সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ১৫ ডিসেম্বর ৩৪টি দেশের সমন্বয়ে সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। এ জোটের তালিকায় বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানকে এ জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি।

জোট গঠনের ধরণ এবং তড়িঘড়িভাব দেখে নানা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে সৌদি জোটে যেসব দেশের নাম ঘোষণা করা হয়েছে তাদের সবাই ঠিকমতো জানেও না। প্রশ্ন উঠেছে-এ জোটে যে চারটি দেশকে নেয়া হয় নি তারা কী মুসলিম দেশ নয়? কার নির্দেশে কেন হঠাৎ করে এ জোট গঠন করা হলো সেও এক মস্ত প্রশ্ন।

আবার যারা জোট গঠনের উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধেই তো সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রাবাদে সমর্থন এবং পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাহলে তারা কী করে সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াইয়ের জন্য জোট গঠন করে? কতটা নৈতিক তাদের এ উদ্যোগ?  

কীভাবে তৈরি হলো এ জোট?

মজার বিষয় হচ্ছে- আমরা মিডিয়া কর্মীরা কেউ কিছু জানতে পারলাম না; অনেক দেশও ঠিকমতো এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে তাও শুনেনি। মঙ্গলবার সকালে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় একটি খবরে নজর বুলাতে গিয়ে প্রথম চোখে পড়ল সৌদি আরব ঘোষিত অদ্ভূত এ জোটের কথা! চোখে পড়ল বাংলাদেশও এ জোটের সদস্য! পরবর্তী তথ্য থেকে যা বোঝা গেল তা হচ্ছে- অনেক দেশ জানেই না কথিত এ জোটের কথা; নিতান্তই একটি নোটিশ দিয়ে অথবা ফোন করে জানানো হয়েছে- “তোমরা আছ এ জোটে।”

কারা এ জোটের সদস্য: সৌদি নেতৃত্বাধীন এ জোটের ৩৪টি দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন, বাংলাদেশ, বেনিন, চাদ, কোমোরোস, কোট দ্য আইভরি, জিবুতি, মিশর, গ্যাবন, গিনি, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মালি, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, নাইজার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, কাতার, সেনেগাল, সিয়েরালিওন, সোমালিয়া, সুদান, টোগো, তিউনেসিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।

ঠিক মতো জানে না বাংলাদেশ: সৌদি নেতৃত্বে এই জোটের কাজ কি হবে, সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা কি হবে সে সম্পর্কে কম-বেশি অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “প্রাথমিক আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। রিয়াদের কাছে এই উদ্যোগের বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যের মানে হচ্ছে- এ উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ বিস্তারিত জানে না।

শাহরিয়ার আলম জানান- "প্রাথমিক আলোচনায় সৌদি আরব আমাদের যে ধারণা দিয়েছে, তা হচ্ছে এটা যুদ্ধ করার সামরিক জোট নয়। এটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি কেন্দ্র হবে। অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যাপারেও গুরুত্ব দেয়া হবে।" কিন্তু সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, সামরিক অভিযানের জন্য রাজধানী রিয়াদে যৌথ কমান্ড সেন্টার স্থাপন করা হবে। সামরিক অভিযানের জন্য যৌথ কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠা আর গোয়েন্দা তথ্য কেন্দ্র স্থাপন এক কথা নয় সেটা পরিষ্কার। অতএব, ঘোরপ্যাচ একটা থেকেই গেল।

শাহরিয়ার আলম বলেন, “সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, তারা রিয়াদে একটি সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্র করতে চান। সন্ত্রাস ও উগ্র সহিংসতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের জিরো টলারেন্স এবং যে অবস্থান রয়েছে, সেজন্য তারা বাংলাদেশকে এই উদ্যোগে রাখতে চায়। ফলে আমরা এই উদ্যোগে যোগ দিয়েছি।”

কিন্তু সৌদি আরবের ঘোষণায় নতুন এই জোটকে সন্ত্রাস-বিরোধী সামরিক জোট হিসেবে বর্ননা করা হয়েছে। রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ৩০ বছর বয়সী যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান বলেছেন, এই জোট ইরাক, সিরিয়া, মিশর এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তিনি বলেন, ইসলামিক দেশগুলো এই রোগের সঙ্গে লড়ছে যা এসব দেশের ভাবমর্যাদাও ক্ষুণ্ন করছে। "এখন প্রতিটি দেশ আলাদাভাবে এর সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু এই জোটের মাধ্যমে দেশগুলো একত্রে লড়াই করবে।"

