এই লেখাটি শেষ করেছি খালেদা জিয়া আহূত অনির্দিষ্টকালীন টানা অবরোধ কর্মসূচির চতুর্দশ দিনে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে তাঁর ডাকা ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবসে’ঢাকায় মহাসমাবেশ করতে না দিয়ে তাঁকে গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।

এর আগে তাঁকে গাজীপুরের জনসভাও করতে দেওয়া হয়নি। সরকারের এসব কঠোর (হঠকারী) তৎপরতার প্রত্যক্ষ কারণ অবশ্য তারেক রহমান এবং খালেদা জিয়ার উসকানিমূলক রাজনৈতিক চাল, যার মাধ্যমে তাঁরা পরিকল্পিতভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে অপমান করে শেখ হাসিনাকে বিএনপির বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন।

অবরোধ ঘোষণার আগে-পরে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতার ক্রুদ্ধ হুংকার শোনা গেছে, ‘বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান লন্ডনে বসে রাজাকার, পাকিবন্ধু, শখের বন্দী ইত্যাকার বিশেষণে অভিহিত করে বঙ্গবন্ধুকে অপমান করার জন্য পুত্রকে শাসন করার পরিবর্তে খালেদা জিয়া কর্তৃক ওসব গালাগালকে “গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে প্রদত্ত রাজনৈতিক বক্তব্য”বলে সার্টিফিকেট দেওয়াতে ওসব বক্তব্যে তাঁর সায় থাকার ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়েছে।

অতএব, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান যত দিন ক্ষমা না চাইবেন তত দিন খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে দেশের কোথাও সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না।’এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সেন্টিমেন্ট হিসেবে মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু, প্রধান বিরোধী জোটকে সভা-সমাবেশসহ রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে না দেওয়ার কৌশল বাস্তবায়িত করতে জেদাজেদি বা একগুঁয়েমি বেশি দিন চালিয়ে যেতে চাইলে তা নিঃসন্দেহে ক্ষমতাসীন জোটের বিরুদ্ধে যাবে, এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে অশালীনভাবে আক্রমণ করে দেশের পাকিস্তান-পসন্দ গোষ্ঠীগুলোকে বিলক্ষণ খুশি করেছেন, কিন্তু তাতে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হয়নি। এতে খালেদা জিয়া সায় দেওয়াতে তাঁরও অকৃতজ্ঞ চেহারাটাই জাতির কাছে ফুটে উঠেছে।

কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ তারেকের ওই সুচতুর চরিত্রহনন ক্যাম্পেইনের অতি-প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাধ্যমে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ফাঁদে পা দিয়েছেন কি না, তা তাঁদের ভেবে দেখতে বলি।

কারণ, অবরোধ, হরতাল এবং সম্ভাব্য অসহযোগ আন্দোলনের মতো দেশ অচল করার মতো কঠোর কর্মসূচি যতই দীর্ঘায়িত হবে, ততই সেগুলো ক্ষমতাসীন জোটের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে এবং খালেদা জিয়ার কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে।

উপরন্তু, খালেদা জিয়াকে তাঁর কার্যালয়ে যেভাবে জবরদস্তিমূলক কায়দায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, সেগুলো মোটা মাথার মোটা বুদ্ধির আহাম্মকি। এই কৌশল দেশে-বিদেশে ক্ষমতাসীন জোটের ভাবমূর্তির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এবং খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করছে।

এ ক্ষেত্রে আসল ইস্যুর সমাধানের দিকে নজর দেওয়াটাই বেশি জরুরি। শেখ হাসিনার মনে রাখতে হবে যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে তিনি এবং তাঁর দলের নেতারা নিয়ম রক্ষার দশম নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করে ঘোষণা করেছিলেন যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

১৯ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে প্রদত্ত শেখ হাসিনার বক্তব্য ছিল হুবহু নিম্নরূপ: ‘সমঝোতায় আসলে দশম সংসদ ভেঙে দিয়ে সংবিধান অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।’তিনি আলোচনা চলতে থাকবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন।

অবশ্য, নির্বাচন নিয়ে সমঝোতাও হয়নি, নির্বাচনের পর আলোচনা কখন শুরু হবে তার কোনো সম্ভাব্য সময়ও তিনি উল্লেখ করেননি। কিন্তু, নির্বাচনের পর তাঁর ও তাঁর দলের নেতাদের কথার সুর পাল্টে গেল, ২০১৯ সাল পর্যন্ত মহাজোট সরকার নাকি ক্ষমতায় থাকবে।

এখন এক বছর পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যখন আলোচনা ২০১৯ সালের নির্বাচনের এত আগেভাগে শুরু করার কোনো যুক্তি নেই বলে ক্ষমতাসীন জোটের পক্ষ থেকে অনড় অবস্থান প্রকাশ করা হচ্ছে, তখন খালেদা জিয়ার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে তাকে অযৌক্তিক বলা যাবে কি? খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাকে পুরো পাঁচ বছর নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় থাকতে দেবেন, এটা আশা করা যায় না।

অন্যদিকে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান স্বীকার করুন আর না-ই করুন চালাকির খেলায় ২০১৩-১৪-এর প্রাক্-নির্বাচনী পর্যায়ে মাতা-পুত্র ভুল চাল দিয়ে শেখ হাসিনার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে জাতিসংঘের দূত তারানকোর ফর্মুলা অনুযায়ী নির্বাচনে আসতে রাজি হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হতো, সে ব্যাপারে দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে একটা মতৈক্য রয়েছে। কিন্তু, নির্বাচন বয়কট করলেন তাঁরা।

শুধু বয়কট নয়, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরকে ব্যবহার করে এবং ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের অভূতপূর্ব খুন-জখম-ধ্বংসলীলার তাণ্ডবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ভন্ডুল করার এক মারণযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি ব্যর্থ হলেন ওই নির্বাচন ঠেকাতে।

