১৫ আগস্ট । রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে ঘটনাবহুল দিনটাকে বিশ্লেষণ না করলে আমার রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার যথার্থতা থাকেনা বলে মনে করি। একজন মানুষ, একটি সাধারণ ঘরে জন্মগ্রহণ করেও যিনি ৭ কোটি মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন,একজন নেতা, যিনি ৭ কোটি মানুষকে দেখিয়েছিলেনশৃঙ্খল ভাঙার স্বপ্ন, একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি একটি বিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে শক্ত হাতে গড়ে যেতে চেয়েছিলেন,তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শশাঙ্ক থেকে শুরু করে বাংলার ইতিহাসের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় বাংলার মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ লড়াই করেছেন। বাঙালির স্বাধীনতার দীর্ঘ লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্বটি ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে এক বা একাধিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলেও শুধুমাত্র পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র গঠন করা হয়। এ কে এম ফজলুল হক প্রস্তাবিত এই প্রস্তাবটি সুকৌশলে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ চূড়ান্তভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুইটি রাষ্ট্রের।
শুধুমাত্রধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্র জন্ম নেওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে সম্ভবত এটিই প্রথম। পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান মিলে পাকিস্তান গঠন হয়েছিল। কিন্তু এটি কল্পনা করা যায় না যে, পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দূরত্ব ছিল প্রায় হাজার মাইল।আর এই হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুইটি অঞ্চল কীভাবে একটি দেশ হয় তা ছিল একটি আশ্চর্য ঘটনা। রাজনীতি, সামাজিক,সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক কেন্দ্র হল করাচি তথা পাকিস্তানে। ফল যা হবার তাই হল।বাঙালি জাতি ২৪ বছরের জন্য দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হল।
ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক আগ্রাসন শুরু হল বাঙালীদের বিরুদ্ধে। মাওলানা ভাসানী, এ কে এম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাঙালীর পক্ষে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবুও বাংলার মানুষ কিসের যেন অভাব বোধ করছিল। বাঙালী রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর আগমন ঐ সময়েই। তার উত্থান যেন বঞ্চিত পূর্ব বাংলার মুক্তির জন্য।বিষয়টি অনেকটা আসল দেখল এবং জয় করল এমন। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা নির্বাচিত হন তিনি, যদিও প্রচার আছে যে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা।কিন্তু এটা ইতিহাস বিকৃত ছাড়া আর কিছু নয়। এই বিষয়ে অলি আহাদের জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫ পড়লেই বোঝা যাবে।
ছাত্রনেতা হিসেবে বাঙালীর দাবী আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু প্রাণপণ নেমে পড়লেনরাজপথে। ক্রমেই মুসলি ম ছাত্রলীগের থিঙ্ক ট্যাংকে পরিণত হতে লাগলেন। সেই থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি বঙ্গবন্ধুকে। ১৯৪৮ সাল থেকে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। ১৯৪৮ সালের ১১ইমার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদ করতে গেলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে, ছাত্র আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৪৮ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি আবার গ্রেফতার হন।
ছাত্র আন্দোলনের কারণেশেখ মুজিবুর রহমান আস্তে আস্তে জনগণের কাছে পরিচিত হতে শুরু করলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের অসাধারণত্ব ছিল দল পরিচালনার যোগ্যতা,দক্ষ নেতৃত্ব, ক্ষুরধার যুক্তি আর বক্তৃতা। এই বহুমুখি গুণের সমন্বয়ে অতি অল্প সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ পরবর্তি আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান সবচেয়ে বেশি। ১৯৫৬ সালের আন্দোলন, ১৯৬২ সালেরআইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী নেতৃত্ব বাংলার জনগণকে দেখিয়েছিল মুক্তির নীল সোপান।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবর রহমান পরিণত হয়েছিলেনগণ মানুষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে। শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র তাকে রুখে দিতে পারে নি। ১৯৭১ সাল। আন্দোলনের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হল এদেশের মানুষ। ৭ইমার্চ বঙ্গবন্ধু ৭ কোটি মানুষের বুকে জ্বালিয়ে দেনমুক্তির আগুন। দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না, সে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল তীব্র আক্রোশে, সারা বাংলার প্রতিটি অলিতে গলিতে। অসম সাহসে যুদ্ধ শুরু করল বীর বাঙালি। আর বঙ্গবন্ধু বন্দি হলেনশাসকগোষ্ঠীর হাতে।
দীর্ঘ ৯ মাসের অসম যুদ্ধে জয়ী হল মজলুম বাঙালি। মূলত স্বাধীনতা,আর শেখ মুজিব দুইটি অবিচ্ছেদ্য নাম।একটিকে ছাড়া আরেকটি কল্পনা করা যায় না। এর পরের ইতিহাস দেশ গড়ার ইতিহাস। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে বাংলাদেশ ছিল একটি ধ্বংসস্তূপ। একটি নবীন রাষ্ট্রের তখনো কিছুই গড়ে উঠে নি।
একটি নবীন রাষ্ট্রের জন্য প্রথম দুইটি কাজ আবশ্যকীয় এক. State building অর্থাৎ দেশ গঠন এবং দুই. Nation building অর্থাৎ জাতি গঠন। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ শুরুতেই পড়ে গেল leader crisis এ। কে ধরবে এই বিধ্বস্ত নবীন বাংলাদেশের হাল। বঙ্গবন্ধু তখনও কারাগারে। এমন অবস্থায় অভিভাবকশূন্য মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা শুরু করল লুটপাট, সাধারণ মানুষকে অত্যাচার। শুধু leader crisis নয়, যুদ্ধের পর দেশের ভেতর ভারতীয় বাহিনীর অবস্থান নবীন রাষ্ট্রটির সার্বভৌমত্ব হুমকির পথে নিয়ে গিয়েছিল।কিন্ত বঙ্গবন্ধুর সাহসী পদক্ষেপের কারণেইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপ ছিল ঐতিহাসিক।
এর পরের সমস্যা ছিল বাংলাদেশের মহান সংবিধান প্রণয়ন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেই সংবিধান প্রণয়নের আবশ্যকীয়তা অনুভব করেছিলেন। ডঃ কামাল হোসেনকে প্রধান করে একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ আলোচনা গবেষণার পর অবশেষে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান সংসদে পাসহয়। আর সেই সংবিধান মোতাবেক ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এতে শেখ মুজিবুর রহমান ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন পেয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। যদিও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ছিল। নির্বাচনে সীমাহীন ভোট জালিয়াতির প্রশ্ন উঠে। এক্ষেত্রে রশিদা খানমের The Nature of Legitimacy and the Mujib Regime বইয়ের একটি রেফারেন্স দেওয়া যায়।সেখানে বলা হয়েছে, "In this election the overall turnout of voters was 58 percent of the total registered voters but this did not show wider participation of the people. Although in the general elections the AL won an overwhelming victory, it was not a fair election. There were allegations of vote rigging in this election" বিরোধীদলগুলো (আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ) এই নির্বাচনকে ভোট জালিয়াতির উৎসব মনে করেছে। তবে এই নির্বাচন যে রাজনৈতিক কাঠামোকে সুদৃঢ়করণের জন্য অন্যতম পদক্ষেপ ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কূটনৈতিক সাফল্য লাভে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭৫ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেনভারতের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও। যদিও আওয়ামী লীগের জনাব তাজউদ্দিনসহ বেশ কিছু নেতা ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শ নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দেন। তাদের কথার প্রতিবাদ করে সেদিন বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিনকে বলেছিলেন "আমি কাহারও বংশবদ নই, আমার দেশের সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে। আমি ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তানে যাব।" এর পরেই পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল মূলত বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ।
চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান ছিল ঐতিহাসিক। Bureaucracy reconstruction থেকে শুরু করে সরকারি সেক্টর থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার এবং কল-কারখানাকে রাষ্ট্রায়ত্ত করা ছিল সাহসী পদক্ষেপ। তথাপিও মুজিব সরকার দেশে শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছিল। Nepotism, corruption and politicization ছিল এক মহাসত্য। দেশে একটি ভয়ঙ্কর অবস্থা বিরাজ করছিল। বঙ্গবন্ধু তাই বলতে বাধ্য হয়েছিলেন "সাত কোটি মানুষের জন্য সাত কোটি কম্বল কিন্তু আমার কম্বল গেল কই? দেশটা চোরে চোরে ছেয়ে গেল।" বঙ্গবন্ধুর আশেপাশের সবাই ছিল দুর্নীতিবাজ।
বাকশাল গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি ঐতিহাসিক ভুল,যদিও তখন বাকশালের প্রয়োজনীয়তা ছিল বলে মনে করি।কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বাকশাল কখনোই তার কার্যকারিতা ফলাতে পারত না। কারণবঙ্গবন্ধু যে উদ্দেশ্যে বাকশাল করেছিলেনতার মন্ত্রিসভা দিয়ে সেটা কখনোই সম্ভব নয়।
এর পরের ইতিহাস ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর। দেশ স্বাধীনের মাত্র চার বছরের মাথায় জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান হারায়। ১৫ আগস্ট জাতির জন্য যেদিন ছিল অত্যন্ত ভয়ানক। ঐ স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল সেনাবাহিনীর বিপথগামী অফিসাররা। এ হত্যাকাণ্ডের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এই হত্যাকাণ্ড স্বাধীন পরবর্তী দেশকে একটি ভয়ঙ্কর সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেয়। পরবর্তীতে মেজর জিয়া হত্যাকাণ্ড, কর্নেল তাহের হত্যাকাণ্ড, গ্রেনেড হামলা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঐ সংস্কৃতিকে ঘিরেই ঘটেছে। বাংলাদেশ এবং শেখ মুজিবুর রহমান দুইটি অবিচ্ছেদ্য নাম।
ঘাতকেরা একটি বিষয় বারবার ভুল করে সেটা হচ্ছে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় কিন্তু ইতিহাস বারবার শিক্ষা দেয় প্রমাণ দেয় হত্যা করে কোন কিছুর আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। আদর্শকে আদর্শ দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা যায়,হত্যা করে নয়। বঙ্গবন্ধু তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এক মুজিবের আদর্শ তারা এখনো নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে নি। শাসকরা এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেননা। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান থাকবে।
(মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব বিষয়। এর সাথে টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার কোন সম্পর্ক নেই)





