প্রথমবারের মতো এশিয়ার ক্রিকেট পরাশক্তি ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। টস হেরে ব্যাট করতে নামা পাকিস্তানকে রীতিমতো চেপে ধরে টাইগাররা। তারপরও মোহাম্মদ হাফিজ, সরফরাজ আহমেদ, উমর আকমল, হামাদ আজম ও শহীদ আফ্রিদির ব্যাটে ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৩৬ রানের সংগ্রহ পায় পাকিস্তান।
বল হাতে বাংলাদেশের প্রাণভোমরা মাশরাফি, সাকিব আল হাসান ও আবদুর রাজ্জাক ২টি করে উইকেট নেন।
মিরপুরের স্কোরবোর্ডে পাকিস্তানের মোট সংগ্রহ যখন ২৩৬ রান, তখন এশিয়া কাপের প্রথম শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর গোটা বাংলাদেশ। শুধু বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর আনাচকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব বাংলাদেশিরাও।
স্বপ্নের শুরুটা হয় অসাধারণ। উদ্বোধনী জুটিতে তামিম ইকবাল ও নাজিমউদ্দিন ৬৮ রান তোলেন। এরপর কিছুটা ছন্দপতন। ৫২ বল খেলে ১৬ করে নাজিমউদ্দিন আউট হওয়ার পর জহিরুল ইসলাম অমি ডাক মারেন। ৬৮ বলে ৬০ রানের ইনিংস খেলে ৮১ রানের মাথায় ফিরে যান তামিমও।
এরপর নাসির হোসেন ও সাকিব আল হাসান মিলে দলীয় স্কোরকে টেনে নেন ১৭০ পর্যন্ত। ২৮ রান করে নাসির সাজঘরে ফেরেন। ১৭৯ রানের মাথায় আউট হন ৭২ বলে ৬৮ রানের ইনিংস খেলা সাকিব আল হাসানও। ১৯০ রানের মাথায় অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম (১০) আউট হলে হঠাৎ মিরপুরে এক অজানা আশঙ্কা ভর করে। ৯ বলে ১৮ রান তুলে মাশরাফি দলীয় স্কোরকে ২১৮ পার করে সাজঘরে ফেরেন। তখন ১৪ বলে জয়ের জন্য রান প্রয়োজন ছিল ১৯ রান। হাতে মাত্র ৩ উইকেট।
৪৯তম ওভারে বল হাতে আসেন উমর গুল। অভিজ্ঞ খেলোয়াড় রাজ্জাক ও মাহমুদউল্লাহ এই ওভারে ৯ রান তুলে আবারও স্বপ্নাতুর করে তোলেন বাংলাদেশকে। শেষ ওভারে তখন জয়ের জন্য প্রয়োজন ৯ রান। বল হাতে আসেন পাকিস্তানের আইজাজ চিমা।
প্রথম বল। থার্ডম্যানে ঠেলে দিয়ে ১ রান নেন মাহমুদউল্লাহ। দ্বিতীয় বলে লেগবাই সূত্রে আরো একটি রান আসে। তৃতীয় বলটি ডট দেন চিমা। চতুর্থ বলে প্রথমে ফিল্ডিং মিস ও পরে ওভার থ্রোর সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ৩ রান নেন মাহমুদউল্লাহ ও রাজ্জাক।
জয়ের জন্য ২ বলে তখন ৪ রান প্রয়োজন। পঞ্চম বলে চিমাকে স্কুপ করে শর্ট ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকাতে চেয়েছিলেন রাজ্জাক। কিন্তু চিমার স্লোয়ার ডেলিভারিটি ঠিকমতো খেলতে পারেননি। পরিষ্কার বোল্ড হয়ে যান রাজ্জাক।
এরপরও বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের স্বপ্নে একটুও ভাটা পড়েনি। তবে মাহমুদউল্লাহ স্ট্রাইকে না থাকায় অনেকেই শঙ্কায় ছিলেন। শেষ বলে হবে কী চার রান? গুটি গুটি পায়ে মাঠে নামেন শাহাদাত হোসেন রাজীব। আইজাজ চিমার শেষ বল। শেষ বল এশিয়া কাপের একাদশ আসরের। শিরোপা নির্ধারণী শেষ বল।
চিমা সুযোগ বুঝে শাহাদাতকে ইয়র্কার দেন। শাহাদাত পড়িমরি করে কোনোরকমে খেলেন। কিন্তু ব্যাট-বলে এক করতে পারেননি। পায়ে লেগে বল লেগ সাইডে চলে যায়। দৌড়ে কোনোরকমে প্রান্ত বদল করেন তারা। ২ রানে পাকিস্তানের কাছে হেরে বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা জয়ের স্বপ্নের সলিল সমাধি হয়। ততক্ষণে গ্যালারিতে কান্নার রোল উঠেছে। হাউমাউ করে কাঁদছে গোটা গ্যালারি। গোটা দেশ।
