আমরা মধ্যযুগকে বর্বরতা ও তমসার যুগ বলতেই পুলকবোধ করি। একটু চিন্তা করলে তা কিছুটা অসার বলেই প্রতীয়মান হয়। বর্তমানে সকল ক্ষেত্রেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে বটে কিন্তু অবক্ষয়টা বোধহয় মোটেই রোধ করা যায়নি। মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তকগণ যেভাবে গণমানুষের কল্যাণের চিন্তা করতেন, তা তো এখনও অনুপস্থিত।

সেন্ট অগাস্টিন ( St. Augustine ) কথা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি একাধারে রাষ্ট্রচিন্তক ও খ্রিষ্টবাদের প্রবক্তা। ল্যাটিন চার্চের শ্রেষ্ট পুরোধা এই খ্যাতিমান বিশ্ব ইতিহাসের এক মহাসংকটময় মহুর্তে জীবনের পথ পরিক্রমা শুরু করলেও তার সফলতাও আকাশচুম্বী।

মূলত সেন্ট অগাস্টিন ছিলেন সেন্ট আরাজের শিষ্য কিন্তু সমকালীন চিন্তাক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা তার মহান গুরুও কল্পনা করতে পারেন নি। সেন্ট পলের পর খ্রিষ্টীয় চার্চের ইতিহাসে এমন প্রতিভাবান আর দেখা যায় না। সেন্ট অগাষ্টিনের লেখায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রচিন্তা, যুক্তিবাদ ও দার্শনিক তত্ত্বের কাঠামোয় মৌলিক খ্রিষ্টধর্ম বিশ্বাসের রূপরেখা অঙ্কিত হয়।

এক যুগ-সন্ধিক্ষণে জীবনের পথ রচনা করে সনাতন গ্রীক ও রোমান সভ্যতা এবং খ্রিষ্টীয় সভ্যতার সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন। গ্রীক দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা ও মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্বের মধ্যে কোন মিলন সূত্র থাকলে তা পাওয়া যাবে তার চিন্তাধারায়।

ফলে তার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মাধ্যমে নাগরিকের জীবনমানের ক্ষেত্রে যেমন ইতিবাচক ধারার সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে খ্রীষ্টবাদেরও সাধিত হয়েছে উৎকর্ষ। এখানেই তার সার্থকতা বলা যায়।

মূলত মধ্যযুগেও ধর্মচিন্তক ও রাষ্ট্রচিন্তকরা মানুষের কল্যাণকামীতার জন্য যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন, তা একবিংশ শতাব্দীতে এসে অনেকটাই অনুপস্থিত। বিশেষ করে আমাদের দেশে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একথাটা খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আমরা একবিংশ শতাব্দীতে মানুষকে স্বপ্ন দেখালেও তা শুধু ফাঁকাবুলি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। স্বপ্নবিলাস বললেও অত্যুক্তি হবার কথা নয়। আমরা ক্রমেই যেন আত্মকেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছি। সভ্যতার অবিস্মরণীয় অবদান হচ্ছে কল্যাণমূখী, গণতান্ত্রিক ও গতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা সে সুবিধাটা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি।

দেশে সুশাসন নিশ্চিতের জন্য সরকার ও সংবিধান থাকলেও আত্মকেন্দ্রীক ও গোষ্ঠীকেন্দ্রীক রাজনীতির কারণে দেশের মানুষ সে সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। ফলে আইন ও সাংবিধানিক শাসন এখন সুদুরপরাহত। যা আমাদের জাতিস্বত্ত্বাকে বিপন্ন করছে। আর আমাদের গন্তব্যটাও বোধহয় অনিশ্চিতই থাকছে।

আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ( The republic shall be a democracy in which fundamental human right and freedom and respect for the dignity and worth of the human person shall be guaranteed, and in which effective participation by the people through their elected representatives in administration at all levels shall be ensured.)

অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।

মূলত আমাদের দেশের গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার ও নাগরিকের স্বাধীনতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। সংবিধানের গণমুখী অনুচ্ছেদগুলো কেতাবেই লিপিবদ্ধ, বাস্তব প্রয়োগ খুবই গৌণ বলেই প্রতীয়মান।

আমাদের দেশে কী সাংবিধানিক শাসন চলছে; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কী উচ্চকিত করা হচ্ছে ? এ প্রশ্ন এখন সর্বত্রই। আর এর জবাবটাও রীতিমত নেতিবাচক বলে মনে করার কারণ রয়েছে। যারা এখন ক্ষমতা চর্চা করছেন তারা তো সবকিছুই রঙ্গীন ফ্রেমে দেখতেই অভ্যস্ত। তারা মনে করছেন দেশে সংবিধান আছে, আছে সাংবিধানিক শাসন। এমনকি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে।

কিন্তু যারা গণতন্ত্র ও জনগণের শাসনে বীতশ্রদ্ধ তারাই গণতান্ত্রিক সরকারকে অগণতান্ত্রিক পন্থায় উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছে। দেশের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে এই হলো শাসকগোষ্ঠীর অবস্থান। দেশ ও জাতির কল্যাণে তাদেরকে এ অবস্থান অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে; যদি তারা গণমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী হন।

সংবিধান অনুয়ারি আমাদের দেশ একটি গণপ্রজাতন্ত্র। সংবিধানে নাগরিকদের জন্য গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চয়তাসহ মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করা হয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্র কী সে দায়িত্ব যথাযথাভাবে পালন করছে ? যারা ক্ষমতার বাইরে রয়েছেন তাদের উত্তর আবারও নেতিবাচকই হওয়ার কথা। আর বাস্তবতাটা হচ্ছে আরও মর্মপীড়াদায়ক। সম্প্রতি তা কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে উঠে এসেছে। যা জাতি হিসাবে বহির্বিশ্বে আমাদেরকে অপমানিত করেছে।

আমাদের দেশে কী ধরনের শাসন চলছে, আর মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বা কতখানি সুরক্ষিত এ বিষয়ে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) পর্যবেক্ষণে বলেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ভিন্নমত প্রকাশের বিষয়টি মারাত্মকভাবে আক্রমণের মুখে পড়েছে।`Bangladesh: Government Shuts Down Critics’’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার বাংলাদেশে বিরোধী মতের লোকজনের কণ্ঠস্বর দমাতে সক্রিয় রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাটি অভিযোগ করছে, আদালত অবমাননার মামলা এবং বিভিন্ন ধরনের অস্পষ্ট মামলা দায়ের করার মাধ্যমে গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের উপর আক্রমণ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ক্রমেই ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে উঠছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মন্তব্য করেছে। সংস্থাটির ভাষায় নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী রাজনীতিবিদদের গ্রেফতার করে বিভিন্ন মামলা দায়ের করছে।

কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ গত বছর কঠিন সময় পার করেছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়।

আরও বলা হয়, ‘সাংবাদিকরা নিজস্ব মতামত প্রকাশ এবং সরকারের নেতিবাচক কর্মকান্ডের সমালোচনা করার কারণে ৪৯ জনকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।’

সংস্থাটি বলছে, সরকারের সমালোচনাকারী গণমাধ্যমগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে নতুবা সাংবাদিক এবং সম্পাদকরা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, মনে হচ্ছে সংসদের বাইরেও শেখ হাসিনার সরকার কোনো বিরোধী কণ্ঠকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিতে চায় না।

জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির অনেক সদস্য গ্রেফতার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের আতংকে রয়েছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক এসব মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ-উৎকন্ঠা খুবই হতাশাব্যাঞ্জক। দেশে যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইন ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে তাহলে তো এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। সরকার তো ভিন্নমতকে বিভিন্ন অপবিশেষণে বিশেষিত করে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক এসব সংস্থার উদ্বেগ-উৎকন্ঠাকে তারা কীভাবে মোকাবেলা করবে, আর শক্ত ভাষায় গালাগাল দিলেই কী এ সমস্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যাবে ? আসলে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তাসহ সকল সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

সে রাষ্ট্রর বিরুদ্ধেই যদি জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ও গণমানুষের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের কল্যাণের ধারণা অপ্রয়োজনীয় ও অসার হয়ে পড়ে।

একথার আরও জোরালো সমর্থন মেলে সিপিডি’র আলোচনা সভার বক্তব্য থেকে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ১৯৭১ সালের সময়কালের চেয়ে অনেক বেশি খারাপ হয়েছে। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যবোধ প্রভৃতি অনেক বেশি দেশপ্রেম ঘেঁষা ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।

মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত ‘স্ট্রাগল ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক ডায়ালগে এমন মূল্যায়ন উঠে আসে আলোচকদের বক্তব্য থেকে। যা শুধু হতাশাব্যঞ্চকই নয় বরং দুঃখজনকও।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)’র চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহানের প্রকাশিত একটি বইয়ের ভিত্তিতে ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদরা।

