আরব বসন্তের উত্থানে তিউনিশিয়া, লিবিয়া, মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যেন রীতিমতো লংকাকাণ্ড ঘটে গেল। নড়ে উঠেছে সৌদি রাজতন্ত্রের ভীতও। এর শেষ কোথায় তা নিয়ে গবেষণারও যেন শেষ নেই। চলছে চুরচেরা বিশ্লেষণ। সম্প্রতি তেহরান টাইমসে সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্য-প্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ক গবেষক ড. মাহমুদ মনসিপৌরের একটি মন্তব্য ছাপা হয়েছে। টাইম নিউজ বিডি ডটকমের পাঠকদের জন্য গবেষণাধর্মী ওই প্রবন্ধটির সরল অনুবাদ তুলে ধরা হলো। অনুবাদটি করেছেন আমাদের কুটনৈতিক প্রতিবেদক [b]মো: কামরুজ্জামান বাবলু:[/b]  
সৌদি আরবে ক্ষমতা দখলে নতুন লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালকের পদ থেকে যুবরাজ বন্দর বিন সুলতানকে অপসারণের ঘটনায় এ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যুবরাজ বন্দর সিরিয়ায় আসাদ সরকারের উৎখাতে ইসলামের নতুন সৈনিক হিসেবে ইতোমধ্যেই পরিচিতি লাভ করেন।
সৌদি আরবে পালাবদলের এ লড়াই অব্যাহত রয়েছে, কারণ দেশটিতে বৃহত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। অথচ ২০১১ সালে মধ্য প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় আরব বসন্তের যে ঢেউ উঠেছিল তার চোটই এখনো সামলে উঠতে পারছেন না সৌদি আরবের কর্তাব্যক্তিরা।
নতুন ঘটনা পরম্পরায় প্রমানিত হয়েছে যে কথিত সন্ত্রাসী ও জিহাদকারীদের সমর্থনকারী যুবরাজ বন্দরের যুগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। যদিও এসব জিহাদকারীদের অনেকের সঙ্গে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে সক্রিয় আল-কায়দার সাথেও সম্পৃক্ততা রয়েছে। সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের মূল হোতা ও অর্থের প্রধান যোগানদাতা যুবরাজ বন্দর ওয়াশিংটন এবং রিয়াদ উভয়েরই সমর্থন হারিয়েছেন। বিশেষত সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সিরিয়া সংকটের ফলে ধ্বংসযজ্ঞের যে সূত্রপাত হয়েছে তা মারাত্মকভাবে ক্ষমতার মসনদে থাকা সৌদি রাজ পরিবারের জন্য ক্ষতিকর বলেই বিবেচিত হয়েছে।  
নেতৃত্বের এই পরিবর্তনের কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? তবে, অন্ততপক্ষে এতটুকু বলা যায় যে সৌদি বিদেশ নীতি নির্ধারণে যুবরাজ বন্দরের প্রভাব অকার্যকর বলেই প্রমানিত হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বন্দর এতদঞ্চলে পারমানবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে ইরানের বিপরীতে ভারসাম্য আনতে পারমানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন পাকিস্তানের সাথে একটি জোট গঠণের কথা বলেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বন্দরই সিরিয়া ইসলামিক কোয়ালিশন ফ্রন্টের মূল চালিকা শক্তিতে পরিনত হয়েছিলেন। কিন্তু কোয়ালিশন ফ্রন্টের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কোন কাজে আসেনি। এটা শুধুমাত্র আসাদের (সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ) শাসনকে হীন জ্ঞান করতে সক্ষম হয়েছিল যার পরিণতিতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়, আহত হয় এবং স্থানান্তর ও উদ্ধাস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন।
২০১৩ সালের ৩ জুলাই সামরিক ক্যুর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে মিশরের রাজনৈতিক ময়দান থেকে সরিয়ে দেয়ার পটভূমিতে আঞ্চলিক পর্যায়ে তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের যে টানাপোড়েন দেখা দেয় তা দ্রুত ক্রমাবনতির দিকে অগ্রসর হয়। একদিকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুরসি প্রশাসনকে সমর্থন করে তুরস্ক, অন্যদিকে মুরসির বিরুদ্ধে সামরিক ক্যুর পক্ষে অবস্থান নেয় সৌদি আরব।
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সম্পর্কের নতুন মাত্রা, যাকে রিয়াদ-ওয়াশিংটনের মধ্যকার গতানুগতিক স্থিতিশীল সম্পর্কের অবনতির ফল হিসেবেই দেখা হয়। এই অঞ্চলে ইরান কী ভূমিকা পালন করে সে ব্যাপারে সৌদি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে যারা উদ্বিগ্ন তারা কড়া নজরদারি রেখেছেন। অধিকাংশ সৌদি নেতারাই মনে করেন, তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের স্বাভাবিক সম্পর্ক মানেই ওয়াশিংটন রিয়াদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।  
বন্দরের স্থলাভিষিক্ত হওয়া যুবরাজ ও একইসঙ্গে সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন নায়েফ দেশটির বিদেশ নীতিতে নতুন নীতিমালা নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে একটি হলো সৌদি সেনাবাহিনী গঠন। সিরিয়া ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক এবং এই অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ও তার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন যুবরাজ সৌদি সেনাবাহিনী গঠন করতে চান।
খুব সম্ভবত, যুবরাজ নায়েফ সিরিয়া সংঘাতের মধ্যদিয়ে এতদঞ্চলে বিস্তারলাভকারী সাম্প্রদায়িকতার মোকাবেলা নিয়ে উদ্বিগ্ন যা এই অঞ্চলকে ক্রমেই অশান্ত ও অস্থিতিশীল করে তুলছে। বৃহত পরিসরে চিন্তা করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন সামরিক পথে সমাধান না করে এমন একটি কুটনৈতিক সমাধানে পৌছতে চায় যা হবে সিরিয়া ও সৌদি নেতাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও অধিকতর শান্তিপূর্ণ। মার্চের শেষ নাগাদ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার রিয়াদ (সৌদি আরবের রাজধানী) সফরের আগেই হয়তো বিষয়টি আরও খোলাসা হবে।
সৌদি আরবের প্রধান মাথা ব্যথা এই যে ইরানের সঙ্গে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধের সমাধান অবশ্যই এই অঞ্চলে সৌদি আরবের নীতিমালাকে দুর্বল করে দেবে। এর ফলে সৌদি ইরান বৈরিতা আরও বাড়বে এবং ইরান-তুর্কি সম্পর্ক জোরদার হবে।
যখন সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে মূল বিবেচ্য ধরে এগিয়ে যাবার উদ্যোগ নেয়া হবে, তখনই সৌদি আরবকে তার আঞ্চলিক নীতিমালায় সামাঞ্জস্য আনতে হবে। কারণ আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বৃটেন, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পারমানবিক ইস্যুতে একটি সমঝোতা হবে যা এ অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে।
মনে রাখতে হবে ইতিপূর্বে কখনই এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এতদ্রুত এ ধরনের স্থিতিশীলতার দিকে এগোয়নি এবং এই নতুন বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়ানোর তাগিদ এত ব্যাপক পরিসরে অনুভূতও হয়নি। যে প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিবে তা হলো: “সৌদি বিদেশ নীতি কী নতুন পথে হাটবে এবং এর গন্তব্যই বা কোথায়?”
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক