আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, অবাক লাগে পিয়াস করিম কেমন করে রাজাকারের নাতি, ছেলে বা রাজাকার হন। তার বিস্ময়বোধে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি আইনমন্ত্রী। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ফলে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম। আফসোস, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক প্লাটুন, সিপি গ্যাং ইত্যাদি অজ্ঞাত, অখ্যাত সংগঠনের কব্জায় চলে গেছে শহীদ মিনার। ইতিমধ্যে পিয়াস মানুষের অপার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বনানীতে চলে গেছেন। আমরা, পিয়াসের বন্ধুরা বায়তুল মোকাররমে মানুষের ঢলের মধ্য দিয়ে তাকে বনানীতে রেখে এসেছি।

১৯ অক্টোবর আইনমন্ত্রীর খবরটি যখন পড়ি তখন বিশ্বাস করিনি। কিন্তু সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেখলাম তিনি নিজেই তার কথার পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। দেরিতে হলেও তিনি সাহস করে পিয়াসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও কুৎসার জবাব দিয়েছেন। তাকে ধন্যবাদ জানাই।

শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকার সাংবিধানিক ও নৈতিক ভিত্তি দেশে ও বিদেশে বিতর্কিত। এর মীমাংসার কোনো লক্ষণ নেই। এই পরিস্থিতিতে সহিংস বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি দেশকে কোথায় নিতে পারে সে সম্পর্কে আনিসুল হক, মনে হয়, ওয়াকিবহাল। আইনজীবী হিসেবে রাষ্ট্র ও রাজনীতির ক্ষতস্থানে মাছির মতো বসে আছেন তিনি। বুঝেছেন বাপ্পাদিত্য বসু কিংবা রাশেদ খান মেননের মতো সামাজিক ও রাজনৈতিক নুইসেন্স তৈরি করার সময় এটা নয়। ক্ষমতাসীনদের বহু কুকর্মের জবাবদিহি দেশে-বিদেশে তাকে করতে হচ্ছে। আইনজীবী হিসেবে তিনি হয়তো বোঝেন, শহীদ মিনার কোনো গোষ্ঠীর বাপের সম্পত্তি নয়। কোনো গোষ্ঠী শহীদ মিনার দখল করে বলতে পারে না, অন্যদের আমরা এখানে আসতে দেব না। সেটা বেআইনি কাজ। এই ধরনের কোনো নজির তৈরির পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। ক্ষমতার হাতবদল হলে অন্যরাও বলতে পারে, বাংলাদেশের মাটিতে কোনো ফ্যাসিস্টদের স্থান হবে না। এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে, সেই সব অন্য দিনের জন্য আনিসুল হক তার ভাবমূর্তি ফর্সা রাখতে চাইছেন হয়তো। যে কারণেই হোক, সমাজে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন সুস্থ মানুষের মারাত্মক অভাব আছে বলে তার এই ভূমিকা ভবিষ্যতের জন্য অনেকেই মনে রাখবে।

তবে এটা বোঝা যায়, পিয়াসের প্রতি নাগরিক শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াস প্রতিরোধের এই নোংরা তৎপরতার বিরুদ্ধে সুশীল, আওয়ামীপন্থী ও সেক্যুলারদের মধ্যে বেশ অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এটা অধিকাংশই ভালোভাবে নেননি। সেটা খুবই ভালো। যারা নানাভাবে প্রতিবাদ করেছেন ও করছেন তাদের আন্তরিক অভিনন্দন। বাংলাদেশকে যদি আমরা রক্ষা করতে চাই, তাহলে বিভাজন ও বিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠে নীতিগত ঐক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা দরকার।

প্রথম আলোর একটি সম্পাদকীয় মন্তব্য থেকে সমাজ কতটা নাড়া খেয়েছে বোঝা যায়। ২০ অক্টোবর সোমবার তারা লিখেছে : অধ্যাপক পিয়াস করিমের মরদেহ শহীদ মিনারে নিতে না দেওয়ার নামে রাজনৈতিক মহলে কুৎসিত তৎপরতা চালানো হয়েছে। তাঁকে স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যায়িত করে একটি পক্ষ অনলাইনমাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জমিনে ঘৃণা প্রকাশ করে চলেছে। এই ঘৃণার সুনামি ক্রমেই দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকের ভাবমূর্তিতেও আঘাত হেনেছে। শাহবাগে একটি ভুঁইফোড় সংগঠন ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচকদের ছবিতে কাটাচিহ্ন দিয়ে তাঁদের মৃত্যুর পর শহীদ মিনারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদ মিনারে পিয়াস করিমের শেষ সম্মাননার অনুমতি না দিয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। সবকিছু মিলিয়ে শহীদ মিনারকে সচেতনভাবে দলীয় সম্পত্তি বানানোর প্রয়াস অত্যন্ত নিন্দনীয়।

