বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধ করতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতের সীমান্তে গরু চোরাচালানদের বিরুদ্ধে কঠোর নজারদারি বাড়ানোর ফলে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এছাড়া গরু পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা হলে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম আরও ৭০ শতাংশ বেড়ে যাবে বলে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এই চোরাচালান বন্ধ করে বাংলাদেশের মানুষের গরু খাওয়াও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে চেয়েছেন তিনি।

গত ৩রা এপ্রিল ইকোনমিক টাইমস এর খবরে বলা হয়েছে, ভারতে প্রতিবছর ১ কোটি ২৫ লাখ গরু উৎপাদিত হয়। তার মধ্যে ২৫ লাখ গরু পাচার হয় বাংলাদেশে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ হলে দেশটিকে বছরে ৩১ হাজার কোটি রুপি বাড়তি খরচ মেটাতে হবে।

বাঙালি বড়ই ভোজন রসিক। এ ভোজন রসিকতা নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। সেসব যে কেবল গল্প তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে শতভাগ সত্যও বটে। রংপুর এলাকায় একটি গল্প প্রচলিত রয়েছে, 'ভাটিয়ারা (যারা চরাঞ্চলের মানুষ) কাঁঠালের সময়ে গরু বিক্রি করে হলেও কাঁঠাল খায়।' কারণ হিসেবে বলা হয়, তারা নাকি বিশ্বাস করে, টাকা হলে যেকোনো সময়ে গরু পাওয়া যাবে তবে টাকা থাকলেও সব সময় কাঁঠাল পাওয়া যাবে না।

আমরা অতিথিপরায়ণ জাতি। অতিথিপরায়ণতায় আমাদের অনেক সুনাম রয়েছে। বাড়িতে অতিথি আসলে আমাদের আয়োজনের শেষ থাকে না। অতিথিদের নিজেদের সাধ্য মতো আপ্যায়ণের চেষ্টা করা হয়। ছোটবেলায় অতিথি আসলে বেশ খুশি হতাম। কেননা, বাড়িতে অতিথি আসলে ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। অতিথির সুবাদে ভালো খাবারের ব্যবস্থা হওয়ায় সর্বদা অতিথি আসার কামনাও করতাম।

আমাদের সমাজব্যবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, বাড়িতে অতিথি আসলে তাকে মাংস দিয়ে ভাত না খাওয়ালে অতিথি বদনাম করতে পারেন বলে মনে করা হয়। তাই বদনামের ভয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি তাকে মাংস দিয়ে ভাত খাওয়াতে। মাংস খাওয়ানো আমাদের অতিথিপরায়ণতার প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেরা খেতে আর অতিথিদের খাওয়াতে দেশের মাংসের বাজারে আগুন লেগে গেছে।

দেহকে সুস্থ, সবল কিংবা কর্মক্ষম রাখতে খাদ্য গ্রহণ আবশ্যক। আমরা সচরাচর যে সকল খাদ্য উপাদান গ্রহণ করি তাদের মধ্যে মোট ছয় ধরনের উপাদান বিদ্যমান। আমিষ সেসব উপাদানের মধ্যে একটি গুরত্বপূর্ণ উপাদান। প্রাণি ও উদ্ভিদ উভয় জগৎ থেকেই প্রচুর পরিমাণে আমিষ জাতীয় খাদ্য পাওয়া যায়।

প্রাণিজ আমিষ হলো- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, পনির ইত্যাদি। আর উদ্ভিজ্জ আমিষ হলো-ডাল, বাদাম, মটর, ছোলা। প্রাণিজ আমিষের দাম বেশি হওয়ায় তা সবার পক্ষে সব সময় খাওয়া সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তাই বলে কি আমিষের চাহিদা পূরণ হবে না? আমরা অল্প দামে আমিষের চাহিদা পূরণ করতে পারি। আর সেটি করা সম্ভব উদ্ভিজ্জ আমিষ গ্রহণের মাধ্যমে।

ভারত আমাদের দেশে গরু আসতে না দিলেও আমাদের ক্ষতি নেই বরং লাভ। আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা লাগবে না আমিষের চাহিদা মেটাতে। এটি আমরা অন্য খাতে ব্যয় করতে সক্ষম হবো। আমাদের সামান্য খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে পারলে দেশের বিপুল পরিমাণ ব্যয় রোধ করা সম্ভব হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং হয়তো ভাবছেন, এদেশের মানুষ দামের ভয়ে মাংস খাওয়াই ছেড়ে দিবেন। আসলে সে রকম কি হতে পারে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে? যারা কাঁঠাল খেয়ে গরু বিক্রি করতে জানে তারা প্রয়োজনে বাস্তুভিটা বা ফসলি জমি বিক্রি করে যে মাংস খাবে না তা জোর গলায় বলা যায় না।

