এক.
লন্ডন সময় সকাল ৬ টা। ঘুম থেকে জেগেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নজর দেই। খুঁজছিলাম নিখোঁজ হওয়া তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী তানভীর হাসান জোহার সর্বশেষ খবর। অনেকগুলো পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে আপডেট পেলাম না। সর্বশেষ অখ্যাত একটি অনলাইন পোর্টাল পড়ে বুঝলাম, মি. জোহাকে গ্রেপ্তারের ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সত্যি কথা বলতে কি - মি. জোহার নিখোঁজ নিয়ে দেশজুড়ে যেভাবে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে ব্যক্তিগতভাবে আমি ততোটা উদ্বিগ্ন হইনি। দুটো কারণে আমি নির্ভার।

প্রথমত. অধিক শোকে মনটা মনে হয় পাথর হয়ে গেছে। প্রতিনিয়তই এমন গুম/হত্যার খবর আমরা শুনছি। রাজনৈতিক পরিবারে চলাফেরার কারণে অনেক কাছের লোকের গুম-খুন হওয়া নিয়ে দু:খের কাহিনী প্রতিনিয়তই শুনতে হয়। বাংলার বাতাসে আমরা এখন কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। লাশ, রক্ত, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, মামলা, কারাগার আজ বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আপনি হননি, আপনার ভাই গুম হয়েছেন। আপনি রক্তাক্ত নন, আপনার চাচাত ভাই পঙ্গু। আপনি পুলিশের গুলি দেখেননি, আপনার মামা পুলিশের গুলিতে নিহত। এভাবেই আর কি!


গত বুধবারও ফোন এলো, আমার ফুফাতো ভাই আবদুল জব্বার-কে ঢাকার শেরেবাংলানগর থেকে নিজের প্রাইভেটকারসহ একটি অজ্ঞাত বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। ড্রাইভারকে ছেড়ে দিয়ে গেলেও ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই।

পূর্ব-ঘটনা হিসেবে শুধু আন্দাজ করা যাচ্ছে, গুলশানে তাঁর একটি জমি দখল করে আছে সরকারের একটি বাহিনী। ওই জমি বিক্রির চেষ্টা করছিলেন তিনি। থানায় জিডি করা হয়েছে। পুলিশের কোনো নড়চড় নেই। কেবল বলছে, নতুন কোনো খবর নেই।

এভাবে অসংখ্য নাগরিকের হারিয়ে যাওয়ার দুঃসহ খবর আর বহন করতে পারছি না। রক্তের সম্পর্ক না হলেও রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে পুরো বাংলাদেশ একটি পরিবার হয়ে আছে। গণমাধ্যম খবর প্রকাশ না করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্যক্তিমাধ্যমে গুম-খুন-কারাগারের সংবাদে অস্থির সময় কাটছে।

দ্বিতীয়ত.আরেকটি বিশ্বাস থেকে আমি মি. জোহার নিখোঁজকে ততোটা গুরুত্ব দেইনি। সবাই জানেন, একটি ট্রেডিশনাল মিথ আছে- পুলিশের ইনফরমার, গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট ও ডাকাত বা কিলারগ্রুপের সদস্যরা কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। দৃশ্যত তানভীর হাসান জোহা যেহেতু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত ইনফরমার হিসেবে কাজ করেছেন, সেহেতু তিনি স্বাভাবিক বিশেষজ্ঞের লাইফে ফেরার চেষ্টা করে ভুল করেছেন। আর যদি ফিরতেই হয়, তাহলে ওই বাহিনীর পরামর্শে তাদের দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ফিরলে মি. জোহার কোনো ঝুঁকি ছিল না।

তাঁর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে গণমাধ্যমে আসার পেছনের গল্পটা আমরা জানা নেই। তবে এতোটুকু জানতে সক্ষম হয়েছি, তাকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ইনফরমার হিসেবেই কাজে লাগিয়েছে।

সরকারি পক্ষের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে, মি. জোহা কোনো প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কনসালটেন্ট ছিলেন না। অর্থাৎ, মি. জোহা কেবল তাদের সোর্স, এজেন্ট, ইনফরমার হিসেবে কাজ করেছেন।

