পক্ষ ইটের টুকরা আরেক পক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র। সন্ত্রাসী কারা? অবশ্যই ইটের টুকরা ওয়ালারা। কারন তারা ধাক্কা দিয়ে বিল্ডিং ফেলে দিয়ে সেই ইটের টুকরা দিয়ে নি:ষ্পাপ (অস্ত্র হাতে) পুলিশ এবং ছাত্রলীগের সাথে লড়ার স্পর্ধা দেখায়। সে তো কম অপরাধ নয়। অবশ্যই তাদের সাজা হওয়া উচিৎ। এভাবে ইটের টুকরা দিয়ে মিছিল পিকেটিং করলে ভবিষ্যতে ইটের ব্যবসায় ধ্বস নামতে পারে। আর যদি তারাও অস্ত্র হাতে নিত তাহলে বাংলাদেশ অস্ত্র ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা আয় করতে পারত।
তবে সত্য সব সময় সত্য। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢাকা যায়না। সত্য একদিন স্বরুপে প্রস্ফুটিত হবেই। যে যাই বলুকনা গায়ের জোরে যে যাই করার চেষ্টা করুক না কেন সত্যের জয় অবসম্ভাবী।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী ও কলামিষ্ট
ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসআর





