বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ইতিহাস' ডিপার্টমেন্টটি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে খুব বেশি আগ্রহের বিষয় নয়। এর কারণ এর বাজার চাহিদা। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন বাজার চাহিদার ভিত্তিতেই ডিপার্টমেন্টের মূল্যায়ন হয়ে থাকে। ফলে দেখা যায়,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ইতিহাসকে অবমূল্যায়িত হতে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম সারির মেধাবীরা ভুলেও এই ডিপার্টমেন্ট নেয়ার ইচ্ছা করেন না। নিতান্তই ঘাড়ে এসে না পড়লে এটা কেউ পড়তে চান না। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ৫ বছরের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে।

আসলে,এটাই এখন বাস্তবতা। সেই হিসেবে ইতিহাসের খুব একটা মূল্যায়ন নেই বললেই চলে। কারণ, শিক্ষকতা ছাড়া ইতিহাস থেকে পড়াশোনা করে আলাদা বিশেষ কিছু করার মতো সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু ইতিহাস যে কত গুরুত্বপূর্ণ এবং চাহিদাসম্পন্ন বিভাগ তা বুঝা যাবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে গেলে। ইতিহাস বিভাগ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করা আমার এক চাচাতো ভাই একবার বলেছিলেন,বিদেশি একটি সেমিনারে একবার তিনি অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে পারস্পরিক পরিচিতির সময় যখন বললেন যে,তিনি ইতিহাসে পড়েন;তখন নাকি সেমিনারে উপস্থিত বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে তার মূল্যায়ন বেড়ে গিয়েছিল। একজন নাকি বলেই উঠেছিল-'ওয়াও! তুমি ইতিহাসে পড়?"

তবে,আজকের আলোচনা আমার ইতিহাস নিয়ে নয়। তবে,জাতি হিসেবে আমরা যে ইতিহাস থেকে কম শিক্ষা নিয়ে থাকি এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতেই উপরে একটু ভনিতা করলাম। এই লেখাটির উদ্দেশ্য ইতিহাস শিক্ষা দেয়া নয়,বরং একটু সজাগ করা। ইতিহাস নিয়ে আলোচনা অনেক বিশদ। লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখন শুরু হয়ে গেছে এমন একটি দিন,যা ইতিহাসের পাতায় বেদনাদায়ক হিসেবে চিত্রায়িত রয়েছে। হ্যাঁ,মুসলমানদের অত্যন্ত বেদনার দিন আশুরার দিনের কথাই বলা হচ্ছে।

আশুরা কী,কী ঘটেছিল এদিন,এর পটভূমি কী এসব বিষয় প্রায় সবারই জানা বা কেউ চাইলেই জানতে পারেন। আমার আলোচনা আশুরার এসব বিষয় নিয়ে নয় বরং আশুরার ঘটনা থেকে আমরা বর্তমান সময়ে কী শিক্ষা নিতে পারি সেই দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।

আশুরা অর্থ্যাৎ কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার অবতারণা হয়েছিল একটি কারণে,সেটি হচ্ছে রাজনীতি এবং ক্ষমতা। সেখানে দুটি পক্ষ ছিল,একটি শুভ আরেকটি অশুভ। সেদিন অশুভ শক্তির উল্লাস দেখেছিল মর্তবাসী। শুভ শক্তি কী সেদিন পরাজিত হয়েছিল? ইমাম হুসাইনের (রা:) রক্ত কী বৃথা গেছে?

কী কারণে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন ইমাম হুসাইন (রা:) ইয়াজিদও তো মুসলমানই ছিলেন। ইয়াজিদ ছিলেন নবীজী (সা:)'র প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত মুয়াবিয়ার (রা:) ছেলে। ইয়াজিদও তো লম্বা আরবীয় আলখেল্লাই পরতেন, মাথায় পাগড়িও পরতেন হয়তো;গায়ে সুগন্ধিও যে মাখতেন না সেটাও বলা যাবে না। ইয়াজিদও ছিলেন আমিরুল মোমেনিন,মুসলিম জাহানের খলিফা। ইয়াজিদ এমন কী করেছিলেন, যে কারণে তার বিদ্রোহ করলেন নবী দৌহিত্র হুসাইন। কেন বিদ্রোহ করেছিলেন বা ইয়াজিদের খেলাফতে হুসাইনের কী আপত্তি ছিল তা হয়তো সাদামাটাভাবে আমরা সবাই জানি কিন্তু হুসাইনের সেই আপত্তির দিকগুলোর তাৎপর্য এবং সেই তাৎপর্যের শিক্ষার আলোকে বর্তমান সময়কে মূল্যায়ন করার একটা প্রচেষ্টা চালানো হবে এ লেখায়।

ইয়াজিদকে ক্ষমতা থেকে সরাতে মরিয়া ছিলেন হুসাইন। এজন্য তিনি জীবনও দিয়ে দিলেন। ইয়াজিদের মুসলমানিত্ব নিয়ে আপত্তি ছিল না হুসাইনের। তাহলে কী ক্ষমতার লোভে তিনি ইয়াজিদকে সরাতে চেয়েছিলেন বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এ প্রশ্নের উত্তরে আপনারা সবাই সম্বরে বলবেন, নবী দৌহিত্র হুসাইন এক ফোঁটাও ক্ষমতা লোভী ছিলেন না। আমিও আপনাদের সাথে একমত পোষণ করবো। আসলে একজন মদ্যপ, ভোগবাদী,ব্যভিচারী এবং জালিমকে মুসলমানদের শাসক মেনে নিতেই আপত্তি ছিল হুসাইনের। ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর ইমাম হুসাইনই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইসলামী জাহানের খলিফা এবং জালিম শাসকের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছিলেন;তিনিই প্রথম স্পষ্ট করে দেন কোনটা হকের পক্ষে, কোনটা ন্যায়ের পক্ষে,আর কোনটা অন্যায় আর জালিমের পক্ষে। জালিমের পরিচয় স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি জালিমের তরবারিতে দ্বিখন্ডিত হয়েছেন। তার নশ্বর দেহটিকে যাচ্ছে-তাইভাবে অপমান করা হয়েছে। বিশ্বের অগণিত রাসূলপ্রেমিক মুসলমানেরা সেদিন ঘরে অবরুদ্ধ অবস্থায় দেখেছেন তাদের প্রিয় রাসূলের প্রাণপ্রিয় নাতিকে জবাই করার দৃশ্য।

ইয়াজিদের চোখে ইমাম হুসাইন ছিলেন একজন দেশদ্রোহী,ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী, খিলাফতের অমর্যাদাকারী একজন বিচ্যুত মুসলিম। ইয়াজিদ এটি প্রমাণ করেছিলেন যে, হুসাইন একজন বিদ্রোহী মাত্র,তার পেছনে কোন জনশক্তি নেই, তার নেই কোন জনসমর্থন;মুষ্টিময় লোক নিয়ে বিদ্রোহ করেছেন হুসাইন। তাই ইসলামী রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার স্বার্থেই এমন একটি লোককে জবাই করাই যায়!! ইয়াজিদের চোখে হুসাইন এতোটাই ইসলামের 'দুশমন' ছিলেন যে,তাকে হত্যার পর মাথাটিকে শরীর থেকে পৃথক করা হয়। আপনারা সবাই জানেন, এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছিল বর্তমান ইরাকের কারবালা শহরের নিকট ফোরাত নদীর তীরে। এখান থেকে কাটা মাথাটিকে নিয়ে যাওয়া হয় সুদূর দামেস্কে, ইয়াজিদের খিলাফতের রাজধানীতে। সেখানে রাজধানী শহরের প্রধান মসজিদের মিম্বরে হুসাইনের কাটা মাথাটি ঝুলিয়ে দেয়া হয়। আর দেশবাসীকে দেখানো হয়,মুসলিম খিলাফতের এক বিদ্রোহীর পরিণতি কেমন হয়।

সেদিন নিশ্চয়ই ইমাম হুসাইনের কর্তিত মাথাটি দেখে ভয়ে আঁতকে উঠেছিলেন। এই 'দুর্ভাগা'র পরিণতি দেখে লোকজন হয়তো আফসোস করেছেন। তাদের কেউ কেউ হয়তো ভেবেছেন, কী দরকার ছিল ইয়াজিদের বিদ্রোহ করার, অন্তত এখন আমাদের যে মনোভাব, আমরা হলে হয়তো ভাবতাম, কী এমন দরকারটা ছিল হুসাইনের এমন করার!!! ইয়াজিদ তো আর মসজিদ বন্ধ করে দেননি, তিনি তো আর আজান নিষিদ্ধ করেননি, তিনি তো নারীদেরকে পর্দা থেকে বের করে নিয়ে আসেন নি, তিনি তো কোরআন-হাদীসের বিকৃতি করেন নি; ইসলাম তো ঠিক পথেই ছিল! হুসাইন কেন বিদ্রোহ করলেন???

ইমাম হুসাইনের বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি সেটি হচ্ছে,'ইসলাম সঠিক পথেই রয়েছে'-আমাদের মতো তখনকার সাধারণ মুসলমানদের এই ধারণাটিকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করে দিলেন ইমাম হুসাইন। সেই শিক্ষাটি চিরঞ্জীব,চিরতর এখনও সে শিক্ষার তাৎপর্য রয়ে গেছে। তাই, ইমাম হুসাইনের রক্ত বৃথা যায়নি। আমরা জানি,ইমাম হুসাইন (রা:) এখন কোথায় আছেন।  

বৃথা যায়নি ইমাম হুসাইন (রা:)'র রক্ত। বরং ধ্বংস হয়ে গেছে ইয়াজিদ। ইয়াজিদের পূর্বসূরীরাও যেভাবে ধ্বংস হয়েছে, তার উত্তরসূরিরাও সেভাবেই ধ্বংস হবে। ফেরাউন, নমরূদ, সাজ্জাদ, আবরাহার হস্তী বাহিনী যেভাবে ধ্বংস হয়েছে যুগে যুগেই মিথ্যা আর ইসলামের শত্রুদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে থাকেন। তবে,প্রত্যেকটা জালিমকেই আল্লাহ তার সময়টুকু দেন;এর মধ্যে হয়তো সে নিজেকে শুধরে নিতে পারে, অথবা ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে পারে। তবে, জালিমদের শাসন খুব একটা টেকসই হয় না। আল্লাহ যুগে যুগে এসব জালিমদের বিরুদ্ধে কিছু মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেন। আর এই ব্যক্তিরা শিকার হন এসব জালিমদের কোপানলের। এসব ব্যক্তিদেরকেও বিভিন্ন অজুহাতে দাঁড় করানো হয় কাঠগড়ায়। মাথা পৃথক করে দেয়া, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া, বিষপ্রয়োগে হত্যা, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা অন্ধকার কারাগারে তিলে তিলে মেরে ফেলা এসবই হচ্ছে জালিমদের পক্ষ থেকে এসব ব্যক্তির জন্য শাস্তি। এই দৃশ্য বিশ্ববাসী দেখে আসছে যুগের পর যুগ। হযরত মূসা(আ:), ঈসা(আ:), ইবরাহিম(আ:), মুহাম্মদ (সা:), হুসাইন (রা:), ইমাম আবু হানিফা,সাইয়্যেদ কুতুবদের মৃত্যুদশা দেখেছে।

লেখক: সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র।