এ পর্যায়ে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, নির্বাচন বয়কট করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু, শত শত মানুষকে খুন-জখম করে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে বা জ্বালিয়ে দিয়ে, দেশের সম্পদের নির্বিচার ক্ষতিসাধন করে জবরদস্তিমূলকভাবে নির্বাচন বানচাল করার অপপ্রয়াস নিঃসন্দেহে নির্ভেজাল সন্ত্রাস এবং অগ্রহণযোগ্য ফ্যাসিবাদী বর্বরতা।

গণতান্ত্রিক অধিকারের গলাবাজি করে এহেন বর্বরতাকে জায়েজ করা যাবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একতরফা হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু, তার দায় তো খালেদা জিয়াকেও নিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ‘সংসদ প্রয়োজন মনে করলে আরও দুটো নির্বাচন ওই ব্যবস্থায় করার জন্য আইন পাস করতে পারে’মর্মে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছিল।

বোধগম্য কারণেই ক্ষমতাসীন জোটের নিয়ন্ত্রণাধীন সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রয়োজন মনে করেনি বা চায়নি। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল বা জোট গো-হারা হেরে গেছে।

সন্দেহ করার কারণ রয়েছে যে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসাত্মক তাণ্ডবের ক্ষমতার ওপর অতি বেশি আস্থা রেখেছিলেন এবং দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত রাখা গেলে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের আশা করেছিলেন।

এটা তো স্বীকার করতে হবে যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৩ সংসদীয় আসনে মহাজোটের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছেন এ জন্য যে ওই আসনগুলোতে মহাজোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীদের সরাসরি প্রতিযোগিতা হবে ধরে নেওয়া হয়েছিল এবং বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে বলেই হিসাব কষেছিল মহাজোট।

বিএনপি দাবি করছে, ওই নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি, নির্বাচন কমিশন বলছে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু, প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, যেসব জায়গায় ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেছেন, সেখানে তাঁরা কি নিরাপদে যেতে পেরেছেন? কয়েক শ স্কুলের ভোটকেন্দ্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কিছু জায়গায় ভোটারদের লাঠিপেটা করে ভাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভোট দেওয়ার অপরাধে কয়েকটা জায়গায় কিছু ভোটারকে ন্যাংটো করে মারধর করা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের অনেক গ্রামে ভাঙচুর করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোটের নির্ভেজাল সন্ত্রাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবেই বিবেচিত হবে। এবারের ডাকা অবরোধের বর্তমান পর্যায়েও পেট্রলবোমার আক্রমণে সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে মানুষ পোড়ানোর নারকীয় তাণ্ডব চালানো হচ্ছে নির্বিচারে।

বোঝা যাচ্ছে, বিএনপির নেতারা টাকার জোরে নিজেদের গোপন আস্তানা থেকে হুকুম জারি করে এই আন্দোলন পরিচালনা করে চলেছেন, অথচ মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। কতই অমানবিক রাজনীতির নামে এই জনজীবন বিপর্যস্ত করার পৈশাচিক আয়োজন!

ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, বর্তমান সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে না এলেও এটা ‘সাংবিধানিকভাবে বৈধ’সরকার। পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করার আগে অবরোধ, হরতাল কিংবা অসহযোগ আন্দোলন করে এই সরকারকে উৎখাত করা যাবে না। সংলাপের মাধ্যমে মধ্যবর্তী নির্বাচনে যাবে কি না, সেটা শেখ হাসিনাকে হাত মোচড়ানোর মাধ্যমে আদায় করা যাবে না।

গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর ক্ষমতাও বিএনপি-জামায়াত জোটের নেই। মনে রাখতে হবে, ২০০৭ সালের ‘ইয়াজউদ্দিন সরকার’ছিল একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তা-ও সংবিধান লঙ্ঘন করে খালেদা জিয়ার গোপন নির্দেশে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন ওই সরকার গঠন করার কারণে ওটার নৈতিক ভিত্তি ছিল আগাগোড়াই দুর্বল।

উপরন্তু, জেনারেল মইন উ আহমেদকে সরিয়ে খালেদা জিয়ার পছন্দসই চিফ অব স্টাফ নিয়োগের উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের আদেশ জারির খবরটি মাহেন্দ্রক্ষণের আগে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ‘প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক’হিসেবে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জেনারেল মইন উ আহমেদ ও তাঁর সহকর্মী জেনারেলরা হস্তক্ষেপ করেছিলেন।

এবারও খালেদা জিয়া ২০১৩-১৪ সালের একই পথে এগোচ্ছেন। শেখ হাসিনা সংলাপে রাজি না হলে তিনিও ছাড় দেবেন না। ইতিমধ্যে তিনি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। দেশ ক্রমেই অচল হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে দুই নেত্রীর জেদাজেদির প্রতিযোগিতায় ভাটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রুটিনমাফিক দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রলবোমার শিকার হয়ে মানুষ অঙ্গারে পরিণত হচ্ছে। অর্থনীতি আর বেশি দিন এই ধকল সামলাতে পারবে না।

দেশে-বিদেশে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে সংলাপের জন্য, শেখ হাসিনার ওপরই চাপটা বেশি পড়বে বোধগম্য কারণে। তাঁর পাল্টা চাল দেওয়ার ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকবে। এহেন একটি সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে তাঁর উচিত হবে অনতিবিলম্বে বিএনপির সভা-সমাবেশের ওপর আরোপিত সব বাধানিষেধ প্রত্যাহার করা। তাহলে তিনি আদতে কী চাইছেন, তা খোলাসা হয়ে যাবে।

মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো)

এমকে