তাঁর প্রযুক্তি জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সরকারি বাহিনী বহু মানুষকে গ্রেফতার করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেসবুকে কটূক্তির কারণে ধানমন্ডি থেকে এক কিশোরীকে গ্রেফতারের পেছনে এই প্রযুক্তিবিদের জ্ঞান কাজ করেছে। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও কন্যা শেখ হাসিনাকে নিয়ে ফেসবুকে কোনো কটূক্তি যাতে পোস্ট করা না যায়, এমন প্রযুক্তি নিয়ে আসছিলেন মি. জোহা।


প্রিয় পাঠক, আমি বলতে চাইছি- মি. জোহা তাঁর মেধাকে কাজে লাগিয়েছেন একটি অগণতান্ত্রিক সরকারকে দীর্ঘায়িত করতে। বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত ফন্দি দিয়ে অবৈধ সরকারের গুম-খুনে তিনি সহযোগিতা করেছেন। এটা তাঁর জ্ঞানিক অর্জন! তিনি পাপ করেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরির ঘটনায় নিজে মিডিয়ায় কথা বলে।

অর্থাৎ, প্রযুক্তি জ্ঞানকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর প্রথম পদক্ষেপে তিনি ভুলপথে পা দিয়েছেন। সঠিক বিষয়টি তিনি প্রমোটরদের জানিয়ে চুপচাপ থাকলেই পারতেন। তাহলে কোনো সমস্যা হতো না। হয়তো এখনো কোনো সমস্যা তাঁর হবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।


আমার এক সাংবাদিক ভাই পারভেজ নাদির রেজার মাধ্যমে যতুটুকু তথ্য পেলাম তাতে মনে হচ্ছে, মি. জোহা এ যাত্রা রেহাই পেতে পারেন। মি. জোহার নিখোঁজের পর একটি ইংরেজী পত্রিকায় অপরাধ ও আইন বিষয়ক প্রতিবেদক আমার এক ছোট ভাইয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসেই আমার এ সন্দেহ জেগেছিল। ছোট ভাইটি লিখেছিল, ‘সেমসাইড’।

যাইহোক, মি. জোহা পরিবারের কাছে ফিরে আসুক, এই প্রত্যাশা রাখি। একইসঙ্গে যারা মানুষ হত্যায় সহযোগিতা করেন কিংবা অবৈধ সরকারের নির্দেশে নিজ হাতে নাগরিকদের হত্যা করছেন; তাদের প্রতি অনুরোধ, আপনিও মানুষ। আপনার ভাই আছে, বোন আছে, বাবা-মা আছে। আপনার শরীরে রক্ত আছে। প্রাণ আছে। অন্যের প্রাণ কেড়ে নিতে সহযোগিতা করা বন্ধু করুন। নিজের হাতে গুম-খুন বন্ধু করুন। ভাবুন, যারা গুম হয়ে যায়; তাদের পরিবারের কথা। যারা খুন হয়, তাদের পরিবারের সাথে আপনার পরিবারকে মিলিয়ে দেখুন। কত কষ্টের স্মৃতি আপনারা তৈরী করছেন!

প্রাসঙ্গিকভাবেই একটি বিষয় প্রিয় পাঠকদের মনে করাতে চাই, শেখ হাসিনার নেৃতত্বের গুণের বিষয়টি। ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকান্ড থেকে তিনি একটির পর একটি ঘটনা কিভাবে সামাল দিচ্ছেন। একটির নিচে আরেকটি চাপা দিচ্ছেন। মাত্র দুই মাসের ঘটনা মিলিয়ে দেখুন।

প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামকে দিয়ে চাপা দিলেন। সঙ্গে গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণটা শতভাগ নিশ্চিত করলেন। ঘটলো বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি। মি. জোহার নিঁখোজে চুরির ইস্যুটা কিছুটা নড়চড় হলো। এরপরের দৃশ্যপট....... তৈরীতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।

এরই মধ্যে জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হবে। মানুষের কাছে এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে সহ্য করার পরিবেশ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের দীর্ঘ কারাবাস এখন সবার কাছেই স্বাভাবিক ঘটনা! বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান মিডিয়ায় নিষিদ্ধ, এটা যেন তাঁর কপালে লিখন না হয় খন্ডন!  

