গত ২১ ডিসেম্বর, বুধবার, রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক সংগঠিত ‘জেনোসাইডে’ শহীদদের সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ কিনা এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের মেইন্সট্রিম থেকে শুরু করে প্রায় সকল গণমাধ্যমগুলো এর পর থেকেই এ বক্তব্য নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। সরকার দলীয় নেতারা একের পর এক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে ইতিহাস আমার কাছে অমৃতের মত। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বহু পড়েছি। বেগম খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের পর মনের কৌতুহল থেকেই ইতিহাসের পাতা ঘেটে বেগম খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের সত্যতা এবং অসত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করার সামান্য প্রচেষ্টায় প্রয়াস নিয়েই কিছু রেফারেন্স ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজ-এর সিনিয়র গভেষক এবং সাংবাদিক শর্মিলী বোষ ২০১১ সালের ১লা এপ্রিল প্রকাশিত তাঁর ‘Death Reconing : Memories of the 1971 Bangladesh’ শীর্ষক বইয়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদের সংখ্যা ৫০০০০ (পঞ্চাশ হাজার) থেকে ১০০০০০ (এক লক্ষ) উল্লেখ করেছেন। যদিও পরবর্তিতে ‘বিবিসি’ এবং ‘দ্যা গার্ডিয়ন’ সহ বিভিন্ন পত্রিকায় এই সংখ্যার সমালোচনা করা হয়েছে।
২০০৮ সালে ‘British Medical journal’ এ প্রকাশিত রিপোর্টে Ziad Obermeyer, Christopher J. L. Murray, and Emmanuela Gakidou তাদের গভেষনার মাধ্যমে প্রকাশিত ‘Fifty years of violent war deaths from Vietnam to Bosnia: analysis of data from the world health survey programme’ রিপোর্টে ভিয়েতনাম যুদ্ধপরবর্তী পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংগঠিত যুদ্ধে নিহতদের উপর প্রকাশিত সংখ্যায় বলেছেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা ২৬৯০০০ (দুই লাখ ঊনষাট হাজার)। উকিপিডিয়াতে বাংলাদেশের প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, লেখক ও পণ্ডিত আহমদে শরীফ প্রকাশিত এই সংখ্যা সমর্থন করেন বলে বলা হয়েছে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের রিপোর্টটি লিংক নিম্নরূপ দেয়া হল। http://www.bmj.com/content/336/7659/1482। এই রিপোর্টি আরো দাবি করা হয়েছে যে, তাদের প্রকাশিত এই রিপোর্টি অসলোর Uppsala University এর Peace research institute এ প্রকাশিত নিহতের সংখ্যা ৫৮০০০ (আটান্ন হাজার) এর চেয়ে অনেক বেশি। পরবর্তী ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ এই রেফারেন্সের উদৃতি দিয়ে নিহতের সংখ্যা ২৬৯০০০ (দুই লাখ ঊনষাট হাজার) বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার লিংক্টি নিম্নরূপ http://timesofindia.indiatimes.com/world/rest-of-world/269000-people-died-in-Bangladesh-war-says-new-study-/articleshow/3147513.cms?referral=PM
২০১১ সালে Donald W. Beachler সম্পাদিত ‘The Genocide Debate’ বইয়ের ১৬ পৃষ্টায় প্রকাশিত রিপোর্টে আমেরিকের রাষ্টবিজ্ঞানী Richard Sisson এবং Leo E. Rose ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০০০০০ (তিন লক্ষ) বলে উল্লেখ করেছেন। একই পৃষ্টায় বলা হয়েছে, R. J. Rummel তাঁর ‘Democide’ গ্রন্থে এই সংখ্যা ১৫০০০০ (পনের লক্ষ) উল্লেখ করেছেন। একই পৃষ্টায় আরও বলা হয়েছে, এএমএ মুহিত ও রওনক জাহান মনে করেন এই সংখ্যা ৩মিলিয়ন বা ৩০ লক্ষ। কল্যান চৌধুরী মনে করেন এই সংখ্যা ১২৪৭০০০ (বার লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার)।বইটির রেফারেন্স লিংক সংযুক্ত করা হলো https://books.google.co.in/books?id=XeDHAAAAQBAJ&pg=PA16&lpg=PA16&dq=#v=onepage&q&f=false ।
একই ভাবে ২০১১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ৪০ বছর উপলক্ষে বিবিসির সাংবাদিক Mark Dummett ‘Bangladesh war: The article that changed history’ শিরোনামের আর্টিকেলে তৎকালীন ‘দ্যা স্যানডে টাইম’ এর সাংবাদিক অ্যান্থনী মাস্কারেণহাসের উদৃতি দিয়ে প্রকাশ করে, ‘Exact number of people killed is unclear – Bangladesh says it is three million but independent researchers say it is up to 500,000 fatalities’ অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার বলছে নিহতের সংখ্যা ৩০ লক্ষ কিন্তু, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ’। লিংক নিম্নরূপ : http://www.bbc.com/news/world-asia-16207201
১৯৭২ সালের জুলাইয়ে মুক্তিযুদ্ধের উপর পাকিস্থানের প্রধান বিচারপতি হামিদুর রহমানের সমন্বয় গঠিত মুক্তিযুদ্ধের উপর অনুসন্ধানী ‘হামিদুর রহমান কমিশন’ ১৯৭৪ সালের ২৩ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধের নিহতদের চূড়ান্ত রিপোর্টে প্রকাশ করে। এই রিপোর্টে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ২৬০০০ (ছাব্বিশ হাজার) বলে উল্লেখ করেন। যা হাস্যকর রিপোর্ট বলে সর্বমহলে বিবেচ্য।
২০১৪ সালের ৯ অক্টোবর ডেভিড বার্গম্যানের সমর্থনে ‘The Pamphleteer’s Press’ এ Lawrence Lifschultz তাঁর লেখা প্রবন্ধ বলেন, ১৯৭৪ সালে আমি যখন ‘Far Eastern Economic Review’ র এই অঞ্চলের প্রতিনিধি ছিলাম তখন মুক্তিযুদ্ধে নিহতর সংখ্যা সমন্ধে হিসাব করার জন্য স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ভাগ্যক্রেমে এই কমিটির একজন সদস্যের সাথে আমার খুব ভাল আন্তরিকতা গড়ে উঠে। সেই সদস্য আমাকে জানিয়েছিলেন, এই কমিটির মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কর্মী নিয়োগ করে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করেই অনুসন্ধানমূলক জরিপ চালানো হয়েছিল। গ্রামে গ্রামে গিয়ে পরিবারগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যুদ্ধের সময়ে সেই গ্রামগুলোতে ঠিক কতজন মানুষ, কিভাবে মারা গিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তারা পুরো দেশের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র দাঁড় করাচ্ছিলেন। এই কমিটির ধারণা অনুযায়ী প্রায় ২৫০০০০ (দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) মানুষ মারা গিয়েছিল। শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পথে কিংবা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানোর পর আরও কোয়ার্টার মিলিয়ন (২৫০০০০) মানুষ মারা যেতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছে । যার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫০০০০০ (পাঁচ লক্ষ)। কিন্তু আকষ্মিকভাবে ১৯৭৪ সালে এই কমিটির কাজ স্থগিত ঘোষণা করে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। Lawrence Lifschultz বক্তব্য অনুযায়ী তাকে সেই সদস্য জানিয়েছিলেন, তাদের হিসাব অনুসারে মুক্তিযুদ্ধে নিহত মানুষের মোট সংখ্যা ৫ লাখ যা সেই নেতার (শেখ মুজিবুর রহমান) দেয়া একগুয়ে মতবাদ (Orthodoxy) ৩মিলিয়ন বা ৩০ লাখ মানুষের সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। তাই এই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নিচে সেই লিঙ্কটি সংযুক্ত করা হলো,
http://www.pamphleteerspress.com/the-case-of-david-bergman/
‘The Pamphleteer’s Press’ এ Lawrence Lifschultz তাঁর লেখা প্রবন্ধে আরো একটি রিলায়েবল সোর্স উল্লেখ করেন। তিনি লিখেন, ড. ডেভিট বার্গম্যান ২০১১ সালে তাঁর আইসিটি (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিন্যাল ট্রাইব্যুনাল) রিপোর্টে মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের উপর যারা সবচেয়ে বেশি গভেষণা করেছেন তাদের একজন ড. হাসানের উদৃতি দিয়ে বলেন, ১৯৯১ সালে ড. এম এ হাসানের নেতৃত্বে গঠিত ‘ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ নামে একটি সংগঠন সুনির্দিষ্ট গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রায় ১৭ বছর যাবৎ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশে শহীদের সংখ্যা নিরূপনের চেষ্টা করে। তাদের সংগঠনটি পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছে, গ্রামে গ্রামে গিয়েছে। সেই ড. হাসানের মতেও ৩০ লক্ষ একটি অতিরঞ্জিত সংখ্যা এবং সঠিক সংখ্যাটি সম্ভবত ১২ লক্ষের কাছাকাছি হবে।
