মাদক সমস্যা আজ বাংলাদেরশের অন্যতম জাতীয় সমস্যা।  শুধু বংলাদেশ নয় মাদকের নানামাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব সমাজে।  সর্বগ্রাসী মাদক আজ গ্রাস করছে সারা বিশ্বকে।  তাই মাদক সমস্যা একটি ভয়াবহ আর্ন্তজাতিক সমস্যা।  

বাংলাদেশ একটি মুসলীম জনবসতির দেশ।  ইসলাম ধর্মে সকল প্রকার মাদকদ্রব্যকে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।  তাই সাধারনত মুসলিম সমাজে মাদকের বিস্তিৃতি কম। তবে ইদানিংকালে বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।  বিশেষ করে যুবসমাজ ব্যাপকভাবে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছেযা দেশ ও জাতির জন্য উদ্বেগের কারণ।

মাদক সমস্যা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যা।  বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য উৎপন্ন হয়না।  তবে ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ “গোল্ডেন ট্রায়াংগল” (মায়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড) সংলগ্ন এবং ভারত ও নেপালের মধ্যবর্তী দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চল নিয়ে গঠিত“গোল্ডেন ওয়েজ” ও ‘‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট” (পাকিস্থান,  আফগানিস্থান, ইরান) বলয়ের মধ্যেবর্তী ও নিকটস্থ হওয়ায় এখানে মাদকদ্রব্য সহজলব্য। তাই বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা রয়েছে।  

এটা একটা ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা।  ইহা জীবন থাকতে মানুষকে প্রাণহীন করে তুলে। পরিবার ও সমাজকে ধংস করে।  প্রতিশ্রুতিশীল যুবসমাজকে সমাজের বিপক্ষে দাঁড় করায়। মাদক বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়নের একটি বড় বাধা।  মাদকের কারনেবাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বহু পরিবার ধংস হচ্ছে।  অকালে মরে যাচ্ছে বহুতাজা প্রাণ। সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা। লক্ষ লক্ষ তরুণ কর্মশক্তি, মেধা ও সৃজনশীলতা হারিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়। অনেক সময় বেঁছে নেয় আত্ম-হত্যার পথ। দূরে ঠেলে দেয় আপন জনকে।  ভেঙ্গে যায় পরিবার।

নেশার টাকা যোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই এমনকি হত্যাকান্ড ঘটাতেও পিছপা হয়না এই মরণ নেশার কবলে পতিত তরুন ও যুব সমাজ। পরম আপনজন-পিতামাতা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানদেরকে হত্যা করার নজীর এ ক্ষেত্রে বিরল নয়।  অর্থাৎ নেশাখোর সব ধরনের মানবিক গুনাবলী হারিয়ে ফেলে।  যুবসমাজই দেশ ও জাতির ভবিষৎ কর্নধার এবং সৃজনশীল পথের দিশারী, অথচ বাংলাদেশের যুব সমাজের একটি বড় অংশ আজ মাদকাশক্তির করাল গ্রাসে নিপাতীত। জড়িয়ে যাচ্ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। ফলে বিনষ্ট হচ্ছে সামাজিক স্থিতিশীলতা, বাধাগ্রস্থ হচ্ছে উন্নয়নের ধারা।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আবিস্কৃত প্রায় সকল ধরনের মাদকদ্রব্য কম-বেশী ব্যবহৃত হচ্ছে।  মদ, গাঁজা, আফিম, তাড়ি, হিরোইন, মরফিন, প্যাথেডিন, ভেলিসিয়াস, এল-এস-ডি, মারিজুয়ানা, হাসিস, ফেনসিডিল, কোকেন, ক্যাফিইন, মিথামপেটামিন, ইয়াবা ইত্যাদি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।  একই জিনিস বিভিন্ন নামে রয়েছে।  

এছাড়া নিত্য নতুন নাম যুক্ত হয়ে মাদকদ্রব্যের তালিকা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।  সাধারনত ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, ইনজেকশানইত্যাদি আকারে মাদকদ্রব্য ব্যবহৃত হয়।  ইনহেলার আকারেও পাওয়া যায়।  এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে।  