তবে এর বেশি জানান নি যুবরাজ সালমান। মজার বিষয় এই জোটের অধীনে সৈন্য পাঠাতে হবে কিনা বা সামরিক বিষয়ে কী ধরনের সহযোগিতার প্রশ্ন আসবে, এসব বিষয়ে বাংলাদেশ বিস্তারিত জানতে পারে নি। অথচ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে জোটের সদস্য করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম অবশ্য বলেছেন, নতুন এই উদ্যোগে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো শর্ত নেই। সদস্য দেশগুলো স্ব স্ব অবস্থান এবং সামর্থ্য থেকে সহযোগিতা করতে পারবে। সেখানে সন্ত্রাস-বিরোধী তথ্য বিনিময়ে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘের অধীনেই শুধু শান্তিরক্ষায় সৈন্য পাঠানোর একটা নীতিগত অবস্থানে বাংলাদেশ রয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, নতুন জোটে কখনো সৈন্য পাঠানোর প্রশ্ন থাকলে তাতে বাংলাদেশের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আব্দুর রব খান বলেছেন, ইরানের মতো বড় শক্তিকে বাদ দিয়ে এই জোট হলেও বেশিরভাগ মুসলিম দেশের সঙ্গে থাকাটা বাংলাদেশের জন্য ব্যতিক্রমী কিছু নয়। তবে বাংলাদেশ কীভাবে ভূমিকা রাখবে সেটাই দেখার বিষয়।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ দাবি করেছে, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো ১০টি মুসলিম দেশ এই জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রিন্স মুহাম্মদ বলেন, “এই জোটে যোগ দেয়ার আগে এ দেশগুলোকে কিছু পদ্ধতির মধ্যদিয়ে আসতে হবে।” তবে কী সেই পদ্ধতি তা পরিষ্কার নয়।

যেসব দেশকে জোটের শরিক বলে ঘোষণা দিয়েছে সেসব দেশ কী প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি অনুসরণ করেছে অথবা কোন যোগ্যতায় সদস্য হয়েছে তাও পরিষ্কার নয়। এখানেও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে- এ ১০টি দেশের মধ্যে আগ্রহ থাকার পরও কেন নেয়া হয় নি? তারা কী জোট গঠনের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে? অথবা সৌদি আরবের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে রাজি নয়?

বাংলাদেশ কী জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন ছাড়বে?

সৌদি নেতৃত্বে যে জোট গঠন হয়েছে তা যে সামরিক জোট সেটা পরিষ্কার হয়েছে খোদ সৌদি আরবের ঘোষণায়। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে- যদি বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দেয় তাহলে কী জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যামের সদস্য থাকতে পারবে?

বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকে জোট নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। তাহলে সুদীর্ঘ দিনের সেই ঐতিহ্য-ইতিহাস কী এবার নস্যাৎ করে দেবে? কেন এই ঝুঁকি নেবে বাংলাদেশ? সৌদি আরবে বাংলাদেশের যে কয়েক লাখ জনশক্তি রয়েছে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে -এমন ভয় দেখাচ্ছে কী সৌদি আরব? যদি তেমনটি হয় তাহলে এই জোটে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব নেই বরং তুলনামূলক দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে জোর করে পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করছে সৌদি সরকার। মুসলিম ও ইসলামের দোহাই দেয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এসবের কিছুই নেই সেখানে।

জোটের আসল লক্ষ্য কী?

