একটি রাষ্ট্রে সরকারের দায়িত্ব কি? লেখার শুরুতেইপ্রশ্নটি উত্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে এ জন্য যে,সম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগানে মার্কিন দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা জুলহাস মান্নানসহ দু’জনের হত্যাকাণেডর পর ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) শহিদুল হক নাগরিকদের নিজশ্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার কথা বলেছেন।
এর আরও কয়েক বছর আগে সাংবাদিক দম্পতিসাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর একই ধরনের কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘সরকার কারও বেড রুম পাহারা দিতে পারবে না।’ তাহলেস্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নটি আসে, সরকারের কাজটা কী?
রাজনীতি বিজ্ঞানের ইতিহাসে রাষ্ট্র সৃষ্টির অনেক মতবাদ রয়েছে। এরমধ্যে জনপ্রিয় মতবাদটি হচ্ছে, সমাজচুক্তি মতবাদ। মূলত তিনজন বিদগ্ধ সমাজচিন্তাবিদ টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯), জনলক (১৬৩২-১৭০৪) ও জ্যাঁ জ্যাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) পৃথকভাবে যে মতবাদ দিয়েছেন, ইতিহাসে তা সমাজচুক্তি মতবাদ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।
রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের অন্যতম জনলক মনে করেন, জনগণ সরকার সৃষ্টি করেছে এ জন্য যে, সরকার তাদের স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তা বিধান করবে। তা করতে না পারলে জনলক সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে আরও একটি অধিকার দিয়ে রেখেছেন যা যৌক্তিক কারণেই এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি না।
জনলক সরকারকে জনগণের অছি হিসেবে মনে করেন, আর অন্যকিছু নয়। কিছু শর্ত দিয়ে অছি প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই শর্ত যদি পালন না হয়, তাহলে সেই অছিত্ব আর থাকে না।
শুধু জনলক কেন, রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ সরকারের প্রধান কাজ হিসেবে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের কথাই বলেছেন। এখন দেশে যেভাবে হত্যাকান্ড ঘটছে, সেই সবের প্রতিবিধান না করে যদি সরকারের শীর্ষমহল থেকে শুরু করে একেবারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান বলতে থাকেন যে, ব্যক্তি পর্যায়ে নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়, তাহলে জনগণ যাবে কোথায়? আর আইজিপির কথা অনুযায়ী সকলে যদি নিজশ্ব নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করে এবং এতে যদি হিতে বিপরীত হয় অর্থাৎ অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে তখন দেশের অবস্থা কী হবে এ বিষয়টি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তৃপক্ষ একটু চিন্তা করে দেখেছেন?
এটা কে না বুঝে যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে দিন দিন। রাজশাহীতে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকান্ডে রেশ কাটতে না কাটতেই কলাবাগানে দু’জন হত্যাকান্ডের শিকার হলো। তারও আগে কুমিল্লায় ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সোহাগী জাহান তনু নামের এক কিশোরী সংস্কৃতিকর্মীকে হত্যা করা হয়।
এভাবে একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটেই চলেছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেই চলেছেন,‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’ তাহলে বলতে হয়, আর কত হত্যাকাণ্ড ঘটলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলা যাবে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী দয়াকরে কী এই পরিসংখানটুকু দেবেন?
আমাদের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দক্ষতা, সৃজনশীলতার প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। অতীতে এর নজিরও আমরা দেখেছি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখায় এসব বাহিনীর অবদান কম নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের এই গর্বের বাহিনীকে যখন হীন দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়,তখনই কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে এবং তখনই কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কোন কাজ করতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া না হয়, তাহলে যা হবার তাই এখন বাংলাদেশে হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিরোধী মতকে দমন করার যত রকম প্রচেষ্টা নেয়া যায়, তা নেয়া হচ্ছে। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, সে বিরোধী বা ভিন্নমতকে লালন করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবে। গণতন্ত্রে বিরোধিতাকে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও শেখ মুজিব সরকারের শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী (১৯২২-১৯৭৮) ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির প্রথম বার্ষিকসম্মেলনে ইংরেজিতে দেওয়া লিখিত এক বক্তৃতায় বলেন,‘গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো এই সত্য যে, সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরোধিতা করার অধিকার যে স্বীকার করতে হবে কেবল তাই নয়, বিরোধিতা করার এই অধিকারই গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। এটি বাদে গণতন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব হতে পারে না। তাই গণতন্ত্রে বিরোধিতা আইনসঙ্গত ও সংবিধানগত। গণতন্ত্রের অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সংগঠিত বিরোধিতা।’
অধ্যাপক মোজাফফর মনে করেন, ‘ডিক্টেটরশিপ বা একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের এখানেই পার্থক্য। ডিক্টেটরশিপের মধ্যেও প্রচুর বক্তৃতাবাজি এবং ভোটাভুটি থাকতে পারে। তা সত্তে¡ও একনায়কতন্ত্রে যারা শাসক তাদের বিরোধিতা করার কিংবা শাসনের ক্ষেত্র থেকে তাদের পরিবর্তিত করে অপর কাউকে স্থাপন করার কোনো প্রচেষ্টার স্থান একনায়কতন্ত্রে নেই। একনায়কতন্ত্রে শাসককে পরিবর্তিত করার চেষ্টাকারীদের দেশদ্রোহী বলে গ্রেফতার করা হয় এবং দেওয়া হয় ।’
বাংলাদেশে বর্তমানে এমন ধরনের গণতন্ত্রের বড় অভাব। এখানে সরকারের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রের বিরোধিতা গণ্য করে বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। একের পর এক মামলা দিয়ে বিরোধিতাকারীদের জেলে দেওয়া হয়। জনসভা, মানববন্ধন, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচিই পালন করতে দেওয়া হয় না।
সুতরাং বিরোধী মতকে দমন করার চেষ্টা হলে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গুম-হত্যাকান্ড বেড়ে যায়। এতে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তাই আসল জায়গায় হাত না দিয়ে অর্থাৎ বিরোধী মত লালন করার যে পরিবেশ প্রয়োজন তা সৃষ্টি না করে কোনভাবেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকানো যাবে না। তাই আমরা সরকারকে বলব, গণতান্ত্রিক আচরণ করুন, তবেই না নাগরিকদের মধ্যেনিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি হবে।
এইচ ই