আরো নির্মম খবর হলো, এসবের ফাঁকে শেখ কন্যা তৃণমূলে বাকশালের ভুত প্রতিষ্ঠায় সফলতা দেখাচ্ছেন। পৌরসভা দখল করলেন, কেউ হাঁচিটি পর্যন্ত দিতে পারেননি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগেই একাংশ দখল করেছেন, এ খবর নিয়ে ভাবার সময় তিনি কাউকে দিয়েছেন? ষোল আনা বাকশাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সব ইউনিয়নই দখল হয়ে যাবে, আপনি ‘উহ’ বলার সুযোগ পাবেন না। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা, জেলা, পুলিশ বাহিনী, সচিবালয়, সংসদ সর্বত্রই বাকশালের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া প্রায় সম্পন্ন করেছেন শেখ হাসিনা। হয়তো ইউপি নির্বাচনের পরই পূর্ণ বাকশাল প্রতিষ্ঠায় সাফল্যের শেষ হাসি হাসবেন তিনি।

যদিও পরবর্তী দৃশ্যপট নিয়ে একটু ভয় থাকে। কর্নেল তাহেরের ভাই প্রফেসর আনোয়ার হোসেন এ বিষয়ে শেখ কন্যাকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, বাবার মতোই না-কি শেখ হাসিনা চারপাশ থেকে কাছের লোক-শূন্য হচ্ছেন। বাবার পরিণতির দিকে এগোচ্ছেন শেখ হাসিনা, এমন সতর্কতাও জানিয়েছেন প্রফেসর সাহেব। তবে বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটুক তা সচেতন কেউ চাইবে না। আমরা চাই না। 

দুই.
প্রিয় পাঠক, হয়তো আমার গতকালের আর্টিকেলটি পড়েছেন। অনেকেই পছন্দ করেছেন। কেউ কেউ ফোনে, আবার ফেসবুকে ইনবক্সে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বিএনপির কিছু বন্ধু লেখাটির শেষের দিকের একটি অংশ নিয়ে ভাল-মন্দ মতামত জানিয়েছেন। বিশেষ করে, বিএনপির কমিটি লন্ডনে হওয়ার বিষয়টি! আপনাদের প্রতিক্রিয়ার পর একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছি বিএনপির কাউন্সিল ও নতুন কমিটি গঠনের সর্বশেষ পরিস্থিতির।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ি, এখন পর্যন্ত নতুন কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু-ই হয়নি। শনিবারের কাউন্সিল অনুষ্ঠানে চেয়ারপার্সন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হবে।

এরপর নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। তাতে এক-দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াটি হবে গতানুগতিক। নিশ্চিত হয়েই বলছি, নতুন কমিটি গঠনে লন্ডন থেকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মতামত দেবেন। সিনিয়র নেতাদের মতামত নিয়ে নতুন মহাসচিবের সঙ্গে বসে নতুন কমিটি চূড়ান্ত করবেন চেয়ারপার্সন। এবার বাজারে লেন-দেনের সুযোগ থাকবে কম।

গত সাত বছরের আন্দোলনের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের অঙ্গীকার আছে নীতিনির্ধারকদের। সাবেক ছাত্রনেতাদের সুযোগ থাকছে বেশী। এক্ষেত্রে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কোনো বিশেষ অবজারভেশন রিপোর্ট হয়তো ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে চেয়ারপার্সনের কাছে।

এ পরিস্থিতি নিয়ে আরো কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ‘খালেদা জিয়াকে খোলা চিঠি’ শিরোনামে দৈনিক মানবজমিনে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি প্রফেসর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর একটি লেখায় আমার অনেক কথাই চলে এসেছে। বিশেষ করে, বিএনপির কাউন্সিল থেকে গণমানুষের প্রতি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার এবং নতুন কমিটির আনুপাতিক হারের বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর খোলা চিঠির প্রতি আমার সহমত রইল।

