গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে কোন সম্পর্ক আছে কী? একবিংশ শতকে এই উত্তর-আধুনিক যুগে বাস করেও এমন একটি প্রশ্নের অবতারণা করতে হলো এই জন্য যে, আমাদের দেশের অনেকেই মনে করেন যে, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সম্পর্ক নেহায়েতই কম; নাই বললেই চলে। যারা এমন ধারণা পোষণ করেন, তাদের যুক্তি হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করার সুযোগ দিলে উন্নয়নকে পেছনে ঠেলে দেয়া হয়। উন্নয়ন চাইলে গণতন্ত্রকে ‘গুডবাই’ না জানালেও এর চর্চাকে একটা চৌহদ্দির মধ্যে সীমিত করে দিতে হবে।
উন্নয়ন অর্থনীতিতে এমন তত্তে¡র নাম হচ্ছে ‘লী তত্ত¡’। সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ইউ (১৯২৩-১৯১৫) এ তত্তে¡র জনক। তাঁর মতে, মৌলিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুততর হয়। এ কারণে উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যাহত হয় এমন কোনো কর্মসূচি দেয়া যাবে না। এজন্য নাগরিকের বাক স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতা হরণ করা জায়েজ বলে মনে করতেন তিনি। এক সময় বিশ্বের কঠোর রাজনৈতিক ব্যবস্থাধীন রাষ্ট্রসমূহে এই তত্ত¡টি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল।
কিন্তু এই পুরো বিষয়টিকেই নাকচ কিরে দিয়েছেন অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী ড. অমর্ত্য সেন। তিনি মনে করেন, অনেক সময়েই গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতার অভাবেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা তথা উন্নয়নে বিঘ্ন ঘটে। আর মিছিল-মিটিং, জ্বালাও-পোড়াওসহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি তখনই হয়, যখন অমর্ত্য সেনের ভাষায়,-‘গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতার অভাব’ হয়।
তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা উন্নয়ন, আমরা যাই বলি না কেন-তা কঠোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে সহানুভূতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর বেশি মাত্রায় নির্ভর করে। (অমর্ত্য সেন, উন্নয়ন ও স্ব-ক্ষমতা, অনুবাদ : অরবিন্দ রায়, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ, পৃষ্ঠা-২৫)।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রে ছাড়’ শীর্ষক এক লেখায় একেএম জাকারিয়া বলেছেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘উন্নয়নের’ সংজ্ঞা ঠিক করা। যুক্তরাজ্যের স্বাধীন থিংকট্যাংক ওভারসিস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের রাজনীতি ও শাসনবিষয়ক রিসার্চ ফেলো আলিনা রোচা মেনোকাল গণতন্ত্র ও উন্নয়নবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পাঠ করা প্রবন্ধে বলেছেন, উন্নয়নের এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি আমরা অমর্ত্য সেনকে বিবেচনায় নিই, তবে তা বেশ ব্যাপক। তাঁর কাছে উন্নয়নের সংজ্ঞা হচ্ছে ‘মুক্তি’। কারণ তিনি শুধু অর্থনৈতিক সূচককেই উন্নয়নের সংজ্ঞায় যুক্ত করেননি। রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি, সামাজিক সুযোগ, স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা, সুরক্ষামূলক নিশ্চয়তার বিষয়গুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছেন।
গণতন্ত্রে দুই ধরনের অধিকার রয়েছে যা জনগণ ভোগ করে। এসব অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা যায় না। এর একটি হচ্ছে রাজনৈতিক অধিকার ও অপরটি অর্থনৈতিক অধিকার। রাজনৈতিক অধিকারের মূল কথা হলো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ পরোক্ষভাবে এ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। তবে গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য কিন্তু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বাংলদেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মরহুম মোজাফফর আহমদ চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচন একনায়কতন্ত্রেও আছে। একটি দেশ গণতান্ত্রিক কিনা, তার পরিচয় পাওয়া যায় সেই দেশে বিরোধী মতের লালন কতটুকু হয় তা দেখে। যেখানে গণতন্ত্র আছে সেখানে বিরোধিতা থাকতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরোধিতা করার অধিকার যে স্বীকার করতে হবে কেবল তাই নয়, বিরোধিতা করার এই অধিকারই গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। গণতন্ত্রে বিরোধিতা আইনসঙ্গত ও সংবিধানগত। একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের এখানেই পার্থক্য।
(দেখুন সরদার ফজলুল করিম সম্পাদিত মোজাফফর আহমদ চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত)
আসলে বিরোধিতা না থাকার নেতিবাচক দিক হচ্ছে এই যে, বিরোধিতা না থাকলে সরকারের মধ্যে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরি হয় না। জবাবদিহি না থাকলে দায়িত্বশীলতা থাকে না। এতে সরকার অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। তার কোন লাগাম থাকে না। তাই সীমাহীন ক্ষমতার পাগলা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সরকার নিয়ন্ত্রণের-ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।
লর্ড অ্যাক্টন বলেছিলেন, Power tends to corrupt and absolute power corrupts absolutely. অর্থাৎ ক্ষমতার মধ্যে মানুষকে দূষিত করার প্রবণতা দেখা যায়, এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চুড়ান্তভাবে মানুষকে নীতিহীনতায় পর্যবষিত করে। এজন্য সরকারের ক্ষমতা জনকল্যাণে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করতে রাষ্ট্র যেসব হাতিয়ার কাজে লাগায় তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে কার্যকর বিরোধিতা।