মানুষ বিভিন্নভাবে মাদক দ্রব্যের সংস্পর্শে আসে।  কিছু কিছু ব্যক্তি পেশাগত দায়িত্বপালন করতে গিয়ে মাদকদ্রব্যের সংস্পর্শে আসে।  এসব দ্রব্য সম্পর্কে অবহিত হয়।  কখনও আগ্রহের বশবর্তী হয়ে এসব দ্রব্যের স্বাদ নিতে গিয়ে নিজের অজান্তে কেউ কেউ নেশাখোর হয়ে যায়।  কেউ কখনও জীবনের বিশেষ অধ্যায়ে সামাজিক অশান্তি দূর করতে এসব দ্রব্য ব্যবহার করতে শুরু করে।  প্রায় ক্ষেত্রেই নেশার জালে জড়িয়ে যায়।  

সাধারনত চিকিৎসক,নার্স বা অন্যান্য ব্যক্তি যারা চিকিৎসা পেশায় জড়িত তারা এভাবে নেশায় জড়িত হয়।  কিছু কিছু ক্ষেত্রে নানা কারনে হতাশাগ্রস্থ ব্যাক্তিরা হতাশা-নিরাশা কিংবা ব্যর্থতার গ্লানি মূছতে মাদকের আশ্রয় নেয়।  ক্রমান্বয়ে স্থায়ী নেশাখোরে পরিণত হয়। কখনও কখনও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা উপকরণহিসাবে ব্যবহৃত দ্রব্যই কারো কারো স্থায়ী মাদকসেবী হওয়ার জন্য দায়ী।  

অনেক সময় কিছু নেশাখোর একত্রিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে এলাকার বা মহল্লার সচ্ছল পরিবারের কাউকে তাদের দলে ভিড়াতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জোর করে নেশার দ্রব্য সেবন করিয়ে তাদের দলে ভিড়াতে সক্ষম হয়।  এভাবে সমাজে মাদকসেবির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

কেউ মাদকের জালে জড়ালে তা তার আচার-আচরনে প্রকাশ পায়।  শারিরিক ও মানসিক নানা লক্ষণও প্রকাশ পায়।  প্রাথমিক দিকে এসব লক্ষন বুঝা কঠিন হলেও ক্রমান্বয়ে এসব লক্ষণসমূহ স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়।  প্রথমেই নেশাগ্রস্থ ব্যক্তির দৈনন্দিন আচার-আচরনে পরিবর্তন দেখা যায়। ক্ষুদামন্দা, ওজন হ্রৃাস, মনযোগের অভাব, খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের অভ্যাসের পরিবর্তন, স্কুল বা অফিসে অনিয়ম, ভালছাত্র হয়েও হঠাৎ পরীক্ষায় খারাপ করা ইত্যাদি লক্ষণ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।

অন্যদিকে চুরি করা, রাতকরে ঘরে ফেরা, দেরী করে ঘুম হতে জাগা, হাইজ্যাক সন্ত্রাসী কাজে জড়িত হওয়া, লেখাপড়া বা সংসারিক কাজে অমনোযোগী হওয়া, কোন প্রয়োজনীয় বিষয়ে আগ্রহের অভাবে অপ্রয়োজনে রাগান্বিত হওয়া, অধিনস্তদের প্রতি বিরূপ আচরণ এমনকি কখনও কখনও মারধোর পযর্ন্ত করা শুরু হয়।  পরবর্তীতে নিজের কাছে থাকা টাকা পয়সা শেষ করে প্রকাশ্যে বা গোপনে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র বিক্রি করা,  কখনও বা স্ত্রী বা সন্তানকে বিক্রি করতেও পিছপা হয়না নেশাখোর। পর্যায়ক্রমে কাজ কর্ম ছেড়ে দেওয়া,সমাজবহির্ভূত ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া এবং পরিবারে জন্য বোঝা হয়ে দাড়ায়।  

এ লক্ষণগুলো প্রাথমিক ভাবে কাছের মানুষগুলো ধরতে পারে।  পিতা-মাতা, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এমনকি পাড়া প্রতিবেশীরাএসব আঁচ করতে পারেন।  শুরুতে চিকিৎসা করা যত সহজ দেরীতে ততটা না।  তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে।  সচেতন করতে হবে অন্যদেরকেও।

বিশেষ করে পিতা-মাতা, শিক্ষক এবং স্বামী-স্ত্রী এ পরিবর্তন সহজে বুজতে পারে।  নিজের ছেলে বা মেয়ে কোথায় কাদের সাথে চলে, কি করে, সে খোঁজ খবর রাখতে হবে। শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে এসব পরিবর্তন লক্ষ্য করলে খোঁজ খবর নিয়ে সমাধান করতে পারেন, পরামর্শ দিতে পারেন, শাসন করতে পারেন।  সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারেন।  