এক নিমেষ কালো বিষণ্নতায় ছেয়ে যায় বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস। কারো শরীরে নড়ার শক্তিটুকু নেই। যে যেখানে যেভাবে বসেছিলেন সেখানেই ঠায় বসে আছেন। সবাই স্তম্ভিত। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় সবাই হতবিহ্বল। হতাশা আর বিষণ্নতায় জমে যেন কাঠ হয়ে গিয়েছেন সবাই। স্বপ্ন ভাঙার হতাশা আর কষ্টে সবাই যেন নির্বাক হয়ে গেছেন। কারো মুখে কোনো কথা নেই। চোখে-মুখে রাজ্যের হতাশা। আর চোখ গড়িয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে নোনা জল।
সেদিনকার রাতটি অন্য রাতের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার মনে হয়েছিল। মিরপুরের ফ্ল্যাড লাইটের আলোর মধ্যেও কেমন যেন অন্ধকার বিরাজ করছিল। কী হলো? কী হলো এটা?
মাহমুদউল্লাহ দৌড়ে স্ট্রাইকিং প্রান্তে গিয়েই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। নিয়মের খাতিরে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলান। তিনি যেন তার নিথর দেহটি টেনে নিয়ে যেতে পারছিলেন না। কাঁদো কাঁদো চেহারা করে ড্রেসিং রুম থেকে নেমে আসেন সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল, নাসির হোসেন ও একাদশের বাইরে থাকা এনামুল হক বিজয়।
তারা কোনোরকমে পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলান। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মাঠেই বসে পড়েন মুশফিক। সাকিব তার কাছে যেতেই বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। সাকিব প্রথমে মুশফিককে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজেকে আর লুকাতে পারেননি। একটু পরে কেঁদে ফেলেন সাকিবও। তার কান্না দেখে নাসির চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কেঁদে যাচ্ছিলেন আর জার্সি দিয়ে চোখের জল মুছে যাচ্ছিলেন। এনামুল হক বিজয়ের চোখের জল গড়িয়ে বুক ভিজে যাচ্ছিল। তামিম ইকবালের মুখের দিকে তাকানোই যাচ্ছিল না। মিরপুরে তখন এক অসহনীয় দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছিল। যে দৃশ্য দেখতে কেউ-ই প্রস্তুত ছিল না।
সেদিন প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের সেই কান্না দেখে ১৬ কোটি মানুষের কেউ-ই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। মিরপুরে ২ রানের হারের কষ্টে সেদিন ১৬ কোটি মানুষের চোখের জলে জোয়ার লেগেছিল। হৃদয়টা দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ সেদিন এশিয়া কাপের শিরোপা জিততে পারেনি। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বের শতকোটি মানুষের হৃদয় জয় করতে পেরেছিল।
আবারও এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ। নতুন ফরম্যাটের এই আসরে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান নয়, ভারত। তবে এবার আর হৃদয় জয় করতে চাই না, শিরোপা চাই। ২০১২ সালের সেই দুঃসহ স্মৃতির পুনরাবৃত্তি চাই না। মিরপুরের গ্যালারিতে কান্নার রোল দেখতে চাই না। দেখতে চাই না বিমর্ষ চিত্ত আর বিষণ্নতায় ছেয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে। দেখতে চাই না প্রিয় খেলোয়াড়দের চোখের জল। হতাশায় স্তম্ভিত হতে চাই না, বিজয়োল্লাস করতে চাই। কান্না নয়, উচ্ছ্বাস হোক আজ বাংলাদেশের সঙ্গী। হৃদয় জয় নয়, শিরোপা জয় দিয়েই শেষ হোক এশিয়া কাপের মিশন।
সেদিন চোখের জল ফেলা মুশফিক আজ দলে আছেন। দলে আছেন সাকিব আল হাসান, নাসির হোসেন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল। গর্জে উঠুক তারা। গর্জে উঠুক বাংলাদেশ। তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশের শোকেসে উঠুক প্রথম শিরোপা।
এআইজে
(সূত্র: রাইজিংবিডি)





