বেশ কয়েক দিন ওরা রাত হলে বাড়িতে ঘুমায় না। কেউ নানির বাড়ি, কেউ শশুর বাড়ি। তবে হাসু আর পেনু বাড়িতেই ঘুমায়।

দিন ভর পিয়াজ লাগায়। সপ্তাহ শেষে হাটের দিন টাকা পায়, সেদিন সকাল সকাল বাড়ি ফিরে হাট করে ।

মাগরিব হওয়ার আগেই এক মুট পেটে দিয়ে গ্রাম ত্যাগ করে বাবুরা। মাঠ ভরে পিয়াজের চাষ হচ্ছে। তাই প্রতিদিনিই কাজ থাকায় পেটে এক মুঠ ভাল-মন্দ যাচেছ।

গতকাল বাবু, লুকাই, আর সাদিক আপেলদের কাজ করেছে। আগামীকাল আলাই প্রামাণিকের ৫ বিঘার দাগ লাগাতে হবে। গ্রামের প্রায় সব কামলা কাল প্রামাণিক বাড়ি কাজ করবে। সন্ধ্যার আগদিয়ে সবাই প্রামাণিক বাড়ির বাহির উঠানে হাজির। সবাই সবার কাজ বুঝে নিচ্ছে; কে চারা তুলবে আর কে না নিবে।

কথা শেষে বাবু আর লুকাই বাড়ির দিকে হাটছে। শোন বাবু আইজ আর কোথাও জামুনা, এতো শিতে পুলিশ আইবে না মনে হয়। বাড়িতেই শান্তি করে ঘুমামু। তাহলে আমিও বাড়িতেই থাকমু, কত দিন আর দেশে দেশ দৌরামু।

কবে যে দেশটা আল্লায় শান্ত করব কে জানে। হ..... নিজেরা নিজেরা ভাল হয়ে গেলেই ত শান্তি, আল্লায় কি ফেরেশতা পাঠায়ে দেশ শান্ত করব, বলতে বলতে লুকই বাড়িতে ডুকেগেল।

রাণির মাও এইদিক আসো। আজ আর কোথাও জামুনা বাড়িতেই রাইতটা পার করি, কাল প্রামাণিক বাড়ির কাম। একি কচ্ছ তুমি যদি....। আরে না উপর ওয়ালা আছেনা।

সকালে উঠে সবাই সবার কাজে মনযোগ। সকালের নাস্তা খাবার সময় হয়ে এলো। ভাত এখনো আসেনি। হঠাৎ একটা বৃষ্টির ফোটা বাবুর হাতে এসে পড়ল। এ্য একি, মেঘ নাই বৃষ্টি এলো কোথাথেকে।

উপর দিকে তাকিয়ে দেখে একটা পাখি উড়ে যাচ্ছে। যা গরিব হয়েছি তাই বেচে গেলি। না হলে বন্দুক দিয়ে একেবারে......হু... ।

নাস্তা আসতে আসতে এক ঝলোক গল্প হয়ে গেল। নিজাম শুরু করলো; কোন জমানায় এসে পরলাম, জিবনে মামলা মোকদ্দামা দেহিনাই। বাপে ঐ পারার  লইমদদির বাপের কাছথেকে সেই কালে এক বিঘা জমি কিনছিল। এত দিন কোন কথা বার্তা নাই, এহন কয়, জমি নাকি বেচেনাই ।

শুনলাম কোটে মামলাও নাকি করছে। এদিক থেকে সাদিক , করব না তো কি ? ছেলে-পুলে সবগুলান নেতা। তাছাড়া ওগো সরকার ÿমতায়, মনে এহন যা চায় তাই করে। আমাগ পাড়ার আকত আলির মাইয়া নিয়া কি কাহিনি ডাই করল।

শুনছিলাম ধর্ষণের কেচ করছে। আর কেচ করে কি করবে, বাবা চেয়ারমেন আর নিজে উপজেলা চেয়ারমেনের ভাগ্নে। কি আর কইব ÿমতাটাই মানুষ কে নষ্ট করে।

লুকাই শুরু করল, রাস্তায় কে বা কারা চিল্লাপাল্লা করে আর আমরা রাইতে বাড়িতে মাথা দিতে পারিনা। যাক সে কথা, কাল গিছেলাম ছোট পোলার  ফাইনাল পরীÿার ফরোম ফিলাপ করতে। শুনলাম প্রথমে ২০০০ টাকার কথা কইছিল পরে কমিটি আলোচনা করে ২৫০০ কইরা দিছে। গপনে শুইনলাম কমিটি নাকি কিছু খাইবে। বাবু, নাহ....! এ কোন জগতে আসলাম। আমরা সাড়াদিন মাটিতে পাছা ঘোষ পারাইয়ে কয়েকটা টাহা কামাই। সে টাহাও ওরা কায়দা কৌশলে মাইরা নেয়। বাইচা থাকনের ইচ্ছা আর করেনা। আচ্ছা, ক দেহি, মানুষের টাহা মাইরে খাইয়া ওগো কি শান্তি ওইব ?

