বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জম্ম হয়েছে দলটির। বেশ কয়েকবার রাষ্ট্র পরিচালনাও করেছেন দলের নেতৃবৃন্দ। দেশের উন্নয়নে অন্যান্য সরকারের চেয়ে আওয়ামী লীগের ভূমিকা মোটেও কম নয়। কিন্তু বিগত ৫ জানুয়ারি ২০১৪-র নির্বাচনের মাধ্যমে দলটিকে ইমেজ সংঙ্কটে ফেলে দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন সচেতন সমাজ।
বঙ্গবন্ধুকে যারা আদর্শ হিসেবে নিজের মনের গহীনে লালন-পালন করেন, তারা অনেকেই এখন বলেন- বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো দেশের সাধারণ মানুষকে এ দিনটি আজ দেখতে হতো না। আর ৫ জানুয়ারির মত একটি নির্বাচন করে নিজের দলের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাতেন না। জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে দেশের চলমান ক্রান্তিকাল দূর করে একটি সুষ্ঠু সমাধান বের করে আনতেন তিনি।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে দেশে-বিদেশে অনেকেই বলছেন-বর্তমান সরকার ভোটার বিহীন। এ দেশের লাখ লাখ নাগরিক এখনও বলেন, “আমি তো ভোট দিতে গিয়ে দেখি আমার ভোট দেয়া হয়ে গেছে”। দেশের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ তো ভোট কেন্দ্রেই যায়নি। মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ টি সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহনই হয়নি। অর্থাৎ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এই সরকারের অর্ধেকেরও বেশি সংসদ সদস্য অনির্বাচিত। নির্বাচনের এক বছর কেটে গেলেও দেশের বেশির ভাগ মানুষই আজ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেননি বর্তমান সরকারকে।
অনেকেরই অভিযোগ, বিরোধী জোটকে দমন-পীড়নে বাংলাদেশের একটি সরকার ৫ বছরে যে নমুনা দেখিয়েছে তা একতরফা নির্বাচনের প্রধানমন্ত্রী এক বছরেই দেখিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ জোটের সিনিয়র নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেয়া হয়েছে প্রায় ৭ লাখ মামলা যার প্রায় সবই রাজনৈতিক হয়রানিমূলক ও মিথ্যা।
স্বাধীনতার ৪২ বছরে কোন সরকার, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, টেলিফোন, ফ্যাক্স, ডিস লাইন কেটে দিয়ে ইতিহাস রচনা না করতে পারলেও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে বিষয়ে সফলতা দেখিয়েছেন। গুলশান কার্যালয়ের সামনে জলকামান, বালির ট্রাক, মরিচের স্প্রেসহ সকল ধরণের নির্যাতন চালিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এত কিছু সহ্য করার পরও নিজের সামর্থ অনুযায়ী জনগণের মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র নেতাকর্মীরাও বার বার হুমকি দেন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের খাবার বন্ধ করে দেবেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার থেকে সেটা করেও দেখিয়েছেন। তার কার্যালয় ঘেরাও করা হবে। ক্ষমতাসীনদের এমন হুমকি ও বার বার আওয়ামীপন্থী ছোট ছোট সংগঠনের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘেরাও করতে যাচ্ছেন। সরকারী দলের এই ধরণের আচরনের কারণে আত্মরক্ষার জন্য খালেদা জিয়া নিজ উদ্যোগে তার কার্যালয়ে কাটা তারের বেড়া দিচ্ছেন।
বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে মাঠে নামতে দেয়া হচ্ছে না। তারা সবাই এখন ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা দিয়ে রেখেছে পুলিশ। জনগণের নিরাপত্তায় যথেষ্ট পুলিশ সদস্য দেয়া না হলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অর্ধ শত পুলিশ শুয়ে-বসে দিন কাটায়। বর্তমান সরকারকে সাধারণ মানুষ না চাইলেও কিছু বলতে বা করতে পারছেনা। এর অন্যতম কারণ হলো- সত্যি কথা বললেই সরকারি হামলা মামলা। আর আন্দোলনের জন্য রাস্তায় নামলেই গুলি। তাই ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অসহায়য়ের মতো সব কিছু মেনে নিতে হচ্ছে।
একটা রাষ্ট্র যদি এভাবে পরিচালিত হয়। তাহলে সেই রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের ভয় থাকাটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার জানে তারা যে অন্যায় করেছেন। এ দেশের মানুষ তাদের কখনো ক্ষমা করবেনা না। এই অন্যায়ের হিসাব এরশাদের মত তাদেরও দিতে হবে। এছাড়া তারা এও জানে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিলে তারা ২০ টি আসনও পাবে না। এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের নেতৃত্বাধীন সরকার আর চায় না। তাই মাননীয় সরকার প্রধান বিরোধী জোটের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বিভিন্ন স্থানে নিজ দলের নেতাকর্মীদের দিয়ে নাশকতা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমের বদৌলতে তার কিছু নজিরও দেখতে পেয়েছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জানুয়ারি ফেনী শহরের টেলিফোন ভবনের পাশে ৭টি পেট্রোলবোমাসহ পৌর আওয়ামী লীগ নেতার ভাতিজাকে আটক করেছে পুলিশ।
আটক ওই যুবকের নাম আজিম উদ্দিন (২৭)। সে ফেনী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিমের ভাতিজা ও ফরিদ আহাম্মদের ছেলে। রোববার দুপুর ৩ টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আটকের পর তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী টেলিফোন ভবনের পেছন থেকে লুকিয়ে রাখা ৭টি পেট্রোলবোমা, ১টি ককটেল ও একটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের কেসকি মোড় এলাকা হতে পেট্রোলবোমাসহ দুই যুবলীগ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের নাম মানিক ও বাবুল বলে জানা গেছে। আটক দু’জনই জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা।
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাত ১১ টার দিকে ওই দুই যুবলীগ নেতাকে আটক করা হয়। তবে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার চক্রবর্তী আটকের বিষয় অস্বীকার করে জানান, রোডে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি পেট্রোলবোমা উদ্ধার করা হয়েছে। কাউকে আটক করা হয়নি।
অন্যদিকে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় অফিসে অভিযান চালিয়ে ১০ টি পেট্রলবোমা ও ৪টি খালি বোতল উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
রোববার সকাল ৮টার দিকে এসব পেট্রলবোমা উদ্ধার করা হয়। ডবলমুড়িং থানার এসআই আজিজ সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
অন্যদিকে বিরোধী জোটের আন্দোলনকে জঙ্গি আখ্যায়িত করে দেশে-বিদেশে ভালবাসা কুড়ানোর চেষ্টা চলাচ্ছে সরকার। আর বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের ওপর সকল নির্যাতন জঙ্গি দমন করার নামে হালাল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে ধ্বংস করে দিয়ে চির জীবন ক্ষমতায় থাকার কুটকৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এসব কারণেই সংলাপ ও সমঝোতা চায় না সরকার ও তার দল।
লেখক: সাংবাদিক
(মতামতের জন্য টাইম নিউজ দায়ী নয়। মতামতের সকল বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব)





