রাজনীতির মত দেশের অর্থনীতি আজ বড়ই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অত্যন্ত লাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে।

দেশের মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত চেষ্টায় আজ আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি টিকিয়ে  রেখেছে। দেশে  বিনিয়োগ নাই। কর্মসংস্থান খুবই কম। শুধু বিদেশি ভাইদের রেমিটেন্স আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে নিকট ভবিষ্যতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চারটি বড় ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে এ দাতা সংস্থাটি।

প্রথমত, যদি আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি মন্থর হবে। এটি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে এবং রিজার্ভকে চাপে ফেলবে।

দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাক খাতের কর্মপরিবেশের ঘাটতি থাকলে ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারানোর শঙ্কা রয়েছে।

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার পুনঃউম্মোচন না হওয়া এবং চতুর্থত, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সক্ষমতার ঘাটতি আর্থিক খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট ২০১৪’ প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

এ উপলক্ষে ঢাকার বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয। সেখানে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ও গবেষক নাদিম রিজওয়ান।

প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জণ করতে জিডিপির ৩৪-৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে।

বর্তমানে জিডিপির ২৮ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে। এক বছরের মধ্যে তা ৩৪ শতাংশে উন্নীত করা বা ৫-৬ শতাংশ বিনিয়োগ বাড়ানোর নজির কোনো দেশের নেই।

এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তৈরি পোশাক খাতের চলমান সংস্কারের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা- ময়মনসিংহ মহাসড়কে চার লেন প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্বৈত রেলপথ, পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হযয়েছে, বিনিয়োগের জন্য পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় হার এখন জিডিপির ৩০ শতাংশ, যা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ হারের চেয়ে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। এর ব্যাখ্যা করে জাহিদ হোসেন বলেন, বিনিয়োগ করার মতো অর্থ রয়েছে। পরিবেশ তৈরি হলে বিনিয়োগ হবে।রাস্তা-ঘাট, গ্যাস-বিদ্যুৎ, বন্দর সুবিধাসহ অবকাঠামো তৈরি করা হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে।

চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে এ পূর্বাভাসের কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক বলছে, সরকারি বিনিয়োগের ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে। স্থিতিশীল পরিবেশের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আগের চেয়ে কিছুটা চাঙা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে ভোক্তা চাহিদা বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে সেবা ও শিল্প খাতে আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। শিল্প খাতে সাড়ে ৯ শতাংশ ও সেবাখাতে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। তবে কৃষি খাতে আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২ শতাংশ হতে পারে। ব্যয় খাত বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোক্তা ব্যয়, বিনিয়োগ, আমদানি ব্যয় এ তিনটি খাতে গত অর্থবছরের  চেয়ে চলতি বছরে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে। তবে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি কমবে। গত অর্থবছরে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে ৬ শতাংশ হতে পারে। তৈরি পোশাক খাতের সুসংহত অবস্থান চলতি অর্থবছরেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, তুলনামূলকভাবে কম মজুরির কারণেই তৈরি পোশাক খাতটি সুসংহত অবস্থান ধরে রাখবে। 

বিশ্বব্যাংক বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ হতে পারে। এ বছর গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক পথেই রয়েছে। তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী ইবোলা ভাইরাস প্রতিরোধে ৪০ কোটি ডলার সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। তবে বাংলাদেশের এ মুহূর্তে এ সহায়তা দরকার নেই।

আর্থিক খাত: বাংলাদেশের ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সন্তোষজনক নয় বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের মতে, ব্যাংক খাতে এক-চতুর্থাংশ সম্পদের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর দুর্বল মূলধন ভিত্তির কারণে এ খাতটি ঝুঁকিতে পড়েছে।

তিনটি কারণে ব্যাংক খাতের অবনতি হয়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এগুলো হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঋণ প্রদানে দুর্বল সিদ্ধান্তের প্রতিফলন এবং খেলাপি ঋণের মানদণ্ড পরিবর্তন। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৪ সালে শেয়ারবাজার কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

 দারিদ্র্য: বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে এসে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। এটি বিশ্বব্যাংকের অনুমান। তবে এই অনুমান তথ্যভিত্তিক বলে দাবি করছে বিশ্বব্যাংক।দারিদ্র্য কমার কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশের বেশি অর্জিত হয়েছে। কৃষি খাতে গড়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে।

