জানি না নতুন পাকিস্তানের আবির্ভাব কবে ঘটবে, তবে আমাদের পাশে এক নতুন ভারতের জন্ম হয়েছে। এই নয়া ভারতে গণতন্ত্র সেকুলারিজমকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। হিন্দু মৌলবাদের পতাকাবাহী নরেন্দ্র মোদির গ্রহণযোগ্যতা খোদ তার দল বিজেপিকেই অস্থির করে দিয়েছে।
বিজেপি মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় সাম্প্রতিক নির্বাচনে শুধু ছক পূরণের জন্য কিছু প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু এসব কমজোর প্রার্থীও বড় বড় হেভিওয়েট প্রার্থীকে পর্যন্ত কাত করে দিয়েছে। মোদির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার বড় দু’টি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ হচ্ছে, তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে নিজের এলাকার চেহারা বদলে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, তিনি পাকিস্তানের ব্যাপারে বড় শক্ত মনোভাব পোষণ করেন। কেউ মানুক আর না মানুক, ভারতের হিন্দুদের বেশির ভাগই কিন্তু আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের অস্তিত্বকে মেনে নেননি।
আর মোদি নয়া ভারতে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণার বড় নিদর্শনরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অতি দ্রুত পাক-ভারত অনুমোদিত সীমান্ত এলাকা ও নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মোদির পরবর্তী আকাক্ষা হচ্ছে, জম্মুকাশ্মির রাজ্যের অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা এবং সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারাকে বিলুপ্ত করা।
৩৭০ নম্বর ধারার আওতায় জম্মুকাশ্মিরকে ভারতে বিশেষ স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। মোদি রাজ্য অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ৩৭০ নম্বর ধারার বিরুদ্ধে প্রস্তাব অনুমোদন করাতে চান।
অতঃপর তিনি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৩৭০ নম্বর ধারা বিলুপ্ত করবেন। বাহ্যত জম্মুকাশ্মির রাজ্যে বিজেপির শাসন কায়েম করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু মোদি তার পার্টিপ্রধান অমিত শাহকে দায়িত্ব দিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে রাজ্য অ্যাসেম্বলির ৮৭ আসনের ৪৪টি আসনে তাকে জয়লাভ করতে হবে।
অমিত শাহ বলেছেন, ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লোকসভার জন্য জম্মুকাশ্মিরের ছয়টি আসনের তিনটিই পেয়েছে বিজেপি। বাকি তিনটি পেয়েছে মাহবুবা মুফতির পিডিপি। বিজেপি জম্মু, উধমপুর ও লাদাখের অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার আসনে জয়লাভ করে।
রাজ্য অ্যাসেম্বলিতে বিজেপির কাছে বর্তমানে ১১টি আসন রয়েছে। আরো ৩৩টি আসনের জন্য বিজেপি যে পদপে নিয়েছে, তা হচ্ছে হিন্দু ভোটারদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা হবে এবং কাশ্মির উপত্যকায় মুসলমান প্রার্থী দাঁড় করানো হবে।
যেকোনোভাবেই হোক ‘৪৪ প্লাস’মিশনে সফলতা অর্জন করতে হবে। ৪৪ আসন লাভের পর বিজেপি জম্মুকাশ্মিরকে সংবিধানের মাধ্যমে ভারতের অটুট অঙ্গে পরিণত করবে এবং চিরদিনের জন্য কাশ্মির সমস্যার পরিসমাপ্তি ঘটাবে।
বিজেপি কাশ্মির উপত্যকার বিখ্যাত রাজনৈতিক বংশের মেয়ে ড. হেনা ভাট, কাশ্মিরি সাংবাদিক খালেদ জাহাঙ্গীর ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার ফারুক আহমদ খানসহ বেশ কয়েকজন মুসলমানকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নিয়েছে।
বিজেপির এক কাশ্মিরি নেতা আশেক হুসাইন দার ইতোমধ্যে উপত্যকায় নির্বাচনী অভিযান শুরুও করে দিয়েছেন। তবে নতুন দিল্লির স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর বক্তব্য হচ্ছে, নিরপে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজেপির ৪৪টি আসন জয়লাভ করা বেশ কঠিন। এটা ঠিক যে, ভারতে মোদির জনপ্রিয়তা এখন বেশ তুঙ্গে, তবে এটা ভাবতে হবে যে, মোদি মুসলমান নয়, হিন্দুদের নেতা।
মোদি ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে সাতটি আসনে মুসলমান প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন, কিন্তু তার একজন মুসলমান প্রার্থীও জয়লাভ করেননি। বর্তমানে লোকসভার ৪৮২ সদস্যের মধ্যে মাত্র ২৩ জন মুসলমান; যা মোট সংখ্যার শতকরা ৪ ভাগ।
অথচ নাগরিক মুসলমানের শতকরা হিসাব আরো বেশি। জম্মুকাশ্মিরের মুসলমানেরা বিজেপির পরিবর্তে পিডিপির মাহবুবা মুফতিকে প্রাধান্য দেবেন। কেননা হুররিয়্যাত কনফারেন্স নির্বাচন বয়কট করবে।
