সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম আলোচিত একটি হচ্ছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বোমা হামলা ও বন্দুকধারীদের গুলিবর্ষণের ঘটনা। ২০১৫ সালের ১৩ই নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রায় একই সময়ে কয়েকটি স্থানে সংগঠিত ওই বোমা হামলা ও বন্দুকধারীদের গুলিতে ১৪০ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও দুই শতাধিক মানুষ।

বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে অধিকাংশ গণমাধ্যমে প্যারিসের ওই হামলায় অন্তত ১৪০ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হলেও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অঁল্যাদ অবশ্য গণমাধ্যমকে ১২৭ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন এবং ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে আহতের সংখ্যা ১৮০ বলে দাবি করা হয়েছিল। আর এ ঘটনায় হামলাকারী ৮ জনের সবাই নিহত হয় পুলিশের গুলিতে।

বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টিকারী ওই হালমার ব্যাপারে বলা হয়েছিল, ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে বোমা হামলার পর ইউরোপে এটাই সন্ত্রাসী হামলার সবচেয়ে বড় ঘটনা। ইসলাম ধর্ম নিয়ে বিদ্রুপকারী ফরাসি ম্যাগাজিন শার্লি এবদুতে হামলা চালিয়ে ২০ জনকে হত্যার দশ মাসের মাথায় ঘটেছিল প্যারিসে হামলার ওই ঘটনা।

এই সন্ত্রাসী হামলার পর পুরো ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অঁল্যাদ; বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সীমান্ত।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিসে কার্ফ্যু জারি ওসীমান্ত বন্ধের এটাই ছিল প্রথম ঘটনা।

শুধু তাই নয়, ওই হামলার পর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন নগরীটিতে সব বাসিন্দাদের যার যার ঘরে থাকতে বলা হয়েছিল এবং শহরে নামানো হয়েছিল দেড় হাজার সৈন্য, বাতিল করা হয়েছিল পুলিশের ছুটি, হাসপাতালগুলোতে কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন কাজে রাখা হয়েছিল। মেট্রো রেলের পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধুমাত্র স্বাভাবিক ছিল দূরপাল্লার রেল ও বিমান চলাচল।

প্যারিসজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পরে ফরাসি জনগণের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন বিশ্বনেতারা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানায়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফ্রান্সের পাশে থাকার কথা বলে আমেরিকার নেতৃত্বধীন সামরিক জোট ন্যাটো।

ফ্রান্সকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত আছে জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক বিবৃতিতে বলেন, “নিরপরাধ বেসামরিক জনগণকে সন্ত্রস্ত করার আরেকটি ভয়ঙ্কর চেষ্টা আমরা দেখলাম।” ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এক টুইটে বলেন, “আমরা ফ্রান্সের মানুষের পাশে আছি। তাদের সাহায্যে যতটা সম্ভব, আমরা তা করব।” জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেল বলেন, প্যারিসের যে খবর আর ছবি তিনি পেয়েছেন. তাতে তিনি বিস্মিত, হতবাক। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্রান্সের ওই হামলার নিন্দা জানান।

ফান্সের ১২৭ থেকে ১৪০ জন মানুষের জীবন বিপন্নের এই ঘটনায় গৃহীত পদক্ষেপ ও উদ্বেগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।মানুষের জীবন যে কত মূল্যবান, বিশ্ববাসীকে সেটাই বুঝিয়ে দিলেন বিশ্ব নেতারা। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যে কতটা জঘন্য, তা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দেয়া হলো।

এবার আসি মুসলিম বিশ্ব প্রসঙ্গে। চলতি জানুয়ারি (২০১৬) মাসের ১৯ তারিখ জাতিসংঘ প্রকাশিত এক নতুন জরিপে বলা হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত একবছর ১০ মাসে শুধুমাত্র ইরাকে সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় ১৯ হাজার এবং আহত  হয়েছেন আরও  অন্তত ৩৬ হাজার মানুষ।