এ ছাড়া প্রবাসী আয়েরও গড়  প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ  হয়েছে। এসব কারণে গত দশকে (২০০০-২০১০) বার্ষিক ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ পয়েন্টে যে দারিদ্র্য কমেছে, তা এ দশকেও অব্যাহত রয়েছে।বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরের মধ্যে দেশে ৪৬ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের ঘাটতি পূরণ করেছে প্রবাসে জনশক্তি রপ্তানি করে।

 উত্তোরণের উপায়: ঝুঁকি মোকাবেলা করতে  হবে সরকারকে। দ্রুত সকল পদক্ষেপ এই সকল  সমস্যা থেকে দেশের অর্থনীতি রক্ষা  পেতে পারে।

এক: দেশে আইনের শাসন, সু শাসন, জনগণের সত্যেকার শাসন কায়েম করতে হবে। ব্যক্তি, দলকে রক্ষা করার জন্য  পরিচালিত সকল  কর্মকান্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অর্থর্নীতির ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতি সুশাসনের মাধ্যমে  কমিয়ে আনতে হবে।

দুই:  অবিলম্বে সত্যেকার জনপ্রতিনিধিদের নিকট  দেশ পরিচালনার স্বার্থে  সকল দলের অংশ গ্রহণ মূলক  জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা  গ্রহণ করতে হবে। তবেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা , অনিশ্চয়তা দূর করা যাবে। তা হলে অর্থনীতি বড় ঝুঁকি  থেকে আমরা বাঁচতে পারবো।  দেশ বাঁচবে, দেশের অর্থনীতি বাঁচবে।

তিন: ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন কায়েম করতে হবে। অর্থ লোপাট  বন্ধ করতে হবে।  সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক সমূহ থেকে  অনৈতিক, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আতœসাধের সকল দরজা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।  রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়া ও নেয়া বন্ধ করতে হবে।  রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক সমূহে পরিচালক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে।

চার: গ্যাস, বিদ্যুৎ  এর উৎপাদন , সরবরাহ, চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করতে না পারলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আরও  হ্রাস পাবে।  গ্যাসের  সরবরাহ ও উৎপাদন সম্পর্কে বিনিয়োগকারীগণকে সঠিক তথ্য প্রদান করতে হবে। র্দীঘ মেয়াদি গ্যাস শিল্পখাতে সরবরাহ করার  নীতি নিয়ম অবিলম্বে ঘোষণা করতে হবে। বিনিয়োগকারীগণ দেশে  একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।  দেশে আদৌ ভবিষ্যৎতে শিল্পখাতে গ্যাস পাবে কিনা তার কোন আলো কেউ দেখতে পাচ্ছে  না।

পাঁচ:  বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ, উৎসাহিত করার জন্য দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা  সরকারকে দিতে হবে। বিনিয়োগকৃত মূলধনের  নিরাপত্তার নিশ্চয়তা  না দিলে চার ঝঁকি থেকে  আমরা রেহাই পাবো না। এই জন্য প্রয়োজন বিরোধী রাজনৈতিক দল সমূহের সঙ্গে সরকারের একটা সম্মান জনক সম্পর্ক গড়ে তোলতে হবে।  শুধু হামলা.মামলা বা পুলিশি শাসন দিয়ে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না।

 রাজনৈতিক আলাপ আলোচনায় সকল সমস্যার সমাধান বের হয়ে আসে। দমন নীতি চালিয়ে দেশ শাসন  করা যায়, কিন্তু দীর্ঘ দিন টিকে থাকা যায় না। সহমর্মিতা, , ভালবাসা, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ  রাজনীতিকে  মধুময় করে। অন্যের  সমালোচনাকে নিজের সংগঠনের পথ বলে মনে করার মধ্যে রাজনীতি। সকল  সমালোচনা সমালোচনা নয়।  সংশোধন হয়ে আপন মর্যদার সঙ্গে  অন্যের সমালোচনা গ্রহনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় রাজনীতির বড় শিক্ষা।

অর্থনীতির  যে সকল ঝুঁকির কথা বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তা আমাদের সকলের জন্য বর্তমান সময়ের দাবী। আমরা শিক্ষা নিয়ে , সকলকে সাথে নিয়ে, প্রকৃত দেশ প্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে জোড় কদমে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।

লেখক: সাবেক সহসভাপতি এফবিসিসিআই,  বিজিএমইএ, বিটিএমইএ তাং-০২.১২.২০১৪,

E- Mail: [email protected]

এসএইচ