তিন.
প্রিয় পাঠক, আমার লেখার মূল বিষয় হলো বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ। এককথায়, বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। এর মূল ভিত্তি হলো ১৯৭৭ সালের ২২ মে জিয়াউর রহমান ঘোষিত উন্নয়ন ও উৎপাদনের ১৯ দফা। অবাক করার বিষয় হলো, এই ১৯ দফা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও ভালভাবে জানেন না। অনুসরন করা তো দূরে থাক, সাধারণ কর্মীদের কাছেও ১৯ দফা নিয়ে আগ্রহ নেই। দলীয়ভাবে ১৯ দফায় আগ্রহ সৃষ্টির কোনো উদ্যোগও নেই। বরং ১৯ দফা ‘সেকালীয়’ বলে বিএনপির কিছু কর্মী-সমর্থক মন্তব্য করছেন।

প্রায় ৪০ বছর আগে প্রণীত হলেও এই ১৯ দফার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তবে যুগোপযোগী সংযোজন তো অবশ্যই আসতে হবে। পাঠকদের জন্য ১৯ দফার সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা হলো।
১. সর্বোতভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
২. শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি অর্থাৎ সর্ব শক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্মক বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় বিচারের সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলিত করা।
৩. সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।
৪. প্রশাসনের সর্বস্তরে উন্নয়ন কার্যক্রমে এবং আইন শৃংখলা রক্ষার ব্যাপারে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৫. সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।
৬. দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।
৭. দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সকলের জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৮. কোন নাগরিক যেন গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করা।
৯. দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।
১০. সকল দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা।
১১. সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুবক সমাজকে সুসংহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।
১২. দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দান।
১৩. শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়ন সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
১৪. সরকারী চাকরিজীবীদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তি উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা।
১৫. জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।
১৬. সকল বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বিশেষ জোরদার করা।
১৭. প্রশাসন এবং উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা।
১৮. দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়নীতি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।
১৯. ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা।

প্রিয় পাঠক, এই ১৯ দফাই হলো বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তি। এছাড়া বিএনপির ঘোষণাপত্র। এই দুইটি যোগ করলেই বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের মৌলিক পরিচয় আপনি পাবেন।


ঘোষণপত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও রক্ষার বিষয়ে বলা হয়েছে - স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অতন্ত্র প্রহরী হচ্ছে: এক. মৌলিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত ও সংহত ইস্পাত-কঠিন গণঐক্য,


দুই. জনগণভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি এবং ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত  প্রয়াসের ফলে লব্ধ জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি।


প্রশ্ন আসতে পারে, এই কথাগুলো কেন বলছি। বলছি এজন্য যে, গত ক’বছর ধরে বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের বর্ণনায় বলার চেষ্টা হচ্ছে, বিএনপি বামের ডানে, ডানের বামে। অর্থাৎ মধ্যপন্থী।

রূপকার্থে এটি সঠিক। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির আদর্শ সুনির্দিষ্ট। ১৯ দফাই বিএনপির আদর্শের ভিত্তি। আর ঘোষণাপত্র হলো দলটির মূলনীতি।

বিএনপির লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণ; যেখানে সকল গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণের মানুষের পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। কোথাও অতীতমুখিতার স্থান নেই। কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যত গঠনের জন্য অতীতকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।


আমি স্পষ্ট করতে চাই, বিএনপি অতীতমুখি দল নয়। বিএনপি ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা ধর্মীয় দল নয়। বিএনপি বাংলাদেশের গণমানুষের দল। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল মানুষের দল এটি। আর এজন্যই বিএনপির ওপর নির্ভর করার সুযোগ আছে সব মানুষের। তবে দুঃখের বিষয় হলো- বিএনপিতে বাম ও ডানের লোকরা এসে দলটির মূল আদর্শের চর্চা বন্ধ করে দিয়েছে।

বামরা বামে ও ডানরা ডানে টানছে দলটিকে। যে কারণে মূল আদর্শ ও নীতি ভুলে যাচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। যারা বিএনপি দিয়েই রাজনীতি শুরু করেছেন, তারা একই প্রতিযোগিতায় গা ভাসিয়ে আছেন। নীতিনির্ধারকরাও মৌলিক আদর্শের চর্চায় কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। বরং চাটুকার বাম-ডানের ঘোরে আটকে গেছেন তারা।