কেন এই কুৎসিত তৎপরতা? এর পশ্চাৎ কারণ কী? প্রথম আলোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক ঘরানার নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার ঘটানোই এর কারণ। তারাই বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছে। রাজনৈতিক ঘরানা মানে কী? রাজনৈতিক দল? রাজনৈতিক দল মানে তো নিশ্চয়ই হার্মোনিয়াম পার্টি নয়। তাদের কাজই হল নিজ নিজ ক্ষমতার বিস্তার ঘটানো। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের ক্ষমতা বিস্তারের চেষ্টা করে তাতে দোষ কী? এ ধরনের মন্তব্য এদিক থেকে অর্থহীন। কিন্তু তাদের এই রাজনৈতিক ঘরানা সংক্রান্ত ভাবনারও তো নিশ্চয়ই কিছু অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। সেই অর্থোদ্ধার করতে হলে কিছু আলোচনা দরকার।

প্রথম আলো শহুরে সেক্যুলার মধ্যবিত্তের পত্রিকা, সুশীলদের মুখপত্র এবং পাশ্চাত্যের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের সহযোগী। একান্তই কর্পোরেট স্বার্থের সঙ্গে তাদের সরাসরি জড়িত থাকার কারণেই দুনিয়াব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের রাজনীতিতে ডেইলি স্টার-প্রথম আলোর সম্পৃক্তি। যে কারণে তাদের সেক্যুলার লিবারেল রাজনীতির মূলমন্ত্র লিবারেল বা উদার রাজনীতি নয়, বরং প্রায়ই তার বিরোধিতা। বাংলাদেশের সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা অস্বীকার করে কোনো পত্রিকার ক্রমাগত ইসলাম প্রশ্নে বিরূপ থাকা ও নির্বিচারে ইসলামপন্থী রাজনীতির বিরোধিতা করা সেক্যুলার ও উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়, হতে পারে না। এটা আমাদের স্পষ্ট বুঝতে হবে। কেন?

ইসলাম তো নিছক ধর্মতত্ত্ব বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়। গ্রিকো-খ্রিস্টীয় চিন্তা, দর্শন ও সংস্কৃতিকে যেমন সেক্যুলার জায়গা থেকে পাঠ ও আত্মস্থ করা সম্ভব, ইসলামও তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিগঠনে ধর্মতাত্ত্বিক ইসলামী ব্যাখ্যায় সেক্যুলার আপত্তি থাকতে পারে, তাতে অসুবিধা নেই। যেমন সেক্যুলার আদর্শের জায়গা থেকে সেক্যুলাররা শরিয়াভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে। সেটা করুক। কিন্তু এ ধরনের আপত্তি বহাল রেখেও ইসলামের দার্শনিক মর্ম থেকে সুনির্দিষ্ট সেক্যুলার প্রস্তাবও পাঠ করা যায়। যেমন- ইসলাম সাম্যের কথা বলে, জাতপাত আভিজাত্যের ভেদাভেদ মানে না; ব্যক্তিকে সমষ্টি বা সমাজের চেয়ে বড় গণ্য করে না; সুশাসনের জন্য নীতিবান ও সৎ মানুষকে পছন্দ করে ইসলাম চোর, ডাকাত ও দুর্বৃত্তদের কঠোরভাবে শাস্তি দেয়ার পক্ষপাতী। সম্পদের সহনশীল বণ্টনকে ধর্ম ও নীতিনৈতিকতার দিক থেকে ইসলাম বাধ্যতামূলক মনে করে। পরিশ্রমী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ইসলাম পছন্দ করে, কিন্তু ইসলাম মহাজন, আড়তদার ও মুনাফাখোরদের ঘোর বিরোধী। এমনকি অনেকে বলেন, নিতান্তই অক্ষম না হলে কোনো পরিশ্রম না করে সামাজিক সম্পদ আত্মসাৎ করারও ঘোর বিরোধী ইসলাম। যেমন- ইসলাম জমি ভাড়া ও বাড়ি ভাড়ারও বিরোধী। কেউ জমি বা বাড়ির মালিক বলে, শুধু মালিকানার দলিল আছে বলে বাড়ি ভাড়া বা কৃষকের পরিশ্রমের ফসল আত্মসাৎ করতে পারে না। সেই বাড়ি বা জমির সে আমানতদার মাত্র। তার কাছ থেকে বাড়ি বা জমি কেড়ে নেয়ার কোনো অধিকার যেমন কারও নেই, তেমনি সে নিজে যদি তার বাড়ি বা জমি নিজে ব্যবহার না করে, তাহলে অন্যদের তা কোনো ভাড়া ছাড়াই ব্যবহার করতে দিতে হবে।