এখানে আমরা ইউনাইটেড পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খানের উদারহণ তুলে ধরতে পারি। তিনি নিজে ছিলেন সামরিক বাহিনীর লোক। তার আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্র ছিল না। তিনি মৌলিক গণতন্ত্রের নামে তার মতো করে জনগণকে সীমিত গণতন্ত্র চর্চা করার অধিকার দিয়েছিলেন। সীমিত গণতন্ত্রের নামে আসলে জনগণকে গণতন্ত্র চর্চা করার অধিকার থেকে বঞ্চিতই করেছিলেন তিনি।
এ কারণে তার সরকারের বৈধতার সংকট লেগেই ছিল। তাই কিছু ভৌত অবকাঠামো হলেও সুষম উন্নয়ন বলতে যা বুঝায়, তা হয়নি। তার আমলে একটি শ্রেণি মাত্র ফুলেফেপে তড়তাজা হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে জনগণের কোন লাভ হয়নি। এক সময় জনগণের আন্দোলনের তোড়ে গদিচ্যুত হতে হয়েছিল তাকে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এ বিখ্যাত আন্দোলন ‘উনসত্তরের গণআন্দোলন’ হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলেও ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন কম হয়নি। কিন্তু গণতন্ত্র না থাকায় জবাবদিহিতা ছিল না। এ কারণে দুর্নীতি মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ে। যার খেসারত বাংলাদেশ বর্তমানেও দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের সকলেই একটি কথা বলতে চেষ্টা করেন যে, উন্নয়ন ছাড়া গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করা যায় না। তাই বেশি গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না।
একেএম জাকারিয়া তার লেখায় বলেছেন, “১৯৯৬ বা ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ যখন সরকার চালিয়েছে, তখন অবশ্য দলটির কোনো নেতার কাছ থেকে এ ধরনের কথা শোনা যায়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ও এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার পর সম্ভবত দলটি বুঝতে পেরেছে যে ‘গণতন্ত্র’ নিয়ে মাতামাতি করার অবস্থা তাদের আর নেই। এর বিকল্প কিছু লাগবে। গণতন্ত্রের জায়গা দখল করে নিল ‘উন্নয়ন’। জনগণকে এখন গণতন্ত্র বাদ দিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাতে হবে। সরকারের নেতাদের ভাষণ-বক্তব্যে জায়গা করে নেয় এই ‘উন্নয়ন’। আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্কেও উঠে আসতে শুরু করে উন্নয়ন না গণতন্ত্র, কোনটি আমাদের জন্য বেশি জরুরি।”
তিনি লিখেছেন, “‘উন্নয়নের’ স্বার্থে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ছাড়টি দিতে হবে, সেটা সম্ভবত নির্বাচন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন যেভাবে হয়েছে বা এ বছরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন যেভাবে হচ্ছে, সামনেও মনে হয় সরকার সে ধরনের নির্বাচনের পথেই হাঁটার কথা ভাবছে। সরকার জনগণকে যে ‘উন্নয়ন’ দিতে চাইছে, সেটা পেতে হলে এ ধরনের নির্বাচনকেই মেনে নিতে হবে। আর সরকারি দল যেহেতু ‘বেশি’ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, ফলে নাগরিক বা মানবাধিকার, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছতা বা জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।”
সরকারি দলের নেতারা বিশেষ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, সরকার বেশি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। এর মানে সরকার ‘বেশি’ গণতন্ত্র দিয়ে ফেলেছিল এবং এখন এর ‘মাত্রা’ কমানো হবে। এবং এর সঙ্গে যে উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরের বক্তব্যে। বলেছেন, ‘মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ যে পথে এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সে পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।’
জাকারিয়া মনে করেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাহাথির মোহাম্মদের পথে এগোতে থাকলে ‘উন্নয়নের’ গতি কতটুকু বাড়বে, সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু এই ধারার উন্নয়ন চেষ্টায় আর যাই হোক, অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশের জনগণের রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি মিলবে না। স্বচ্ছতার নিশ্চয়তাও পাওয়া যাবে না। উন্নয়নের বড় শত্রু দুর্নীতি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীন পরিস্থিতি বরং উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
কার্যকর গণতন্ত্র উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে এই ধারণার পেছনের সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য। এই ব্যবস্থা জবাবদিহি ও ভারসাম্য নিশ্চিত করে, নির্বাচন ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর পর তা কার্যকর করা যায়।এ ছাড়গুলো তারা মেনে নিতে রাজি আছে কি না।
সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপকমিটির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর শেষে এক বিবৃতিতে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাও স্মর্তব্য। এতে তারা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।’ প্রতিনিধি দলটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের লাগাতার হরতাল-অবরোধের মধ্যে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আসে। আবার ২০ ফেব্রুয়ারি চলে যায়। চলে যাওয়ার আগে উপর্যুক্ত বক্তব্য সম্বলিত একটি বিবৃতি দিয়ে যায়।
তাহলে এটা দিবালোকের মতই স্পষ্ট যে, উন্নয়নের কথা বলে মানুষকে তার গনতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। এতে বরং উল্টো ফল পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
[ বি. দ্র.- মতামত লেখকের একান্ত নিজেস্ব, টাইমনিউজ বিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সস্পর্ক নেই। ]
এমবি





