চলতি বছরের ৬ মার্চ ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে কুটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন (ডিপ্লমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ-ডিক্যাব) আয়োজিত মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুন বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুন করার জন্য চীন তিন স্তরের রিফর্ম (পুনর্গঠন) কর্মসূচি গ্রহন করেছে। এই রিফর্ম কর্মসূচি কিভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে সেটাই এই মুহুর্তে চীন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কোন দেশের পক্ষেই একা উন্নতি করা সম্ভব নয় এমন যুক্তি তুলে ধরে জুন আরও বলেন, বাংলাদেশসহ সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক রেখেই এগিয়ে যেতে চায় চীন।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে এবং বহির্বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক রেখে আগামী দিনগুলোতে দেশটি কীভাবে এগিয়ে যেতে চায় সে প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুন বলেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে চীনের আমদানি ১০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌছাবে এবং বিনিয়োগের পরিমান গিয়ে দাঁড়াবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারে। একই সাথে দেশটিতে পর্যটকের সংখ্যা ৪০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত। চীনের এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের সাথে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে বলেও বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত লি জুন তার তিন পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যে বলেন, চীন বর্তমানে তার অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে কাজ করছে এবং এ লক্ষ্যে শ্রমিকনির্ভর শিল্প কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ হতে পারে চীনের জন্য একটি আদর্শ স্থান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা গ্রহন করা হলে আর কোন পিছুটান থাকবে না। কারণ দেশটিতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক দক্ষ ও কর্মঠ শ্রমিক। বর্তমান বিশ্বে এত বেশি সংখ্যক দক্ষ ও কর্মঠ কিন্তু সস্তা শ্রমিক আর কোন দেশে যে পাওয়া যাবে না চীন এ বিষয়টি বেশ ভালো করেই জানে।
এ কথা নির্ধিদ্বায় তাই বলা যায়, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত ধাবমান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি চীন নিজের স্বার্থেই বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে, ভারত ও মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়া ও পৃথিবীর নানা প্রান্তের অনেক দেশই  চীনের বিনিয়োগ নিজেদের দিকে টানতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো  সস্তা শ্রমিক পাওয়া ওইসব দেশের পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের থেকে একধাপ এগিয়ে আছে।
তবে, বাংলাদেশ একদিক থেকে অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছ। আর তা হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই অস্থিরতা ও অরাজকতার কারণে অনেকেই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিনিয়োগকে অনিরাপদ ভেবে শেষ পর্যন্ত আবার পিছিয়ে যান।
চীন সরকারও বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে। মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে সে কথাও ফুটে উঠেছে। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপের ওপর জোর দিলেন। বেশ জোরের সাথেই তিনি বললেন, বিদ্যমান সংকট মোকাবেলা কোন কঠিন কাজ নয়। দুই প্রধান রাজনৈতিক দল একটু আন্তরিকভাবে সংলাপে বসলেই সংকট সমাধান হবে।
এমনকী  যেভাবে বাংলাদেশে বিগত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে এবং তাতে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক জোট অংশ নেয়নি সেটা দু:খজনক হলেও বাংলাদেশের মানুষ চাইলে খুব শিগগিরই আরেকটি নির্বাচন হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত।
রাষ্ট্রদূতের এসব বক্তব্য এটাই প্রমান করে যে বাংলাদেশে যেকোন মূল্যে স্থিতিশীলতা আসুক, বন্ধ হোক রাজনৈতিক হানাহানি, ফিরে আসুক বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ, চীন সরকারের আন্তরিক কামনা তাই। কারণ এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের ওপরই নির্ভর করছে চীন বাংলাদেশে শ্রম নির্ভর শিল্প স্থানান্তরসহ বিনিয়োগ কতটা করতে পারবে সে বিষয়টি। অর্থাৎ নিজের স্বার্থেই চীন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী। একইভাবে, বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী সব দেশই নিজেদের স্বার্থেই চায় বাংলাদেশে যেন রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর হয়, বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসে।
অপরদিকে, চীনসহ অন্যান্য উন্নত দেশের বিনিয়োগ নিজ দেশে টানতে যারা আগ্রহী তারাই কেবল কামনা করতে পারে যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসুক। যাতে করে সস্তা শ্রম সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ওইসব দেশের চেয়ে বেশি মাত্রায় বিদেশী বিনিয়োগ হাতিয়ে নিতে না পারে। আর এজন্য নানা উপায়ে এসব দেশ চাইবে যেন বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসে।
কু্টনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই নীতি কোন দেশের জন্যই খুব দোষের নয় বলেই বিবেচিত হবে। কারণ বিশ্বায়নের এই যুগে সবাইকে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয় এবং উন্নতির চাকাকে সচল রাখতে হয়। তাই  প্রত্যেকেই নিজ স্বার্থ আগে দেখবে এটাই বাস্তবতা এবং প্রতিযোগিতপূর্ণ বিশ্বায়নের দাবি।
এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ সরকার এই বাস্তবতা কতটা উপলব্ধি করছে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোই বা দেশের স্বার্থে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত? দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে অভ্যন্তরীন সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বর্হিবিশ্ব থেকে কী কী সুবিধা গ্রহণের সুযোগ বাংলাদেশের হাতে রয়েছে, তা নিয়ে সরকার  ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে সংলাপ অনুষ্ঠানের দৃশ্য কী কোন দিন এই দেশে দেখা যাবে? দেশের রাজনীতিতে ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে এমন বাস্তবভিত্তিক দেশপ্রেমের চেতনার বিকাশ ঘটুক সে প্রত্যাশাই সবার।
লেখক: সাংবাদিক
ই-মেইল: [email protected]