বাংলাদেশের যে কোনো উদার ও সেক্যুলার মানুষই বুঝবেন যে, ইসলামের কথা ঘুণাক্ষরে উচ্চারণ না করেও এসব কর্মসূচি বা নীতি বাস্তবায়নের কথা অনায়াসেই বলা যায়। যদি বলি তবে সেটা শুধু সেক্যুলার রাজনীতিই হবে না, একই সঙ্গে ইসলামী রাজনীতিও হবে। আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক ও বাজার ব্যবস্থা যদি খ্রিস্টীয় প্রটেস্ট্যান্ট স্পিরিট হয়, তাহলে উপরে বর্ণিত আধুনিক নীতি ও আদর্শও অবশ্যই ইসলামী স্পিরিট। আলবত। এ দিক থেকে আধুনিক বাজার ব্যবস্থা ও আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণাকে সেক্যুলার বলার অর্থ এ ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্রের ইহুদি ও খ্রিস্টীয় চরিত্রকে আড়াল করে রাখা। তাকে ধোয়া তুলসি পাতা হিসেবে হাজির করা। ভাবখানা এ রকম- খ্রিস্টীয়, ইহুদি বা অন্য কোনো ধর্মচিন্তার সঙ্গে এ ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্রের কোনো যোগ নেই। সমাজ ও রাষ্ট্র মাত্রই ইহুদি বা খ্রিস্টীয় চরিত্রের হতে হবে, এটা সেক্যুলার চিন্তা হতে পারে না, ঠিক তেমনি ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্র মানেই ধর্মতাত্ত্বিক সমাজ ও রাষ্ট্র, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

শুধু সেক্যুলাররা নয়, ইসলামপন্থী রাজনীতি যারা করেন, তাদেরও এই সত্য বুঝতে হবে। ইসলামী চিন্তা, দর্শন ও নীতিকে কীভাবে বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মতত্ত্ব হিসেবে নয়, বরং সার্বজনীন নীতি ও আদর্শ হিসেবে হাজির করতে হয় সেটা আধুনিককালের ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস বিচার করলেই বোঝা সম্ভব। আধুনিককালে এটা রপ্ত করার ওপর ইসলামের মতাদর্শিক আধিপত্য বিস্তার ও ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিহিত। ইসলাম-প্রধান দেশগুলোর জনগণ এতে কামিয়াব হবে কিনা জানি না; কিন্তু এর সঙ্গে ইসলামের বিশেষ বিশেষ প্রস্তাবনা সার্বজনীন আদর্শ হিসেবে চিন্তা, মতাদর্শ ও রাজনীতি হিসেবে হাজির করার সীমা ও সম্ভাবনার প্রশ্ন জড়িত। সেক্যুলার রাজনীতির ফাঁদে পড়ে ইসলামপন্থীরা মনে করেন, সেক্যুলারিজম ও ইসলামের সঙ্গে বুঝি ব্যবধান এতই বিশাল যে, নতুন কোনো সংস্কারমূলক বা বিপ্লবী চিন্তা, দর্শন ও রাজনীতির সামনে ইসলাম শব্দটি না লাগালে তা সহি ইসলাম হবে না। এই বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠতে হবে দ্রুত। এই কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই বাংলাদেশে ইসলামের সার্বজনীন প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়ে উঠবে।

সেক্যুলাররা ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে ইসলাম যেন তার দার্শনিক প্রস্তাবনা নিয়ে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিমণ্ডলে হাজির থাকতে পারে তার জন্য পরিবেশ ও পরিস্থিতি সুগম করাই ছিল সেক্যুলার রাজনীতির দিক থেকে সহি পথ। স্টার-প্রথম আলো গ্রুপ তাদের জনপ্রিয়তা ও আধিপত্যের জন্য এই কাজটি খুব ভালোভাবে করতে পারত এবং উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারত বলে আমি মনে করি। কিন্তু তারা তা না করে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাকে নিরন্তর একটি ইসলামবিরোধী মতাদর্শ হিসেবে হাজির করেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে ক্রমাগত আহত করেছে এবং খেয়ে না খেয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও আতংক ছড়ানোকেই সেক্যুলারিজম বলে চর্চা করেছে। যে কারণে তারা আওয়ামী লীগ, ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাঝেমধ্যে সমালোচনা করলেও আওয়ামীপন্থী রাজনীতির বাইরে আসতে পারেনি। শুধু তাই নয়, বিএনপি ও তার জোটের বিরুদ্ধে সবসময়ই অবস্থান নিয়েছে। কার্যত ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোট করায় বিএনপির বিরোধিতা করাকে তারা তাদের উদার ও সেক্যুলার রাজনীতির জন্য অতি আবশ্যিক নৈতিক কর্তব্য গণ্য করেছে। যার ফল হচ্ছে বর্তমান ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। স্টার-প্রথম আলোর ঔরসেই শহীদ মিনার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক প্লাটুন, সিপি গ্যাং ইত্যাদির জন্ম হয়েছে। নিজেদের ঔরসজাত সন্তানদেরই তাদের এখন প্রকাশ্য নিন্দা করতে হচ্ছে। ২৩ অক্টোবর প্রথম আলোয় কালের পুরাণ (সিপি গ্যাং, গং এবং নিষিদ্ধ শহীদ মিনার) কলাম পড়ে আওয়ামী সৈনিক পুরনো বন্ধু সোহরাব হাসানের জন্য আমার খুবই করুণা হল। অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরিস্থিতি যেখানে এসে ঠেকেছে, তাতে তাদের এই গোনাহর কাফফারা আরও বড়ভাবে আদায় করা ছাড়া এ ধরনের ইসলাম-বিদ্বেষীদের অন্য কোনো পথ আছে কি-না, আমার চোখে পড়ছে না।

ইসলামপন্থী রাজনীতির বিরোধিতা অনেক ক্ষেত্রে উদার সেক্যুলার চিন্তার দিক থেকে ন্যায়সঙ্গত হতে পারে, কিন্তু স্টার-প্রথম আলো সব রকম ইসলামী রাজনীতির ঘোর বিরোধী। উদার গণতন্ত্রে ইসলামী রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে জায়গা করে না দেয়ার পরিণতিই বিভাজন ও সহিংসতার রাজনীতির জন্য বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি করে। কিন্তু স্টার-প্রথম আলো এই প্রাথমিক কাণ্ডজ্ঞানের অধিকারী নয়। বাংলাদেশকে এর মূল্য দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রথম আলো জনপ্রিয় পত্রিকা হওয়ার কারণে তাদের ভূমিকায় বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে বিপুল। রাজনীতিতে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো গণতান্ত্রিক আদর্শ চর্চার সাংস্কৃতিক, মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে দেয়াই ছিল সঠিক অবস্থান। সেই রাজনীতিতে ইসলামের অবদান রাখার সুযোগ যেমন তৈরি হতো, একই সঙ্গে সেক্যুলার অর্থাৎ পাশ্চাত্য এনলাইটমেন্টকে যারা ধর্মজ্ঞান করেন তারাও অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু প্রথম আলো ধর্মনিরপেক্ষতার

নামে নির্বিচার ইসলাম বিরোধিতাকেই সেক্যুলার চিন্তা মনে করেছে। ফলে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তব অর্থ হয়েছে ইসলামের বিরোধিতা করা।

এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণার ভিত্তিতে। স্বাধীনতার ঘোষণায় সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছিল; তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ নয়। বাংলাদেশে এখন আমরা যে ধরনের রাজনৈতিক বিভাজন, বিভেদ, সন্ত্রাস ও সহিংসতা দেখছি তার কারণ স্বাধীনতার ঘোষণা অস্বীকার করে আওয়ামী লীগের দলীয় মতাদর্শকেই রাষ্ট্র গঠনের আদর্শ হিসেবে পরবর্তীকালে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। যা আদতে ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ; ঔদার্য, সহনশীলতা ও গণতন্ত্রের সঙ্গে যার কোনোই সম্পর্ক নেই। স্টার-প্রথম আলো ধরে নিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী বয়ানই বাংলাদেশের গণ-ইতিহাসের সঠিক বয়ান। যা মোটেও ঠিক নয়।