যদিও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নেশার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষন করেতবুও নানা কারনে বাংলাদেশে মাদকাসক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।  এর অন্যতম কারন মাদক দ্রব্যের সহজলব্যতা।  যদিও বাংলাদেশের বিশেষকোন মাদকদ্রব্য উৎপন্ন হয় না।  কিন্তু বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান ও দুর্বল প্রশাসনিক কাটামো মাদকদ্রব্যের বিস্তার সহজ করে দিচ্ছে।  আজ শহর- গ্রাম সর্বত্র সহজেই মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়।  

মিয়ানমার থেকে সড়ক, নদী ও পাহাড়ী পথে আসছে ইয়াবাসহ নানা মাদকদ্রব্য।  ভারত থেকে অনেক লম্বা সীমান্তপথ পাড়িয়ে আসছে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকসামগ্রী। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় নেশার সামগ্রী, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকার এক শ্রেনীর মানুষ মাদক পাচার ও স্থানান্তর ব্যবসায়ে জড়িত।  অল্প পূঁজিতে বা বিনা পূঁজিতে তড়িঘড়ি ধনী হওয়ার লোভে অনেক মানুষ এ কাজে জড়িত।  

ইদানিং অনেক নামী-দামী সম্মানিত লোকদের মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।  এমনকি ২/১ জন সম্মানিত সংসদ সদস্য তাদের পরিবারের সদস্যদের নাম আসছে অবধ্য ও অনৈতিক ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ার।  পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, সরকারী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের এ কাজে জড়িত হওয়া প্রমানিত হয়েছে। কথিত আছে যে সমাজের আরও উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন ব্যাক্তিবর্গ এসব ব্যবসায়ের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।  এ বিষয়টা জাতির জন্য খুবই শংকার কারন।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে প্রায় ৯০ লক্ষ মাদকসেবী রয়েছে।  যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই কিশোর ও তরুণ।  সরকারী হিসাবে বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫০ লক্ষ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় ঢাকা শহরে কমপক্ষে লক্ষাধিক মাদকসেবী রয়েছে। মাদকাসক্তের মাঝে কমপক্ষে শতকরা ১০ জন তরুনী ও মহিলা।  নারী সমাজে মাদকাসক্তের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। মাদকাসক্তের সংখ্যা হ্রাস করতে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে।  যেমন:-

১).মাদকদ্রব্যের কুফল বিভিন্ন প্রকার মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।  সরকারী যেসব দায়ী বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, রেডিওতে মাদকবিরোধী প্রচারনা চালাতে হবে। কথিকা নাটক, আলোচনা অনুষ্ঠান করে মাদকদ্রব্যের কুফল ও অন্যান্য প্রসাংগিক বিষয় উপস্থাপন করতে হবে।  পত্র-পত্রিকা সাময়িকীতে লেখা লেখি চালাতে হবে।

২). সরকারের মাদকনিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী করতে হবে।  এ জন্য এ দপ্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে। তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং দক্ষ জনবল বৃদ্ধি করতে হবে।

৩). প্রশাসনিক সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে।  পুলিশ র‌্যাব, বি.জি.বি. সহ সকল বাহিনীকে মাদক নিয়ন্ত্রনে আরও আন্তরিক ও সক্রিয় করতে হবে।

৪). মাদক সম্পর্কীয় আইন কানুনকে যুগোপযোগী করে এর সঠিক ও যথাপোযোক্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

৫). সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যেমন বিভিন্ন পর্যায়ের গনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বেসরকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের এ কাজে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে।  প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

৬). সমাজের মানুষের নৈতিক শক্তিকে উজ্জীবিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে।  মানুষের মনে মাদক দ্রব্যের তথা নেশার প্রতি ঘৃনাবোধ সৃষ্টি করতে হবে।  এক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা চালাতে হবে। ইসলামের শিক্ষা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই মসজিদের ইমাম, আলেম ও ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গকে কাজে লাগাতে হবে।

দেশের লাখ লাখ মসজিদের ইমামগন যদি প্রতি জুমা নামাজের খুৎবায় মাদক সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন তবে তা খুবই ফলপ্রসু হবে। পবিত্র কোনআন ও হাদিসের বক্তব্য দিয়ে লিফলেট বা পুস্তিকা তৈরী করে তা জনগনের মাঝে ব্যপক ভাবে বিলি করতে হবে। অন্যান্য ধর্মালম্বিদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যায়।