ইরাক বিষয়ক জাতিসংঘের সহকারী মিশন (The United Nations Assistance Mission for Iraq) এবং মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাই-কমিশনার (The United Nations High Commissioner for Human Rights) যৌথভাবে এই নতুন জরিপ প্রকাশ করে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে ৩২ লাখেরও বেশি মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন বলেও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া, ২০০৩ সালে ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসনে নিহত হন আরো লাখ লাখ মানুষ। সাদ্দামের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of Mass Destruction) আছে- এমন অভিযোগ এনে আমেরিকা-বৃটেনের যোগসাজশে ইরাকে শুরু হয় হামলা। যেই হামলার বলী হন দেশটির লাখ লাখ নিরাপরাধ মানুষ। এদিকে, ওই আগ্রাসনের এক দশকের মাথায় আমেরিকা-বৃটেন স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, সাদ্দামের কাছে কোন গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না। অথচ মিথ্যা অভিযোগ খুন করা হলো লাখ লাখ মানুষকে এবং সেটাকে সন্ত্রাসী কাজ বলছে না ইহুদি-খ্রিস্টান নিয়ন্ত্রিত হলুদ মিডিয়াগুলো।

২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে হাফিংটন পোস্ট (The Huffington Post) পত্রিকায় প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়, ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এক দশকে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনে ৫ লাখেরও বেশি ইরাকী নিহত হন। বৃটেনভিত্তিক সংগঠন ইরাক বডি কাউন্ট (Iraq Body Count) এর বরাত দিয়ে হাফিংটন পোস্ট ওই জরিপ প্রকাশ করে। এছাড়া ওই সময়ে আহত হন আরও কয়েক মিলিয়ন মানুষ।

শুধু ইরাক নয়, মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই যেন একই চিত্র। আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন, আরাকান, মিশর, পাকিস্তান ও কাস্মিরসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল পরিণত হচ্ছ এক একটি রক্ত উপত্যকায়। একদিকে অমুসলিমদের হাতে মুসলমানদের রক্ত যেমন ঝড়ছে, তেমনি ছোট-খাট মতপার্থক্যকে ঘিরে এক মুসলমান কেড়ে নিচ্ছেন আরেক মুসলমানের প্রান। 

বিগত ২০১৪ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় প্রতি ঘণ্টায় এক ফিলিস্তিনি শিশু ইসরাইলের আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে।অবশ্য ওই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন চলাকালে হতাহতের চিত্র থেকে এই তথ্য বের করা হয়।    

জাতিসংঘের এই নতুন রিপোর্টে বলা হয়, ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ৭৪ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। হত্যাকান্ডের শিকার এ্ই সাধারণ নাগরিকদের তিনভাগের একভাগই শিশু।  

এছাড়া, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনও দাবি করছে ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে গাজায় নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। আর এদের সিংহভাগই নারী ও শিশু।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কাউন্সিলের প্রধান নাভি পিল্লাই বলেন, গাজার প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে ইসরাইলি সেনাবাহিনী যে কর্মকান্ড করেছে তা সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের শামিল। গত জুলাই (২০১৪) মাসে নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এক জরুরী অধিবেশনে বক্তৃতাকালে এমন মন্তব্য করেছিলেন। 

বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই প্রেসটিভিতে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, ওই বছরের ৮ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১৬ দিনে ইসরাইলের আগ্রাসনে গাজায় ৬৬৫ জন নিহত হন এবং ৪ হাজার ২০০শ জন আহত  হন।

বেশি তথ্য উপাত্ত দিয়ে এই লেখাটিকে আর জটিল করতে চাই না। যে কেউ ইন্টারনেটে একটু ঘাটাঘাটি করলেই জানতে পারবেন কোথায় কী পরিমান প্রাণহানি ঘটেছে। সবশেষ শুধু সিরিয়ার বিষয়ে একটু তথ্য দেয়া যেতে পারে। ২০১৫ সালের ৭ই জুলাই আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক রির্পোটে বলা হয়, ২০১১ সালের মার্চ মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর থেকে ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪ বছর ৩ মাসে অন্তত ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিহত হন। এটা হচ্ছে মুসলমানের হাতে মুসলমান হতাহতের এক ভয়াবহ ঘটনা।

যাই হোক, কেন এই রক্তপাত। একচেটিয়া শুধু মুসলমানদের রক্ত এভাবে ঝড়ছে কেন? এটা কি স্বাভাবিক ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোন সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র কাজ করছে? বেশ কয়েকদিন ধরেই এমন ভাবনা থেকে একটা পেরেশানী কাজ করছিল। সপ্তাহ খানেক আগে চলতি (জানুয়ারি, ২০১৬) মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে একটি রেস্টুরেন্টে দেখা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাইমুল আহসান খানের সাথে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই জুরিসপ্রুডেন্সকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-একচেটিয়া মুসলমানদের রক্ত এভাবে ঝড়ছে কেন? এ থেকে উত্তরণের উপায় কি?