বাঙালি খুবই পরিশ্রমী জাতি। তাদের বোঝাতে হবে গরু উৎপাদন বেশ লাভজনক। তাহলে তারা এতে মনোযোগ দিবেন। আর তারা একবার মনোযোগ দিলে গরুর উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যেতে বাধ্য হবে। আমাদের দেশে তখন গরু বিপ্লব দেখা দিবে। আর গরু বিপ্লব দেখা দিলে বাঁচানো যাবে ৩১ হাজার কোটি টাকা আর বেড়ে যাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ।

গরুর মাংসের দাম এখন আকাশ ছোঁয়ার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এটি খাওয়ার সাধ্য আজ নীচতলার মানুষের নেই। গরুর মাংস এখন উপরতলার মানুষের খাবারে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এত দাম দিয়ে এটি কিনে খাওয়া কষ্টকর। এ মাংসের দামের প্রভাব পড়েছে অন্য মাংসের দাম কিংবা মাংসজাত দ্রব্যের উপরেও। তাই অনেকে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।

মাংস খাওয়া ছেড়ে দিলেই তো সমাধান হয়ে যাবে না। সমাধানের জন্য ভাবনা প্রয়োজন। আর ভাবনা দিয়েই বা কি হবে? ভাবনা অনুযায়ী কাজ ছাড়া প্রকৃত সমাধান আশা করা যায় না। সমাধান অতি সহজ। তবে সমাধানের জন্য আমাদের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে গরু উৎপাদনে নেমে পড়লে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং গরুর চালান বন্ধ করে আমাদের দেশের মানুষকে গরুর মাংস খাওয়ার থেকে দূরে রাখার কথা বলেছেন। আসুন দেখা যাক, আমরা যদি ভারতের গরুর মাংস না খেয়ে নিজেরা গরু উৎপাদনে নেমে পড়ি তাহলে এ উৎপাদনের মাধ্যমে কোন কোন বিষয়গুলো অর্জন করতে সক্ষম হবো-

প্রতিবছর দেশের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। দেশে গরুর উৎপাদন বেড়ে গেলে আমাদের আর সার আমাদানি করতে হবে না আব ব্যয় হবে না মুদ্রাও। তাছাড়া জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারে তৎক্ষণাৎ ফসলের উৎপাদন বেড়ে গেলেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। জমি ধীরে ধীরে তার উর্বরতা শক্তি হারায়। এক সময় ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে পরিবেশের বেশ বিপর্যয় দেখা দেয়।

আমাদের দেশে যখন থেকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে তখন থেকেই মাছের উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে দেশীয় মাছ আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। মাছ বাদেও কৃষকের বন্ধু ব্যাঙ যে ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ক্ষতির হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করে সেও হারিয়ে যেতে বসেছে। বাসায়নিক সার ব্যবহৃত ফসল খেয়ে মানুষ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মানুষসহ অন্যান্য পশুপাখির মধ্যে বন্ধ্যাত্বও বেড়ে গেছে। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবরের মতো উপকারী জৈব সার ব্যবহার করলে এসব সমস্যা অনায়াসেই এড়ানো সম্ভব। পরিবেশ রক্ষা ও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে গোবরের বিকল্প আর কিছু হতে পারে না।

গরুর চামড়া মূল্যবান সম্পদ। দেশে গরুর উৎপাদন বাড়লে চামড়ার রপ্তানিও বেড়ে যাবে। ফলে বাংদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নিঃসন্দেহে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আর বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ বাড়লে সরকারের পক্ষে দেশের উন্নয়নমূলক কাজ করাও সহজ হবে।

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিদ্যুতের সমস্যা প্রকট। আমাদের বিদ্যুৎ ঘাটতি লেগেই থাকে। সরকারকে বিদ্যুৎ খাতে বৃহৎ একটা অংশ ব্যয় করতে হয়। সরকারের এত প্রচেষ্টার সত্ত্বেও এখনও দেশের অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয় নি। দেশের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় এ সংযোগ দেওয়া সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তাছাড়া আমাদের দেশে গ্যাসের মজুতও সীমিত। ফলে এদেশে গ্যাস সংকটও প্রকট।