ড. হাসানে উদৃতি দিয়ে বলে হয়েছে, আমরা ৯৪৮টি বধ্যভূমি বা গণকবরের সন্ধান পেয়েছি। আমাদের গবেষণা অনুসারে প্রতিটি গণকবরের বিপরীতে আরও চারটি গণকবর রয়েছে যার উপর পরবর্তীকালে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে কিংবা যার হদিস পাওয়া যায় না। এই হিসেবে মোট গণকবরের সংখ্যা ৫০০০ বলে ধরে নেয়া যায়। যদি প্রতিটি কবরে ১০০টি করে লাশ থাকে তবে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫,০০,০০০।
ডঃ হাসানের মতে এই অনুমান মোট মৃতের সংখ্যার ৩০ শতাংশের মত, কারণ তিনি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার থেকে অনুমান করেছেন যে মোট নিহতের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষকে গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিলো আর বাকীদের দেহ নদী-নালায় বা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দেয়ায় তা পচে গলে নষ্ট হয়ে গেছেন। তাঁর অনুমান অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ১২ লক্ষের মত।
এই প্রবন্ধে আরো বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা এবং আনুমানিক সংখ্যাও কেউ জানেন না। তবে ড. হাসানের গভেষনায় যে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে সেটাই সম্ভবত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। তবে সরকারি হিসাবে যে সংখায় প্রকাশ করা হয়েছে তা বাস্তব সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
তাহলে ৩০ লক্ষ সংখ্যাটি কিভাবে আসলো ?
বিবিসির বাংলা বিভাগের উপ-প্রধান সিরাজুর রহমানের ২০১১ সালের ২৩ মে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্যা গার্ডিয়ানে’ লেখা একটি চিঠির উদৃতি দিয়ে ২০১১ সালের ২৪ মে, মঙ্গলবার, দ্যা গার্ডিয়ানের সাংবাদিক Ian Jack লেখা একটি প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধে সিরাজুর রহমানের চিঠিটি প্রকাশ করা হয়। জনাব সিরাজুর রহমান চিঠিটি তুলে ধরা হলো, ‘ On 8 January 1972 I was the first Bangladeshi to meet independence leader Sheikh Mujibur Rahman after his release from Pakistan. He was brought from Heathrow to Claridge’s by the Indian high commissioner Apa Bhai Panth, and I arrived there almost immediately.
Mujib was puzzled to be addressed as “your excellency” by Mr Panth. He was surprised, almost shocked, when I explained to him that Bangladesh had been liberated and he was elected president in his absence. Apparently he arrived in London under the impression that East Pakistanis had been granted the full regional autonomy for which he had been campaigning. During the day I and others gave him the full picture of the war. I explained that no accurate figure of the casualties was available but our estimate, based on information from various sources, was that up to “three lakh” (300,000) died in the conflict.
To my surprise and horror he told David Frost later that “three millions of my people” were killed by the Pakistanis. Whether he mistranslated “lakh” as “million” or his confused state of mind was responsible I don’t know, but many Bangladeshis still believe a figure of three million is unrealistic and incredible.