অধ্যাপক মাইমুল আহখান খান খুবই সংক্ষেপে উত্তর দিলেন। তিনি বললেন-এটা মুসলমানদের অর্জন। জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে? তিনি বললেন, পৃথিবীর একমাত্র ধর্মগ্রন্থ মুসলমানদের আল-কুরআন, যার শুরু হয়েছে একটি শব্দ দিয়ে, আর তা হলো ‘ইকরা’ অর্থাৎ ‘পড়’। কিন্তু এই পড়াটাই ছেড়ে দিয়েছেন মুসলমানরা। মাত্র ৬ হাজার ৬ শত ৬৬টি আয়াতের ছোট্ট গ্রন্থ আল-কুরআনের অর্থ কয়জন মুসলমান মনোযোগের সাথে পড়েছেন? মাত্র ৬ খানা বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থের কয়টি মুসলমানরা পড়েছেন? তারা না জানেন নিজেদের দায়িত্ব, না জানের অপরাপর ধর্ম-বিশ্বাসের মানুষের সাথে আচার ব্যবহারের ধর্মীয় নীতিমালা।

এর ফল কখনও মুসলমানরা থাকেন উদাসীন, আবার কখনওবা অতি আবেগের বশে জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে। আর গুটি কয়েক মুসলমানের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দায়ভার পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে আগ্রাসন চালাচ্ছেন ইহুদী-খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধ চক্র। কিন্তু এর বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব দেয়ার যোগ্যতাও নেই মুসলমানদের। অপরদিকে, ছোট-খাট মতবিরোধ যা হতে পারতো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার উৎস সেটাকেই উস্কে দিয়ে এক মুসলমানের বিরুদ্ধ আরেক মুসলমানকে লেলিয়া দিচ্ছে  ইসলামবিরোধী চক্র। আর এরই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই রক্তাক্ত শিয়া-সুন্নী দ্বদ্ব।

এসবই সম্ভব হচ্ছে মুসলমানদের জ্ঞান চর্চা থেকে দূরে সরে যাবার কারণে। আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস মুসলমানরা যদি শুধুমাত্র জ্ঞান চর্চার দিকে ধাবিত হয়, তাহলে এই রক্তারক্তি অনেকাংশেই লাঘব হবে। শুধুমাত্র আল-কুরআন চর্চায় একটু মনোযোগী হলেই ইহুদি-খ্রিস্টান চক্রের মিথ্যা প্রচার-প্রপাগান্ডায় কোন মুসলমান আর সামান্যতমো বিচলিত যেমন হবেন না, তেমনি হায়েনার মতো একে অপরের ওপরও ঝাপিয়ে পড়বেন না। জ্ঞানে-গরিমায় পরিপক্ক একটি শক্তিশালী মুসলিম বিশ্বই হোক আগামীর বিশ্বশান্তির মূলমন্ত্র।

পরিশেষে সবার প্রতি আহবান, যে যেখানেই আছেন, ছোট ছোট পাঠাগার গড়ে তুলুন। গ্রামে-গঞ্জে মুসলিম যুবকদের জ্ঞান চর্চায় উৎসাহিত করুন। প্রতিটি পাড়া মহল্লায় মুসলিম তরুণ-যুবকরা যৌথ পাঠাগার গড়ে তুলুন, সেখানে সম-সাময়িক বই-পুস্তকের পাশাপাশি আল-কুরআনের অনুবাদ রাখুন। বুখারী-মুসলিম সহ সহীহ হাদীস গ্রস্থগুলো রাখুন। যাদের সামর্থ আছে, গড়ে তুলুন পারিবারিক পাঠাগার। একটি সুন্দর শান্তিময় বিশ্ব-ব্যবস্থায় মুসলমানরা আর যেন সন্ত্রাসের প্রতীক না হয়ে  শান্তির পায়রা হয়ে ধরা দেয় বিশ্ববাসীর কাছে সে প্রত্যাশাই রাখছি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক