ঢাকা ঘুরে গেলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদাস মোদী। তাঁর এই সফরে আন্দোলিত আমাদের প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশ। রাজনীতি, অর্থনীতি, কুটনীতি সব অঙ্গনকেই ছুয়ে গেছেন তিনি। একটি বৃহৎ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভালোবাসার মোড়কে শতভাগ মোড়লীপনা করে গেলেন। সুন্দর কৌশলী ভাষায় বলে গেলেন, ‘আবারো আসিবো ফিরে এই বাংলায়’। 

একজন সাচ্চা জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে তিনি জওহেরলাল নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধীর যোগ্য উত্তরসুরী। রক্ষণশীল মৌলবাদী দলের নেতা মোদী প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর কুটনীতিকেই প্রাধান্য দিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়ায় সুপ্রতিষ্ঠিত করতেই যেন তিনি ব্যস্ত। কেউ কেউ মনে করেন, মোদী ‘ইউনাইটেড স্টেটস্ অব ইন্ডয়া’র স্বপ্ন দেখেন। ১৯৪৭-এর আগের (ইংরেজ আমল) ভারত বর্ষে ফিরে যাওয়ার অক্লান্ত চেষ্টা আছে তাঁর মাঝে। সেটা সম্ভব না হলেও তিনি শক্তি ও প্রভাব বলয়ের বিবেচনায় সাউথ এশিয়ান ভিলেজকে নিজের মতো করে চালাতে চান।

এই প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রও পাশে আছে ভারতের। এমন অনেক ধারণা এবং বিশ্লেষণ বিশ্বের নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে। সম্প্রতি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কিছু ভারতীয় বন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় এমন তথ্যই পেলাম। এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ক গবেষকদের অন্যতম নজর এখন নরেন্দ্র দামোদাস মোদীর গতিবিধির দিকে


যাইহোক, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদাস মোদীর সফরটি নিয়ে এখন ঢাকার গণমাধ্যম সরগরম। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নানা হিসেব-নিকেশ চলছে। মিডিয়ায় যারা বিচরণ করেন তারা গতানুগতিক ধারায় নিজের মতকে সাধারণের ওপর চাপিয়ে দেন। এক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ক্ষমতাসীনদের আচরণ বলছে, মোদীর সফল সফর তাদের দীর্ঘস্থায়ীত্ব দিয়েছে। তাদের সহযোগী মিডিয়াগুলোর উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঈদের আমেজ বইছে।

ঢাকার একটি জনপ্রিয় দৈনিক তো ‘বিএনপি’ নামক বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি নিয়েই চিন্তায় পড়ে গেছে! ৮ জুন অনলাইনে মোদীর সংবাদের পাশাপাশি গুরুত্ব সহকারে তারা এমন শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটি এবং এর লেখক এতো উদ্বিগ্ন যে, নিবন্ধের শিরোনামেই বলা হয়েছে, “বিএনপির ‘বিলুপ্তি’ (!) ও তার সম্ভাব্য পরিণতি”। তবে বিরোধীরা মোদীর সাক্ষাত প্রাপ্তিকেই বড় অর্জন মনে করছে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, মোদীর ঢাকা সফরে ভারতের জাতীয় প্রাপ্তির হিসেব কষছে তাদের মিডিয়া ও রাজনীতিকরা।

বাংলাদেশকে শর্ত সাপেক্ষে প্রতিশ্রুত ঋণে ভারতের কর্মসংস্থান এবং বানিজ্যের বিষয়টি বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে সেখানকার মিডিয়ায়। আর মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাপ্ত স্বাধীন বাংলার রাজনীতিকরা ভাবছেন, মোদী বাবুর সফর আরো কতদিন কিভাবে ক্ষমতায় থাকার সহায়ক হবে। কিংবা কিভাবে ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব হবে। সুশীল সমাজ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বোদ্ধাগন কিংবা নতুন প্রজন্ম পরিচয়ধারীরাও এমন হিসেব-নিকেশ নিয়েই ব্যস্ত। দেশপ্রেমিক মিডিয়া তো মোদীর পদধূলিতে বাংলার পবিত্রতায় মুগ্ধ!! আমিও মুগ্ধ ভারতের দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনায় স্বাধীন বাংলার রাজনীতিক ও মিডিয়ার চিন্তাকে শতভাগ প্রভাবিত করার পারদর্শিতায়।

পাঠক, এই পর্যায়ে আমি আপনাদের সামনে ভারতের সিকিম দখলের সামান্য ইতিহাস স্মরণ করাতে চাই। ১৯৭০ সাল থেকেই সিকিমে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। সেখানে লেন্দুপ দর্জি নামক একজন সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস (এসএনসি)-এর নেতাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে। তাকে ক্ষমতায় এনে দেয়ার লোভ দেখায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা। লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বে আন্দোলন, সংঘাত ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে ভারত কয়েকবার নানা অজুহাতে সিকিম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে ১৯৭৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেনদুপ দর্জির নেতৃত্বাধীন সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস (এসএনসি) ৩২ আসনের মধ্যে ৩১টি আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হয়।

প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হয়ে ১৯৭৫ সালের ২৭ মার্চ প্রথম ক্যাবিনেট মিটিং-এ তিনি রাজতন্ত্র বিলোপ করেন। ভারতের সঙ্গে একীভুত হতে ১৯৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি ঘোষণা দেন, ভারতের দুই পরিষদ লোকসভা ও রাজ্যসভায় সিকিমের প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করেও সিকিমকে আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদায় রাখা যেতে পারে। এভাবে নানা চুক্তি ও কৌশলের মারপ্যাচে সিকিম রাষ্ট্র বিলীন হয়ে যায় এবং ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। ভারতে যোগদানের পর লেন্দুপ দর্জি সিকিম রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে নির্বাচনে সিকিমের জনগণ তার বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার সুযোগ পায়। ভয়ানক পরাজয় ঘটে তার। এমনকি তার দলের অধিকাংশ নেতাও তাকে ছেড়ে চলে যান। তখন ভুল বুঝতে পারলেও কিছুই করার ছিল না লেন্দুপের।

প্রসঙ্গক্রমেই সিকিম রাষ্ট্রের বিলীন হওয়ার ঘটনাটি তুলে ধরলাম। ১৯৭০ থেকে মাত্র পাঁচ বছরে সিকিমকে দখলে নেয় ভারত। বাংলাদেশ নিয়ে এমন একটি চক্রান্ত কী শুরু হয়েছে? আমি বলি, না। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হুবহু ঘটে না। ২০০৭ সালের এক-এগারো সরকারের ধারাবাহিকতায় গত আট বছরে সিকিমের পথেই হাটছে বাংলাদেশ! হয়তো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলীন হবে না। আমি মনে করি, রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক চারটি উপাদানের তিনটি থাকবে, কেবল সার্বভৌমত্ব থাকবে না। যেসব চুক্তি হয়ে গেল, তাতে সার্বভৌমত্ব গত ক’বছরেই হারিয়েছে বাংলাদেশ। তিতাস নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারতের অবকাঠামো গঠনে সহায়তা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি কিংবা ট্রানজিট চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতাকে কোথায় নিয়ে গেছে তা নিকট ভবিষ্যতেই অনুমেয় হবে।

সঙ্গত কারণেই আমি পাঠকদের পুরোনো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। একটু চিন্তা করুন, বাংলাদেশকে শতভাগ প্রভাব বলয়ে নিতে ভারতের কত সময় নিতে হয়েছে। ১৯৪৭ সালে বিভক্তির পর কিংবা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর কত বছর কেটে গেছে? ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনেক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম করতে হলো আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে। এর কারণ হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দু’জন নেতা পেয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় আধিপত্যবাদকে সহ্য করতে পারেননি। সেনা বাহিনী সরিয়ে নিতে তিনি ভারতকে বাধ্য করেছিলেন। ১৯৭৫ এর প্রেক্ষাপট সৃষ্টি এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আধিপত্যবাদের ছায়া।

এরপর জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলে তিনিও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সমানে-সমান অধিকারের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে সাহসী পদক্ষেপ নেন। এর পরের সরকারগুলো ভারতের সঙ্গে কুটনীতিতে তেমন কোনো জাতীয়তাবাদী এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়নি। তবে সবাই নিজেদের অস্তিত্ব এবং ক্ষমতা নিয়ে সজাগ ছিল।
২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংঘাতের পথ ধরেই ভারত বড় ধরণের সফলতা পায়; যা ছিল অনেকটা ১৯৭৩ সালে সিকিমের সংঘাতের মতোই। ইতিহাস রিপিট করেনি, সময়ের বিবর্তণে রূপ বদলেছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সাড়ে ছয় বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন। দ্বিতীয় মেয়ায়ে তাঁর ক্ষমতা প্রাপ্তি একেবারেই অবৈধ একটি পন্থায়। তারপরও আজকের পরিস্থিতি বলছে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এখন আশ্বস্ত আরো কিছুদিন তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকছেন। গেল রাতে তিনি হয়তো ভাল ঘুমিয়েছেন।

গত দুই বছরের নির্ঘুম রাতের পর একটি ভাল ঘুম! কিন্তু স্বাধীন বাংলার পরিণতি নিয়ে ভাবার পাশাপাশি এন্ড অব দ্য ডে নিজের পরিণতিও তাকে ভাবতে হবে। বাংলার সার্বভৌম রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে এই পরিস্থিতি নিয়ে গণমানুষকেও ভাবতে হবে। গণমানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে এখন দরকার একজন হেমিলিওনের বাঁশিওয়ালা। যিনি হবেন বঙ্গবন্ধু কিংবা জিয়ার মতো একজন নেতা। কে হবেন সেই নেতা? যিনি ক্ষমতায় যাবেন; তবে কেবল ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করবেন না। প্রাধান্য দেবেন রাষ্ট্র, জনগণ ও জাতীয় সত্ত্বাকে।

আজকের পরিণতিতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, ১৯৬৯, ৭০’, ৭১’ ও ৭২’ সালের শেখ মুজিবুর রহমানকে। আর ১৯৭১ এবং ১৯৭৫-৮১’ সালের জিয়াউর রহমানকে। এই বীরদের আল্লাহ জান্নাত দান করুন। এই বীরদের সাহসিকতা ও মহত্বের কারণেই চার যুগেও টিকে আছে স্বাধীন বাংলা। আর কতদিন কিভাবে টিকবে, সে ভাবনা এখন মুখ্য হয়ে দাড়িয়েছে। বর্তমানের ভীতু-কাপুরুষতার জন্য ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে নিন্দিত হবো আমরা। এমন প্রেক্ষাপটে আজকের নেতৃত্বের কাছে প্রশ্ন, জীবনের শেষ বেলায় কিংবা মৃত্যুর পরে নিজেকে কিভাবে মূল্যায়িত দেখতে চান? লেন্দুপ দর্জি না-কি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অথবা জিয়াউর রহমানের মতো। হয়তো এখনও সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আছে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। সূর্যটা ডুবে গেলে আর আলোর দেখা মিলবে না। বাংলার রাজনীতিকদের কাছে আলোর প্রতাশ্যা রাখছি।

লেখক: যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত সাংবাদিক ও গবেষক।
এমএইচ