‘আনট্রাঙ্কুইল রিকালেকশনস, দ্য ইয়ার্স অব ফুলফিলমেন্ট’ শিরোনামের বইয়ে রেহমান সোবহানের শৈশব থেকে শুরু করে পেশাগত জীবন, রাজনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক-অর্থনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজনীতির বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে।এসব বিষয়ের প্রেক্ষিতে বক্তারা, তখনকার প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমান সময়ের তুলনা ও পর্যালোচনা তুলে ধরেন।

স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বক্তারা। এতে আশাবাদের চেয়ে হতাশায় ফুটে উঠেছে বেশী। যা আমাদের জন্য মোটেই সুখকর নয়।

আমাদের দেশের রাজনীতি ক্রমেই যেন অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। ভিন্নমতকে কোন ভাবেই সহ্য করা হচ্ছে না। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে মন্তব্য করায় ২০ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এই মামলার অনুমোদনও রয়েছে। কিন্তু এ মামলায় কীভাবে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান খুঁজে পাওয়া গেল তা মোটেই বোধ গম্য নয়।

দেশের প্রখ্যাত আইনবিদ ও প্রাজ্ঞজনের মতে বেগম জিয়ার বক্তব্যে মধ্যে কোন রাষ্ট্রদ্রোহিতার উপাদান খুঁজে পাচ্ছেন না। এমনকি দন্ডবিধির ১২৪-ক ধারায়ও রাষ্ট্রদ্রোহ সম্পর্কে সুষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কথিত বা লিখিত শব্দাবলী দ্বারা অথবা সংকেতসমূহ দ্বারা বা দৃশ্যমান কল্পমূর্তি দ্বারা অথবা প্রকারান্তরে আইনবলে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞার সৃষ্টি করিয়া বা করিবার উদ্যোগ করিয়া অথবা বিদ্বষ সৃষ্টি করিয়া বা করিবার উদ্যোগ গ্রহণ করে’। মূলত দন্ডবিধিতে এসব অভিপ্রায়কেই রাষ্ট্রদ্রোহ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।

কিন্তু মুক্তি যুদ্ধের শহীদের সংখ্যা বা কোন বিষয়ে সরকারের সাথে দ্বিমত পোষণ রাষ্ট্রদ্রোহীর মধ্যে পড়ে এমনটা বলা হয়নি। দেশের একজন প্রথিতযশা ও প্রবীন আইনবিদ বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাকে ‘ পলিটিক্যান ভিকটিমাইজেন’ বলে উস্মা প্রকাশ করেছেন। যদি তার কথা সঠিক হয় তাহলে তা আমাদের জন্য অবশ্যই দুঃখজনক।

আর এই ধারার প্রায়োগিক দিক নিয়ে উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ‘ এই ধারার অধীন আসামীকে শাস্তি দিতে হইলে প্রমাণ করিতে হইবে যে, আসামী সরকারের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করিয়াছিলেন এবং অনানুগত্যকে উৎসাহ দিয়াছিলেন। ভারতের বিরুদ্ধে ঘৃণার উদগার করিলে এই ধারার অপরাধ হয় না। ( ৩৫ ডিএলআর ৩৫)

‘সরকারের সমালোচনা করা, তাহা সে যতই হিংসার ভাষায় হউক না কেন, কোন অপরাধ নহে। রাজনৈতিক বক্তৃতায় সময় রাজনৈতিক বক্তাবৃন্দ সাধারণ মানুষের দিকে চোখ রাখিয়া বক্তৃতা করেন।

তাহারা মনে করেন যে, তাহারাই একমাত্র জনগণের প্রতিনিধি এবং তাহাদের মাধ্যমেই কেবল জনগণ ভাষা খুঁজিয়া পায়। তাহারা আরও মনে করেন যে, সরকার দুষ্ট প্রকৃতির এবং সেই কারণেই তিরস্কারযোগ্য। এই কারণে বক্তাগণ কঠিন ভাষা ব্যবহার করেন।

এই সমস্ত বক্তৃতা দ্বারা এই ধারায় অপরাধ হয় কিনা তাহা দেখিতে হইলে সমস্ত বক্তৃতাটি মুক্ত মনে পড়িতে হয় এবং যেই পরিস্থিতিতে ও যেই অবস্থায় বক্তৃতা দেয়া হইয়াছিল তাহারও বিবেচনা করিতে হয়।