আমাদের গরুর উৎপাদন বাড়ানো গেলে এসব সমস্যার সমাধান অনেক সহজ হবে। গরুর গোবর ব্যবহার করে বায়োগ্যাস প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে। ফলে দেশের বিদ্যুতের জাতীয় গ্রেডে চাপ কম কমবে এবং গ্যাসের জন্য হাহাকার করতে হবে না। বায়োগ্যাস আমাদের দেশের প্রাণ গ্রামগুলোয় আধুনিকায় সৃষ্টিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। দেশের বিদ্যমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ গাছপালা ধ্বংস হয় তাও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

বেকারত্বের বেড়াজালে বন্দী দেশের বৃহৎ একটা অংশ। ফলে হতাশায় নিমজ্জিত কর্মঠ এ অংশকে আলোর পথে আনতে সহায়ক হতে পারে গরুর উৎপাদন। গরুর খামারে কাজ করতে প্রয়োজন হয় অনেক লোকের। তাছাড়া গরুর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন পড়ে ডাক্তারের। আমাদের দেশে পশু চিকিৎসকের সংখ্যা নগন্য। দেশের বেকারদের মধ্যে যারা শিক্ষিত তাদের পশু চিকিৎসার প্রশিক্ষণ প্রদান করলে তারা দেশের পশু চিকিৎসায় অবদান রাখতে পারবে আর সেই সাথে দেশের বেকারত্বের হারও কমে যাবে।

আমরা গরীব দেশের নাগরিক। এদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এ পুষ্টিহীনতা দূর করতে সহায়ক হতে পারে সুষম খাদ্য হিসেবে পরিচিত দুধ। দেশে গরুর উৎপাদন বেড়ে গেলে দুগ্ধজাত শিল্পেরও উন্নয়ন সাধিত হবে। দেশের দুগ্ধজাত শিল্পের বিকাশ হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে গুঁড়া দুধ বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব হবে।

গরুর মাংসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে উপসাগরীয় দেশসমূহে। ভারত এসব দেশে মাংস রপ্তানি করে আয় করে থাকে। গরুর উৎপাদন বাড়িয়ে আমাদের চাহিদা পূরণ করার পর আমরাও সেসব দেশে মাংস রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি।

রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশের খাল-বিল, নদী-নালা, হাওড়-বাওড় এ মাছ উৎপাদন কমে গেছে বহুল পরিমাণে। তবে খামার পর্যায়ে মাছ উৎপাদনে আমরা আগের চেয়ে অনেক এগিয়েছি। এসব মৎস খামারে মাছের খাদ্য হিসেবে গরুর গোবর ব্যবহৃত হয়। গরুর উৎপাদন বাড়লে খামার পর্যায়ে মাছের খাদ্যের উপাদনও বেড়ে যাবে। ফলে মাছের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।

ধন্যবাদ জানাচ্ছি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংকে। তিনি সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রকৃত বন্ধুর মতো কাজ করেছেন। আমাদের মধ্যে চেতনা ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমাদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। এতদিন ভারতের গরুর মাংস খেয়ে আমরা নিজেদের গরু উৎপাদনের কথা ভুলতে বসেছিলাম। সময় এসেছে গরু উৎপাদনের, সময় এসেছে দেশের অর্থনীতির গতি পরিবর্তনের। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর পদক্ষেপ যেন আমাদের অর্থনীতির গতি পরিবর্তনে আশার আলো দেখাচ্ছে। তার কঠোর পদক্ষেপ যেন আমাদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনার হাতছানি দিচ্ছে। সময় এসেছে সেই হাতছানি বা আশাকে বাস্তবে রূপায়নের।

ভাষার জন্য যে জাতি প্রাণ দিয়েছে তাদের কাছে গরুর মাংস ত্যাগ কোনো বড় বিষয় হতে পারে না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে আমাদের কয়েক বছর গরুর মাংস খাওয়া কমে দেয়া যায় কিংবা বিকল্প হিসেবে মুরগী বা অন্য কোন পশুপাখির উৎপাদন বৃদ্ধি করে গরুর মাংসের অভাবটা পূরণ করা সম্ভব। আমরা সেদিনের স্বপ্ন দেখি যেদিন আমরা নিজের দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত গরুর মাংস, চামড়া কিংবা গুঁড়া দুগ্ধ রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবো। এ কাজের সফলতা দেখে সারা বিশ্বের মানুষ আমাদের বাহবা দিবে। আমরা পারবো কি সেই লক্ষ্যে পোঁছাতে?

লেখক: মোঃ মাইদুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: [email protected]

কেএইচ