সৌদি আরব জোড়াতালি দিয়ে ৩৪ জাতির যে ইসলামি জোট গঠন করল তা লড়াইয়ের ময়দানে তেমন কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেকজান্ডার পেরেন্দঝিয়েভ।

তিনি বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যাতে সৌদি আরবের নেতৃত্ব ধরে রাখা যায় তা নিশ্চিত করার জন্য এ জোট গঠন করা হলো। এছাড়া, রাশিয়ার সাহায্য ছাড়াই সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে যাতে অন্য জোটগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যায় সেটিও তাদের আরেকটি লক্ষ্য।

সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন সালমান বলেছেন, জোটের সদস্য দেশগুলো ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর এবং আফগানিস্তানের “শুধু আইএস নয় যেকোনো সন্ত্রাসী সংগঠন” এর বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে সামরিক অভিযান চালাবে স্থানীয় আইন অনুসারে।

এ বিষয়ে পেরেন্দঝিয়েভ বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সৌদি আরব এ জোট গঠন করছে না বরং অর্থের প্রবাহ ও অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব জোরদার করার জন্য জোট গঠন করছে। এ জোটের প্রধান সমন্বয়কারী হবে সৌদি আরব।

তিনি বলেন, এই সৌদি আরবই সিরিয়া ও ইরাকে তৎপর উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, রাশিয়া এ জোটকে সহযোগিতা করতে পারে তবে সে সহযোগিতা খুব সামান্যই কার্যকরী হবে। সেখানে সত্যিকারের সহযোগিতা থাকবে না বরং এ জোট গঠনের পর আমরা যা দেখব তা হচ্ছে- সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনাকরী বিভিন্ন জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা।

ইরান, ইরাক, সিরিয়া নেই কেন?

সৌদি নেতৃত্বে মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে সামরিক জোট গঠন করা হলেও তাতে নেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান, ইরাক, সিরিয়া এবং আফগানিস্তান। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এসব দেশকে রাখা হয় নি? এই দেশগুলোইতো সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় শিকার। অথচ সৌদি আরব ঘোষণা করেছে যে, তারা ইরাক, সিরিয়া, মিশর এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। যেসব দেশে সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াই চলবে তাদেরকেই রাখা হয় নি জোটে! এখানেই এ জোট গঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে- সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো তথা ন্যাটো গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে দেশে যে সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে তার সঙ্গে এ জোটের কী পার্থক্য থাকবে? ইরাক, সিরিয়া আফগানিস্তান কী সন্ত্রাসীদের জন্মদাতা? আল-কায়েদা, আন-নুসরা, আইএস- এসব উগ্র সন্ত্রাসী সৃষ্টিতে সৌদি আরবের ভূমিকা নেই?

সৌদি আরব, তুরস্ক এবং আরো কয়েকটি আরব দেশ অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং আশ্রয়-প্রশয় দিয়ে এসব সন্ত্রাসী সংগঠনকে শক্তিশালী করে তুলেছে। তাহলে সে সৌদি আরব কী করে সন্ত্রাস-বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দেয়? সেই জোটে রয়েছে তুরস্ক, কাতার, আরব আমিরাত, জর্দান। তারা কী উগ্র সন্ত্রাসীদেরকে কম সমর্থন দিয়ে আসছে? আমেরিকা যেমন সাদ্দাম কিংবা তালেবান সৃষ্টি করে পরে সেই সাদ্দাম ও তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে ইরাক-আফগানিস্তানের অন্তত ২০ লাখ মানুষ হত্যা করেছে তেমনি সৌদি আরব ও তার কয়েকটি মিত্র দেশ সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদদাতা হওয়ার পরও অর্থ এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে কথিত সন্ত্রাস-বিরোধী জোট গঠন করতে পারছে।

নিশ্চয় এ জোট সামরিক অভিযান চালালে তাতে মুসলমানই মরবে। তবে সেই মুসলমান কারা হবে তা এক বড় প্রশ্ন; কারণ জোট গঠনের ধরন থেকে মনে হচ্ছে নিয়্যতে গড়বড় রয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবে যে সন্ত্রাসবাদ নেই তা তো নয়। এই তো গত কয়েকদিনে সৌদি আরবে কয়েকদফা মসজিদে বোমা হামলা হয়েছে। তাহলে সে দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলবে না কেন? কেন প্রাথমিক টার্গেট ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তান? আবার এসব দেশ যদি অনুমতি না দেয় তাহলে কী হবে? তখন তো এসব দেশে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে জোটকে। তাহলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে কী হিতে বিপরীত হবে না?

কেন এই ভাগাভাগি?