বর্তমানকালে সরকারের উপর জনকল্যাণমূলক কাজের দায়িত্ব পড়িয়াছে। সরকার সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইলে তাহাদের সেই গালাগাল শুনিতে প্রস্তুত থাকিতে হইবে’। ( ২৬ ডিএলআর ৮৭)

‘ বক্তৃতার বিষয়বস্তু সত্য কিনা তাহা অপ্রাসঙ্গিক, বক্তৃতা শ্রোতাদের মনে সরকারের প্রতি বিদ্রোহভাব সৃষ্টি করিয়াছে কিনা ইহায় বিবেচ্য। সরকারের কঠোর সমালোচনাও আইনে নিষিদ্ধ নহে।

তবে তাহার দ্বারা হিংসাকে জাগ্রত করা উচিত নহে’। ( ১৯ ডিএলআর ১৮৫ এসসি এবং ১৬ ডিএলআর১৪৯ ডব্লিউপি) সূত্র-দন্ডবিধির ভাষ্য-গাজী শামছুর রহমান।

জনমনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, সরকার এখন পুরোপুরি গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সংসদের বাইরের বিরোধী দলের পক্ষে বলা হচ্ছে যে, দেশের বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ এখন আর সরকারের সমর্থক নয়।

তারা এই সরকারের পরিবর্তন চায়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ পথ প্রতিনিয়ত রুদ্ধ করা হচ্ছে। দেশের জনগণ চায় দেশে এমন একটি পরিবেশ সরকার সৃষ্টি করুক যেখানে জনগণ বিনা বাধায় শান্তিপূর্ণভাবে এবং কোনোরূপ সহিংসতা বা জোর জবরদস্তির বাইরে তারা ভোট দিতে পারেন।

এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি নাকি মার্কিন দূতকে বলেছেন, দেশের সিংহভাগ মানুষ বিএনপি তথা বিরোধী দলের সাথে আছে। কিন্তু জনগণ যে তাদের সাথে আছে সেটা প্রকাশ করার মতো রাজনৈতিক পরিবেশ দেশে নাই।

মূলত সরকার সম্পর্কে সংসদের বাইরের রাজনৈতিক দল ও জনমনে যে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে তা অপনোদন করা সরকারেরই দায়িত্ব। যেহেতু দাবি করা হচ্ছে যে, সরকার গণবিচ্ছিন্ন, তাই সরকারের উচিত নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও গণভিত্তি প্রমাণের জন্য একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা।

কারণ, জনমনের বাইরের কোন রাজনৈতিক শক্তির জনগণকে শাসন করার অধিকার স্বীকৃত নয়। আধুনিককালের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ লর্ড ব্রাইসের মতে, ( A government in which the will of the majority of the qualified citizens rules….say, at least three-fourths so that the physical force of the citizens coincides with their voting power.’)

অর্থাৎ যে শাসন প্রথায় জনসমষ্ঠির অন্তত তিন-চতুর্থাংশ নাগরিকের অধিকাংশের মতে শাসনকার্য পরিচালিত হয়. তাই গণতন্ত্র। এ ক্ষেত্রে এও উল্লেখযোগ্য যে, নাগরিকের ভোটের শক্তি যেন তাদের শারিরীক বলের সমান হয়।

দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে সরকার বিরোধী দলের টানাপড়েন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে ঘরে-বাইরে বেশ চাপের মুখেই আছে সরকার। এমনটিই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।

কিন্তু সরকার বোধহয় ক্ষমতাকে নিষ্কন্টক রাখতেই এসব উদ্বেগ-উৎকন্ঠাকে মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। অভিজ্ঞমহলের ধারণা সরকার ক্ষমতাকে অনিরাপদ করে এক পা-ও এগুতো চায় না। মূলত সংকটটা সেখানেই। তবে সম্প্রতি প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে দেশী-বিদেশী বিরূপ সমালোচনার মূখে নাকি সরকার কিছুটা নমনীয়ভাব প্রদর্শন করছেন।

জানা গেছে যে, বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপির ব্যাপারে সরকার নাকি তার চরম হার্ড লাইন আংশিক শিথিল করে দলটিকে কতগুলো শর্তের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ দেবে।

কিন্তু এতেই সংকট সমাধানের আশা করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কারণ, গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড কারো দয়া-দাক্ষিণের বিষয় নয় বরং এটি সকল নাগরিকের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। শৃঙ্খলিত গণতন্ত্র কোন জাতির জন্য কোন ভাবেই কল্যাণকর নয় বরং অবাধ ও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক পরিবেশই বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান।

এমকে