জর্জ ওয়াশিংটন ছাড়া যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কামাল আতাতুর্ক ছাড়া যেমন আধুনিক তুরস্ক, নেলসন ম্যান্ডেলা ছাড়া যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছাড়া যেমন ভারতের ইতিহাস পূর্ণতা পায়না তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাস কল্পনা করা যায় না। বঙ্গবন্ধু একটি নাম একটি অসমাপ্ত ইতিহাস। বাংলাদেশের সাথে বঙ্গবন্ধু কিংবা বঙ্গবন্ধুর সাথে বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্দভাবে জড়িত। যেন একটি আরেকটির পরিপূরক।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্র বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল সেই মানুষটিই পরবর্তীতে বাংলাদেশীদের প্রাণের পুরুষে পরিণত হয় এবং তাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয়ের কথা কল্পনাতীত হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর আমৃত্যু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশীদের মুক্তি ও অধিকার ফিরিয়ে আনতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। ’
৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত তিনি এ জাতির পক্ষে ত্রাতার ভূমিকায় ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর শিষ্য হিসেবে তিনি কখনো ক্ষমতার মোহে অন্ধ হননি বরং সর্বদা চেষ্টায় ছিলেন কিভাবে এদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র এবং এ জাতিকে স্বতন্ত্র জাতীয়তাবোধের স্বাদ দিতে পারেন। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর অপশাসনের বিরোধীতা করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ কারগারে কেটেছে। ফাঁসির হুমকিতেও তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধ কিংবা এ জাতির অধিকার আদায়ের পক্ষে অবস্থান থেকে এক চুলও পিছপা হননি।
পাকিস্তানে বর্বর শাসকগোষ্ঠী যখন সর্বত্র থেকে বাংলা নামক শব্দটি উচ্ছেদে ব্যস্ত তখন তিনি বুক চিতিয়ে বাংলাকে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ় সংকল্প। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মরণসভায় উপস্থিত হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এক সময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে, একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোন কিছুর সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। আজ আমি ঘোষণা করছি এটা পূর্ব পাকিস্তান নয় শুধু বাংলাদেশ’।
আমেরিকার মত বিশ্বের সুপার পাওয়ার বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করলেও শুধু বঙ্গবন্ধুর সীমাহীন আত্মবল, মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা এবং তার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বিশ্বমানচিত্রে নতুন করে ’৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর স্থান করে নেয় আরেকটি রাষ্ট্রের নাম। আর সেটা আমাদের লাল-সবুজ পতাকাখোচিত বাংলাদেশ। যে দেশের ইতিহাস পাঠ করতে গেলে বঙ্গবন্ধুর নাম অবশ্যই বারবার উচ্চারিত হবে।
যে মানুষটি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশীদের জন্য তার জীবন-যৌবন উৎসর্গ করলেন তাকে আমরা কতটুকু ভালোবাসতে পেরেছি? দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে ত্রিশ লাখ শহীদের বুকের তাজা রক্ত ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম-আভ্রুর বিনিময়ে বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর যখন তিনি দেশের গঠনমূলক কাজ শুরু করবেন তখনই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র এবং একদল উচ্চবিলাসী বিপথগামী সৈন্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট রাতের শেষ প্রহরে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নৃশংসভাবে খুন করে।
'৭৫ এর ১৫ আগষ্ট কালোরাতের শেষ প্রহরে কয়েকজন বিপথগামী সেনা সদস্য ও অফিসারের হাতে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নিহত হন। নিহতের তালিকায় যেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্র্মীনি, পুত্র-পুত্রবধু তেমনি বঙ্গবন্ধুর ভাগিণা এবং তার গর্ভবতী স্ত্রীসহ ছিল আরও অনেক। দুর্বৃত্তদের নির্মম বুলেটে শেখ মুজিবুর রহমানের ৪ বছরের নিষ্পাপ শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে যেমন রেহাই দেয়নি তেমনি আব্দুল্লাহ সেরানিয়াবাতের ৪ বছরের নাতি সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবুও রক্ষা পায়নি। কুলাঙ্গারেরা বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের মধ্য থেকে ২৬ জনকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। রাসেলের মত মায়ামাখা মুখচ্ছবির শিশুর বুকেও গুলি চালানোর সময় হায়েনাদের হাত একাবারও কাঁপে নি। ভাগ্যগুনে পড়াশুনার জন্য জার্মানীতে অবস্থান করার কারনে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছোটবোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অন্তরালে হায়েনাদেরকে কারা প্রলুব্ধ করেছিল তার সঠিক প্রমাণ আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি তবে হত্যাকান্ডের প্রায় তিনযুগ পর নবম জাতীয় সংসদের সরকার বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীদের মধ্য থেকে কয়েকজন দোষীকে শাস্তির মুখোমুখি করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি ঋণের কিয়দাংশ পরিশোধ করার জাতি সুযোগ পেয়েছে। তবে এখনো অনেক আসামী ধরাছোঁয়ার অন্তরালে রয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন ধারক হিসেবে সরকারের কাছে দাবী, যেন বঙ্গবন্ধুর বাকী হত্যাকারীদেরকেও অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির মুখোমুখি করা হয় এবং কোন স্বার্থে তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল তার সঠিক রহস্য উম্মোচন এবং এর পিছনে যদি কোন দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র থাকে তবে সে ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল তাও যেন প্রকাশ করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাৎ বার্ষিকিতে দাঁড়িয়ে সকল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অনুরোধ, বঙ্গবন্ধুর মত মহৎমনের মানুষটিকে রাজনীতির গন্ডিবন্দ করে তাকে সংকুচিত করা উচিত হবে না। জাতীয় নেতা হিসেবে তাকে সবার জন্য উম্মুক্ত করে দিন। ঘাতকরা ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পেরেছে কিন্তু তার আদর্শ, দর্শন কিংবা শিক্ষাকে কি কোনদিন দমিয়ে রাখতে পারবে ? আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বাংলাদেশকে সোনার দেশে পরিণত করতে চাই। ’৭১ সালের মার্কিন সাপ্তাহিকি ‘নিউজ উইকে’ লোরেন জেঙ্কিসের প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতির কবি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিল বিবিসি বাংলার জরিপে তাকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালীর মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে । তবে আমরা বঙ্গবন্ধুকে আরও অনেক উচ্চতায় উচ্চতায় দেখতে চাই। এজন্য তাকে রাজনীতি মুক্ত রাখতে হবে। ভারতে যেমন করমদাস মোহনচাঁদ গান্ধীকে সকল দল-মতের কাছে গ্রহনযোগ্য করা হয়েছে তেমিন বঙ্গবন্ধুকেও অচিরেই সার্বজনীন করার ব্যবস্থা করা হোক । শুধু সাংবিধানিক জাতির পিতা নয় বরং তাকে সব মানুষের ভালোবাসায় জাতির পিতা করার উদ্যোগ নিতে হবে ।
সবশেষে বলতে চাই-
ভুলি নাই বাবা, ভুলি নাই তোমায়, ভুলি নাই তোমার নাম
বুকের রক্ত দিয়ে হলেও রেখে যাব তোমার মান ।।
ইআর