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে ইরান, ইরাক ও সিরিয়াকে না রাখার দৃশ্যত অর্থ হচ্ছে- শিয়াপ্রধান দেশগুলোকে বাদ দিয়ে জোট গঠন করা হলো। বিষয়টি যদি এমন হয় তাহলে পরিষ্কার করে বলা যায়- সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করতে নয় বরং বিভক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই জোট গঠন করেছে। যে দেশ মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভক্ত করে সে দেশ কী মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখে?

এই যে সম্প্রদায়গত বিভক্তির চিন্তা সেটাও তো ভয়াবহ উগ্রবাদের জন্ম দেয়। তাহলে এই জোট কীভাবে সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে? মুসলিম স্বার্থ রক্ষার নাম করে শিয়া-সুন্নির বিভেদ সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হচ্ছে এই জোটের মাধ্যমে। অথচ নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইলের অত্যাচার ও বর্বরতার বিরুদ্ধে এ জোট লড়াইয়ের কোনো ঘোষণা দেয় নি।

বাঘ-ছাগল এক ঘাটে পানি খেল!

সৌদি নেতৃত্বাধীন সদ্য জন্ম নেয়া জোটে অদ্ভূত ঘটনা ঘটেছে। এ জোটে রয়েছে মুসলিম বিশ্বের কথিত ‘ক্যারিসম্যাটিক নেতা’ তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান। সেখানেই রয়েছেন তুরস্কের জানি শত্রু মিশরের সেনা শাসক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। মিশরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ব্রাদারহুড নেতা ড. মুহাম্মাদ মুরসিকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন এই জেনারেল সিসি। মুরসিকে উৎখাতের জন্য সব রকমের সমর্থন দিয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। ক্ষমতাচ্যুত করার পর দেশটিতে হাজার হাজার মুসলিম প্রতিবাদকারীকে হত্যা করেছে সিসির সরকার। সেই কাজেও সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরব।

শুধু তাই নয়, মুরসির ব্রাদারাহুডকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সৌদি আরব এবং অন্য আরব দেশ। মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিশরে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন গেছে তার জন্য প্রধান দায়ী এই সৌদি আরব। সিরিয়ায় একই ভূমিকা রেখেছে সৌদি আরব। তুরস্কের ভূমিকাও এমন। এখন তারাই মুসলিম দেশগুলোতে সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াই করবে! ভাবতে অবাক লাগে।

যাহোক, মুরসিকে উৎখাত করার পর তার শোকে চোখের জলে বুক ভিজেছে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের। তিনি এখনো সে শোক ভুলতে পারেন নি বলে মনে হয়। সেই শোকে কাতর হয়ে তিনি নাকি সিরিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুড ভাইদের বাঁচানোর জন্য সংগ্রামে নেমেছেন। অথচ যে সিসি মিশরে ব্রাদারহুড কর্মীদের খুন করছেন সেই জানি দুশমন সিসির সঙ্গে এক টেবিলে বসে সন্ত্রাস দমনের পরিকল্পনা করবেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান।

এরদোগানের ব্রাদারহুডের চেতনা এখানে শেষ করে দিল সৌদি আরব? সৌদি রাজা-উজিররা কী তাহলে বাঘ-ছাগলকে এক ঘাটে পানি খাওয়ালো? নাকি ৩০ বছরের সৌদি প্রিন্সের সামনে মুসলিম বিশ্বের ‘উদীয়মান খলিফা’ এরদোগানের চেতনা শেষ! নাকি তার সম্ভাব্য নেতৃত্ব খতম করে দিতে সৌদি আরব আগেভাগেই একটা জোটের নেতা হয়ে বসল?