সাদিক,আবার শুনতাছি কাল জুমার নামাজেরপর সারা দেশে মসজিদ থেকে নবীর অবমাননার পতিবাদে মিছিল ওইব, যাবিরে লুকাই ?  যাবনা মানে আমি যদি মুসলমান হয়ে থাহি তবে যাবই, কি কইস বাবু? ঠিক কইছস তুই। এই বার সবাই এক সাথে; যার মধ্যে এত টুক ধর্মের টান আছে সে কাল ঘরে বসে থাকতে পাইরব না।

এদিকে খাবার এসে গেছে। সবাই হাত ধুয়ে খাবার নিয়ে খাওয়া শুরু করল। সরাদিন গল্প গুজব করে দিনটা ভালই কাটল। সন্ধায় টাকা নিয়ে লুকাই বাড়ির দিকে হাটছে। হঠাৎ পুলেশের গাড়ির আওয়াজ। বাড়ির ভিতর না ঢুকে আবার মাঠের দিকে রওনা হল লুকাই। খানিকটা রাত হলে বাড়ির দিকে ফিরে এলো। রাণীর আম্মু দরজা খোল। রাণী ঘুমাই গেছে, তুমি বাড়ি আইছ কেন, পুলিশ আইছিল জান ? জানি, মাঠের মধ্যে বসে ছিলাম। একাই নাকি ? না, গেরামের আরো দুই জন ছিল। ঐ পাড়াথে পাঁচ জনকে ধইরে নেছে। কেডা কেডা জান? আলিমদ্দির দুই লাতিছাওয়াল আরো তিন জন। হায় খোদা জীবনে যারা রাস্তায় দারায়নি তাগরেও রেহাই নাই। দারগায় কি করব সরকারে আদেশ করছে, লোক নাধরলে চাকরি থাইকব না।

শুক্রবার জুমার নামাজ শেষ ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে মিছিল শুরু হল মসজিদের সামনে থেকে। নাচতিকদের আস্থানা,বাংলাদেশে হবেনা। রাসুলের অবমাননা, মানি না মানব না। স্লোগান দিচ্ছিল লুকাই। এতখোনে মিছিল জেল খানা মরে পৌছেছে। লাখ জনতার মিছিলে পুলিশের বাধ। বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে বাবু, আমরা মুসলমান, আমাগেরে ইমানি বল  বাইধে রাখা যাবে না। দ্বীনের নবীর ভালবাসায় আমরা জীবন দেবার পারি। এদিকে কলেজ গেট অঞ্চল  থেকে আরও একটি মিছিল জেল খানা মরের দিকে আসছে। নবীর অবমাননা, মানি না মানব না ।

লুকাই আবারও স্লোগান দিতে শুরু করল। ঠাস ঠাস করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ হলো। স্লোগান দিতে দিতে লুকাই মাটিতে লুটিয়ে পরল। ওর কপাল থেকে রক্ত বের হচ্ছে। মুহুর্তের মাধ্যে রক্তে লাল হয়ে গেল রাজ পথ। বাবু ওর কপালে হাত দিয়ে রাস্তার পাশে নিয়ে আসল।

এতোখনে বাবু কথা বলার শক্তি প্রায় হাড়িয়ে ফেলেছে। লুকাই রক্ত মাখা শরির নিয়ে বাবু বলল, পুলিশের সাথে সাদা পোশাকে করা ? লইমদদির বেটাকেই শুধু চিনলাম। আমাকে ÿমা করে দিস তোরা। আমার মাইয়া টার দিকে তোরা নজর দিস। বাবুর চোখ থেকে পানি পরছিল। আমাকে  একটু পানি দিবি বাবু। বাবু পানি আনতে আনতে লুকাই পারি জমিয়েছে পরপারে। পাশের একটি বাড়ি থেকে বাবু পানি নিয়ে এসে দেখলো লুকাই ইন্তেকাল করেছে।

লুকাই কে বাড়ি নিয়ে আসলে তার অবুঝ মেয়ে রাণী তার বাবাকে জরিয়ে ধরে বলতে শুরু করল, বাবা তুমি গায়ে রক্ত মাখছো কেন, বাবা বেল ডুবেগেল তুমি ঘরে আস। পাশে দারান শত শত মানুষ কার কাছে কোন উত্তর নেই। শুধু চোখের পানি গড়িয়েই খ্যন্ত হচ্ছে সবাই। রাণী তার মাকে জরিয়ে ধরে বলছে, আম্মু , আব্বুর গায়ে রক্ত কেন, আব্বু  আমার কমলা আনবে না।

রাণীর মা যেন শুকন কাট হয়ে গেছে। তার চখে এক ফোটা পানি নেই। তাকে প্রশ্ন করা হলে একটাই উত্তর; আমার স্বামী নবীর রাস্তায় গিয়ে মারা গেছে, আমার কনো আপছোছ নাই। আমার স্বামী জন্নাত যাইব। আমি কাইন্দা কাইটা তার পথ ভিজাইতে চাই না। তোমরা দোয়া কর, আল্লাহ যেন আমার তারে শান্তিতে রাখে। কথা গুলো শেষ করে সে চাখের পানি আটকাতে পারলো না। এই বার তার চোখ থেকে পানি পড়তে লাগলো কিন্তু কোন শব্দ নেই।

তিন দিন পরে শোনা গেল সেদিন মিছিলে যারা মারা গিয়েছে তাদের সবার নামে মাডার কেচের মামলা দিয়েছে।

এসএইচ