ষষ্ঠ কাউন্সিলে বিএনপি নিজের আদের্শ শাণিত হোক, এই প্রত্যাশা রাখি। মূলনীতিতে আরো সংযোজন আনার উদ্যোগ নেয়াও এখন সময়ের দাবি। এই কাউন্সিলে বিএনপি ও অঙ্গদলের পৃথক শ্লোগান নির্ধারণে মনে হচ্ছে- দলের অভ্যন্তরে কিছুটা গতি আছে। চাইলে অনেক কিছু করা সম্ভব। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে শ্লোগান ছিল, ‘ ‘নানান মানুষ নানান পথ, দেশ বাঁচাতে ঐক্যমত’। এই শ্লোগানের ধারায় বিএনপি ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এবারের মূল শ্লোগান ‘দুর্নীতি দুঃসময় হবেই শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ’। ‘থামাও ষড়যন্ত্র, ফেরাও গণতন্ত্র’ শ্লোগানটিরও মিনিং ভাল।

১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জন্য আলাদা শ্লোগানও অর্থবহ। যুবদল- ‘তারুণ্যে যারা অকুতোভয়, তারাই আনবে সূর্যোদয়’, কৃষক দল- ‘ফলাবো ফসল গড়বো দেশ, গণতন্ত্রে বাংলাদেশ’, মুক্তিযোদ্ধা দল- ‘মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র, মুক্ত করো গণতন্ত্র’, শ্রমিকদল- ‘শ্রম দিয়ে শিল্প গড়বো, দেশের আঁধার ঘুচিয়ে দেব’, মহিলা দল- ‘চেতনায় নারী, বিপ্লবে নারী, গণতন্ত্র ফেরাতে আমরাই পারি’, ছাত্রদল- ‘বাঁচতে চাই পড়তে চাই, দুর্নীতি মুক্ত দেশ চাই’, স্বেচ্ছাসেবক দল- ‘আলোর দিন দূরে নয়, করতে হবে আঁধার জয়’, জাসাস- ‘গাইবো মোরা গণতন্ত্রের গান, দুঃশাসনের হবেই অবসান’, তাঁতিদল- ‘শক্ত হতে বাঁধো তাঁত, কাটাতে হবে আঁধার রাত’, মৎস্যজীবী দল- ‘জালের টানে ঘুচবে আঁধার, বাংলাদেশ সবার’ এবং ওলামা দল- ‘জিয়ার আদর্শে দেশ গড়বো, ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখবো’।

ষষ্ঠ কাউন্সিল উপলক্ষে যারা এসব ক্রিয়াটিভ কাজে জড়িত আছেন, তাদের প্রতি সম্মান রইল। পঞ্চম কাউন্সিলে সরাসরি কন্ট্রিবিউটের সুযোগ হয়েছিল আমার। এবার খুবই সামান্য চেষ্টা করেছি। যাইহোক, কাউন্সিল যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা না হয়। এটা যেন হয় একটি নতুন কমিটমেন্ট। কাউন্সিল শেষে উল্লেখিত শ্লোগানের মর্মার্থ বিএনপি এবং স্বস্ব অঙ্গদলের নেতাকর্মীরা ধারণ করতে সমর্থ হোক, এই কামনা রইল। বিএনপির পুনঃনির্বাচিত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং মহাসচিব সহ যারা মনোনীত হবেন, সবাইকে অগ্রীম অভিনন্দন রইল।

রক্তস্নাত বাংলাদেশে নিত্য গুম-খুনের শঙ্কার মধ্যে যারা গণতন্ত্র ফেরাতে লড়ছেন, তাদের প্রতি অগ্রীম কৃতজ্ঞতা। ফিরে আসুক গণতন্ত্র। বর্তমান বিএনপির নেতাকর্মীরা ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ধারণ করতে সক্ষম হোক, এই প্রত্যাশায় আল্লাহ হাফেজ।

লেখক: এম মাহাবুবুর রহমান, যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত সাংবাদিক ও গবেষক।