সব স্বৈরশাসকের ভরসাস্থল সৌদি আরব

২০১০ সালের শেষ দিকে এবং ২০১১ সালের প্রথম দিকে যে আরব বসন্ত দেখা দিয়েছিল তার প্রথম শিকার তিউনিশিয়ার স্বৈরশাসক জয়নাল বেন আলী। গণজোয়ারের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে তিনি পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মিশরের স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের আঞ্চলিক প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল সৌদি আরব। আরব অঞ্চলের সব অনির্বাচিত রাজা-বাদশাহ আমির-ওমরাহ’র নেতা সৌদি আরব। বাহরাইনে যে গণআন্দোলন চলছে সেই গণআন্দোলন দমন করে রাজা হামাদ বিন ঈসা আলে খলিফাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে সৌদি আরব। মিশরে ক্ষমতার পালা বদল হলেও নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতায় থাকতে দেয় নি সৌদি আরব।

আরব অঞ্চলে যে গণজাগরণ দেখা দিয়েছিল তা কৌশলে দমন করে ইসরাইল ও মার্কিন সহায়তায় সিরিয়ায় নিয়ে ঠেকিয়েছে এই সৌদি আরব। ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দামকে বছরের পর বছর সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল সৌদি আরব। সাদ্দামের মাধ্যমে ইরানের ওপর আট বছরের যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল ইসরাইল-আমেরিকা-ব্রিটিশ চক্র। সেই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে অর্থ ও অন্য সব ধরনের সমর্থন দিয়ে এসেছিল সৌদি আরব।

ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহকে টিকিয়ে রাখতে কী না করেছে এই সৌদি আরব? আবার এখন যখন জনপ্রিয় আনসারুল্লাহ আন্দোলন গণবিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার কাছে তখন সেই গণবিপ্লব নস্যাৎ করার জন্য ১০/১২টি মুসলিম দেশকে সঙ্গে নিয়ে আট মাসের বেশি সময় ধরে দারিদ্রপীড়িত ইয়েমেনের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে যোগ দিতে বাধ্য করেছিল সৌদি আরব এবং আমেরিকা। সমসাময়িক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে মুসলিম দেশগুলোর প্রায় সব সংকট তৈরির সঙ্গে সৌদি আরবের নাম জড়িত।      

কার অ্যাসাইনমেন্ট?

সিরিয়া ও ইরাকে যেসব উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপর তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যে আন্তর্জাতিক জোট রয়েছে তার সদস্য সৌদি আরবসহ নতুন জোটের অনেক সদস্য। তাহলে আবার নতুন জোট কেন? ওই জোটে থেকে সন্ত্রাসীদের উৎখাত করা গেল না; নতুন জোট গঠন করে কী তা সম্ভব হবে? আবার মার্কিন নেতৃত্বাধীন এতবড় জোটের বিমান হামলায় আইএস’র লোমও ছিড়ল না তাও কী বিশ্বাস করতে হবে? যদি সত্যিই আইএস এতটা শক্তিশালী হয়ে থাকে তাহলে কারা সে শক্তি যুগিয়েছে? কোথায় পেয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র? কোথায় পায় এত প্রযুক্তি, এত লোকবল? কে দেয় তাদের বেঁচে থাকার রসদ? এসবের জবাবে যদি আমেরিকা, ইসরাইল, সৌদি আরব ও তুরস্কের নাম বেরিয়ে আসে তাহলে তারা কী সন্ত্রাস-বিরোধী জোট গঠনের ন্যূনতম নৈতিক অধিকার রাখে?

এখানে প্রশ্ন আসছে- এ জোট গঠন আসলে কার অ্যাসাইনমেন্ট? অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ধারণা করছেন- মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন এবং দক্ষিণ চীন ও পূর্ব চীন সাগর নিয়ে বিশ্ব এখন অনেকটা টালমাটাল অবস্থায়। এ পেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশংকা রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীন মিলে নতুন পরমাণু জোট গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম জোটের নাম করে পাকিস্তানকে সৌদি বলয়ে নিয়ে সেই জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে আমেরিকা। এ সমীকরণ থেকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন- এ জোট গঠনের প্রক্রিয়া মূলত আমেরিকার অ্যাসাইমেন্ট।

সৌদি আরব কী ভয় পাচ্ছে?

সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান হামলা শুরুর পর গত আড়াই মাসে সন্ত্রাসীরা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সেখানে চলছে ইরানের সামরিক পরামর্শ আর সিরিয়া ও রাশিয়ার কার্যকরী অভিযান। সিরিয়া অনেকটাই এখন মুক্ত। জানা যাচ্ছে- কথিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মিও সরকারি সেনাদের সঙ্গে মিলে আইএস এবং আন-নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

এছাড়া, তারা গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে রুশ বিমান হামলায় সহায়তা করছে। আশা করা হচ্ছে- সিরিয়া থেকে এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীদের বিদায় করা সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতায় টিকে যাবেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। পরিস্থিতি এমন হলে আরব বিশ্বে রাজতন্ত্র-বিরোধী গণজাগরণ দেখা দেবে আবার এবং সৌদি আরবসহ সব আরব দেশের রাজা-বাদশাহর ক্ষমতা হারানোর ভয় রয়েছে। সে লক্ষণ দেখেই কী সৌদি আরব সম্ভাব্য পরিণতি মোকাবেলায় মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে আগেভাগে জোট গঠন করছে?

হজ ট্রাজেডি; দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নেয়ার চেষ্টা

এবারের হজ মৌসুমে দু দফা ভয়াবহ ঘটনায় কয়েক হাজার হাজি মারা গেছেন। এর দায় সর্বাত্মকভাবে সৌদি সরকারের। অভিযোগ রয়েছে-সৌদি আরবের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স সালমান মিনার ট্রাজেডির দিন সেখানে হঠাৎ উপস্থিত হওয়ার কারণে তার নিরাপত্তা দিতে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তা বন্ধ করা হয়। এতেই বিপর্যয় ঘটে। যার কারণে কয়েক হাজার হাজি নিহত হয়েছেন।

এছাড়া, এই সালমানের বুদ্ধি-পরামর্শ ও চাপে ইয়েমেনে আগ্রাসন শুরু করেছে সৌদি আরব। সেখানে প্রতিদিন সৌদি ও অন্য আরব দেশের সেনা মারা যাচ্ছে। আট মাসের বেশি সময় ধরে বিমান হামলা চালিয়ে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ মারা গেছে। কিন্তু হুথি আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয় নি।

আবার পলাতক প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদিকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করা সম্ভব হয় নি। বরং বহুসংখ্যক সেনা অফিসারসহ সৌদি ও আরব অঞ্চলের সেনা মারা গেছে। হজ ট্রাজেডির দায় থেকে বাঁচানো এবং ইয়েমেনে সালমানের ব্যর্থতা ঢাকতে নতুন জোটের ঢাক পেটানো হচ্ছে কিনা সে প্রশ্নও ঘুরে ফিরে সামনে আসছে।

শেষ কথা

সৌদি আরবের নেতৃত্বে কথিত যে জোটের ঘোষণা দেয়া হয়েছে তার যেমন নেই সুনির্দিষ্ট কাঠামো তেমনি নেই পরিষ্কার রূপরেখা ও কর্মসূচি। কী তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, মুসলিম নাম দিয়ে আসলে কার বিরুদ্ধে এই জোট কাজ করবে -তাতেও গোলমাল রয়েছে। জোট গঠনের নামে বাংলাদেশসহ জনশক্তি রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিতে দুর্বল কতকগুলো দেশকে ব্ল্যাকমেইল করা হয় নি তারও নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া, এই জোট গঠন এখন কতটা অপরিহার্য সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। জোট গঠনের ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে- এ জোট বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ সাধন করবে না বরং সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিভক্তি বাড়াবে।

এছাড়া, গত এক দশকের অভিজ্ঞতা থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে, সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের নামে দেশে দেশে যেসব সামরিক অভিযান চলছে তাতে সন্ত্রাস কমে নি বরং বেড়েছে এবং আজকের এই মহিরূহ আকার ধারণ করেছে। সে ক্ষেত্রে নতুন করে আরেক জোট গঠন করে কী হবে?

কেন আরো কিছু দেশকে বিরান ভূমি বানানোর চেষ্টা করা হবে? অতএব উচিত হবে- এখনই এই কুৎসিত উদ্যোগ বন্ধ করা। অন্তত যেসব দেশ এতে রাজি নয় অথবা নিমরাজি তারা সহজেই বেরিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য; তার সেই মর্যাদা ধরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। এছাড়া, মুসলিম বিশ্বে শিয়া-সুন্নি সবার সঙ্গেই বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মূল্যবান সে ঐতিহ্যও ধরে রাখা দরকার মুসলিম উম্মাহর স্বার্থেই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান।

(বি.দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।)