Serajur Rahman
Retired deputy head, BBC Bengali Service’
“১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারীর, আমিই ছিলাম প্রথম বাংলাদেশী যিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করি। তাঁকে হিথ্রো থেকে লন্ডনের ক্ল্যারিজেসে আনা হয় এবং আমি প্রায় সাথে সাথে সেখানে পৌঁছাই। সেখানে ভারতের প্রতিনিধি মি. পান্থ যখন তাকে ‘ your excellency” বলতে শুরু করলো। তখন তিনি (শেখ মুজিবুর রহমান) অবাক হয়ে গেলেন। আমি যখন তাকে জানালাম যে, তার অবর্তমানেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে এবং তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছে, তখন তিনি বিষ্মিত হন।
মূলত, তিনি লন্ডনে এসেছিলেন এই ধারণা নিয়ে যে, তিনি পূর্ব-পাকিস্তানিদের যেই স্বায়ত্বশাসনের জন্য তিনি লড়াই করছিলেন হয়তো পাকিস্তানিরা তা মেনে নিয়েছে। সেইদিনই আমি এবং অন্যরা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের একটি বিষদ ধারণা দেই। আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম যে, এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কোন সঠিক হিসাব জানা যায়নি, তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে আমাদের অনুমান, কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ মারা গিয়েছেন। আমি খুবই অবাক এবং হতাশ হয়েছিলাম যখন শুনলাম তিনি সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বললেন ‘ত্রিশ লক্ষ মানুষকে পাকিস্তানিরা হত্যা করেছে’! আমি জানি না কি কারণে তিনি এই সংখ্যাটি বলেছিলেন, হয়তো তিনি মিলিয়ন শব্দটির ভুল অনুবাদ করেছিলেন কিংবা তাঁর অস্থিরচিত্ত এর জন্যে দায়ী হয়ে থাকতে পারে। তবে আজও অনেক বাংলাদেশী বিশ্বাস করেন সংখ্যাটি আসলেই অতিরঞ্জিত।” দ্যা গার্ডিয়ানের লিংক : http://www.theguardian.com/world/2011/may/24/mujib-confusion-on-bangladeshi-deaths
জনাব সিরাজুর রহমান পরবর্তীতে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর এই চিঠির সত্যাতা পুনরায় ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষাৎকারের ভিডিও লিঙ্কটি নিম্নরূপ: https://www.youtube.com/watch?v=rnaK3QGEGCI&feature=youtu.be
তবে অনেকে আবার ধারণা করে থাকেন যে, শেখ মজিবুর রহমান হয়তো বিদেশ থেকে বেশি সাহায্য পাওয়ার আশায় এই সংখ্যাটিকে বাড়িয়ে বলে থাকতে পারেন। যাই হোক সেটা ইতিহাসের গভেষনার বিষয় নয়।
কাজেই মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম পাওয়া যাচ্ছে। যেমন শর্মিলী বোষ – ৫০০০০-১০০০০০, British Medical Journal – ২৬৯০০০, Peace research institute – ৫৮০০০, Time of India – ২৬৯০০০, Richard Sission, Leo E. Rose- ৩০০০০০, R.J. Rummel – ১৫০০০০, এমএ মুহিত ও রওনক জাহান – ৩০০০০০০, কল্যাণ চৌধুরী – ১২৪৭০০০, বিবিসি সাংবাদিক Mark Dummett – প্রায় ৫ লাখ, পাকিস্থান সরকারের মতে – ২৬০০০, Lawrence Lifschultz – ৬০০০০০, ড. হাসান – ১২০০০০০।
এই রকম আরো অনেক গভেষনায় বিভিন্ন রকম তথ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। শেখ মজিবুর রহমান বলেছেন ‘৩০লাখ’ তাই এই সংখ্যা ৩০ লাখই হতে হবে এবং এ নিয়ে বিতর্ক করা যাবে না সেটা ইতিহাস বলে না। বরং যারা মনে করেন এই সংখ্যা ৩০ লাখ তাদের উচিত উপযুক্ত তথ্য এবং প্রমাণের মাধ্যমে বিষয়টিকে জাতির সামনে উপস্থাপন করা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার উদ্যোগ প্রথম নেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্প গঠন ও দলিলপত্র সংরক্ষণের উদ্যোগ তিনি নেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় গঠন করেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনিই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহন করেন। কাজেই মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা নিয়ে জাতির সামনে পরিষ্কার ধারণা উপস্থাপন করা উনার রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কাজেই বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে যে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছে তা অমূলক নয় বরং দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল ধরে বাংলাদেশের ইতিহাসের যে অসত্য লুকিয়ে রয়েছে সেটাকে এখনি সঠিক করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই বেশি জরুরী।
কোন ব্যাক্তি তাঁর ক্যারিসমেটিক ব্যাক্তিত্ব কিংবা মেধাবলে ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তন করতে পারে কিন্তু ইতিহাসের তথ্য এবং উপাত্ত্যের নয়। তথ্যের অসামঞ্জস্যতা মিটানোর গভেষনার তাগিদেই ইতিহাসের জন্ম। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়না। যেমনটা নিচ্ছে না আজকের কতিপয় রাজনৈতিক দল। লেখক: সাবেক ছাত্র, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাবি।
এমএইচ