কিন্তু এই সমালোচনার পরও আমি প্রথম আলোর এই অবস্থানকে স্বাগত জানাই। উদার গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার রাজনীতির একটি চিন্তাশীল চর্চার ক্ষেত্র আমাদের দরকার। যদি তারা তাদের অতীতের ভুল কাটিয়ে উঠতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশে আগামী দিনে তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশকে তারা তাদের ভূমিকার জন্য আজ কোথায় নিয়ে এসেছেন, আশা করি তাদের হাউজে যারা বিচক্ষণ তারা উপলব্ধি করছেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে স্টার-প্রথম আলোর ইতিবাচক ভূমিকাই কামনা করি। আমার আশা, স্টার-প্রথম আলো এক-এগারোর মতো আবারও ষড়যন্ত্রের নায়ক হবে না। সহি চিন্তা, অন্যের চিন্তা ও মতের প্রতি সহনশীলতা এবং আন্তরিকভাবে উদার গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম চর্চাও বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ইতিবাচক হতে পারে, যারা উপরের লেখাগুলো পড়ে এসেছেন আমি কী অর্থে কথাটা বলছি তার মর্ম বুঝবেন। ইসলাম এ দেশের মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতি। এ দেশের মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণের ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অতএব বাংলাদেশের জনগণের চিন্তায়, দর্শনে ও রাজনীতিতে ইসলাম থাকবেই। একে রোখার কোনো শক্তি কারও আছে বলে আমি মনে করি না। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে থাকবে? তার রূপ কী হবে? এটাই এখনকার আলোচনার বিষয়। যারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আন্দাজ করতে পারছেন, তারা ঠিকভাবে তাদের কর্তব্যও নির্ধারণ করতে সক্ষম। ইসলামপন্থীদের দমন-পীড়ন উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ হতে পারে না।

পিয়াসের কফিন শহীদ মিনারে বাধা পেয়ে বায়তুল মোকাররমে যাওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে ভাবছিলাম। সোহরাব হাসানের লেখা ধরেই তার উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব। তিনি লিখেছেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কেবল ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মারক নয়, জাতীয় ঐক্য ও চেতনারও প্রতীক। যেমনটি হয়েছে একাত্তরের শহীদদের স্মরণে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এই দুটি প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠীর নয়; সমগ্র জাতির। খেয়াল করতে হবে, শহীদ মিনারের দ্যোতনা ধর্মীয়। শহীদ ও মিনার দুটোই ধর্মীয় দ্যোতনা বহন করে। একই সঙ্গে তারা সেক্যুলার। সেক্যুলার পরিমণ্ডলে ধর্মীয় চেতনা ও আবহ ধারণ করার গুরুত্বপূর্ণ নজির হচ্ছে শহীদ মিনার। এখানে জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে যে কেউই আসতে পারে, যদিও অলিখিত নিয়মে শহীদ মিনারে গরিব-মেহনতি-চাষাভূষা-শ্রমিকের স্থান নেই। কিন্তু তত্ত্বগতভাবে আমরা ধরে নিতে পারি, সবাইকেই শহীদ মিনার ধারণ করতে পারে।

কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক প্লাটুন, সিপি গ্যাংদের কারণে সমাজে অনেকেই অবাঞ্ছিত, যারা এই গ্যাং-এর রাজনীতি করে না। শহীদ মিনার সেক্যুলারদের তৈরি স্থান ও ভাবগত পরিমণ্ডলে জাতীয় ঐক্য ও চেতনার প্রতীক। এই সেক্যুলার পরিমণ্ডলটি পিয়াসকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে কার্যত ভেঙে ফেলা হল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও জাতীয় ঐক্য ধারণ করার ক্ষেত্রে সেক্যুলারদের মতাদর্শিক ও ভাবগত ঐক্যের অবসান ঘটল।

পিয়াসসহ ভিন্নমতের সবাইকে যদি বায়তুল মোকাররমের দিকে ঠেলে দেয়া হয় আর বায়তুল মোকাররমই যদি ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপরীতে জাতীয় ঐক্য ও চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে তো আসলে রাজনীতির নতুন অভিমুখের সূচনা হল।

পিয়াসের লাশের ভার শহীদ মিনার বহন করতে পারেনি বা বহন করতে অস্বীকার করেছে। বায়তুল মোকাররম তা সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন। সেক্যুলাররা ব্যর্থ; কিন্তু আগামীতেই বোঝা যাবে জাতীয় চেতনা ও ঐক্যের ভার ইসলামপন্থীরা আদৌ বহন করতে সক্ষম কিনা।

সেটা দেখে যাওয়ার আশা রাখি। পারব কিনা জানি না।

৯ কার্তিক, ১৪২১/২৪ অক্টোবর, ২০১৪, শ্যামলী, ঢাকা। সূত্র: দৈনিক যুগান্তর

এআর