ভারতের কয়েকজন বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার সেনাবাহিনী ও সিকিউরিটি ফোর্সের সহায়তায় নির্বাচনে কারচুপি করার চেষ্টা করবে এবং ৪৪টির বেশি আসনে জয়লাভ করবে। তবে এর পরবর্তী জম্মুকাশ্মির ২০ বছর পেছনে চলে যাবে এবং সশস্ত্র ব্যক্তিরা আবার জেগে উঠবে।
বিজেপির সঙ্কল্পকে সামনে রাখলে এ প্রশ্ন উত্থিত হয় যে, আগামী দিনগুলোতে পাকিস্তানের সরকার ও জনগণ কাশ্মিরিদের কতটুকু সহযোগিতা করবে? ভারতের রাষ্ট্রীয় নির্যাতন থেকে কাশ্মিরিদের বাঁচানোর জন্য পাকিস্তান কার্যকর কিছু করতে পারবে কি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য করাচি থেকে খায়বার পর্যন্ত দৃষ্টি বুলালে দেখা যাবে, পাকিস্তান নিজেই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার শিকার।
ভারতের গণতন্ত্র কাশ্মিরিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ পাকিস্তানের গণতন্ত্র কাশ্মিরিদের সাহায্যের জন্য উপযুক্ত নয়। বরং গণতন্ত্রের এ দেশটি নিজেদেরই সাহায্যের জন্য বেশির ভাগ সময় বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমাদের রাজনীতিবিদেরা তো কাশ্মিরিদের জন্য প্রচুর প্রতিশ্র“তি দেন, প্রস্তাবও পাস করেন। কিন্তু তাদের সমস্যাকে কেন্দ্র করে এক প্লাটফর্মে মিলিত হতে পারেন না। ২৭ অক্টোবর জম্মুকাশ্মিরে ‘কালো দিবস’পালন করা হয়।
লন্ডনে এক বিরাট শোভাযাত্রা বের করা হয়। অথচ নওয়াজ শরিফ, আসিফ জারদারি, ইমরান খান, মাওলানা ফজলুর রহমান. ড. ফারুক সাত্তার, সিরাজুল হক, ইসফান্দইয়ার ওয়ালি, মাহমুদ খান আচাকজাই ও অন্যান্য নেতা এক প্লাটফর্মে মিলিত হয়ে ২৭ অক্টোবর জম্মুকাশ্মির নিয়ে বিজেপির ল্য-উদ্দেশ্যের নিন্দা করার জন্য প্রস্তুত নন। অবশ্য একে অপরের নিন্দা করতে তারা সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।
২৭ অক্টোবর, ১৯৪৭ সালে জম্মুকাশ্মিরের ডোগরা শাসক মহারাজা হরিসিং ভারতের সাথে জম্মুকাশ্মিরকে কৃত্রিমভাবে যুক্ত করেছিলেন। ভারত আজ পর্যন্ত ওই যুক্ত করার দলিল-দস্তাবেজ জাতিসঙ্ঘে পেশ করেনি। অথচ পাকিস্তানের কাছে জুনাগড় রাজ্যের শাসকের প থেকে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়ার আসল দলিল-দস্তাবেজ মজুদ রয়েছে, যা কিনা ভারত প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইনিভাবে কাশ্মিরিদের মোকদ্দমা বেশ মজবুত, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাশ্মিরিদের জন্য ওকালতিতে পাকিস্তান সরকার বেশির ভাগ সময় দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। শুধু জাতিসঙ্ঘে কাশ্মিরের কথা উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়, বরং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কাশ্মিরের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্যও প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
আফসোসের কথা হলো, আজ অনেক উদারপন্থী ও উন্নয়নকামী ব্যক্তি কাশ্মিরের কথা উল্লেখ করাকে উগ্রপন্থা বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। অথচ ফয়েজ আহমদ ফয়েজ থেকে শুরু করে হাবিব জালিব পর্যন্ত উগ্রবাদের সব দুশমন কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক ও সহযোগী ছিলেন।
মুম্বাইয়ের একজন বিখ্যাত আইনজীবী এ জি নুরানি কাশ্মির সমস্যা নিয়ে তার The Kashmir Dispute নামের গবেষণাগ্রন্থ ফয়েজ আহমদ ফয়েজের এক সাক্ষাৎকার থেকে বাছাইকৃত অংশ দিয়ে শেষ করেছেন। সাড়ে পাঁচ শ’পৃষ্ঠাসংবলিত ওই গ্রন্থে ফয়েজ আহমদ ফয়েজের যে সাক্ষাৎকারটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ১৯৬৯ সালে লাহোরে শামিম আহমদ শামিম নামে এক কাশ্মিরি সাংবাদিক তা গ্রহণ করেন।
এ সাক্ষাৎকারটি শ্রীনগরের আয়েনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর তাহের মহিউদ্দিন শ্রীনগরের সাপ্তাহিক চাটান-এ ২০১১ সালের ১৪ এপ্রিল তা দ্বিতীয়বার প্রকাশ করেন। ওই সাক্ষাৎকারে ফয়েজ আহমদ বলেছেন, তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের দিন শ্রীনগরে ছিলেন।
তিনি ২৪ আগস্ট শ্রীনগর থেকে পাকিস্তান ফিরে আসেন। পাকিস্তান ও ভারতের সরকারপ কাশ্মিরের ব্যাপারে চরম কঠোর অবস্থান নিয়ে বিষয়টিকে আরো জটিল করে ফেলে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মির সমস্যার সমাধান হওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তান কাশ্মির সমস্যার সমাধান চায়, অপর দিকে ভারত কাশ্মিরকে কোনো সমস্যাই মনে করে না। এ সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান হচ্ছে, পাকিস্তান ও ভারত সব কিছু কাশ্মিরিদের ওপর ছেড়ে দিক।
ফয়েজ আহমদ বলেছেন, কাশ্মিরিদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেয়া হোক। কাশ্মিরিরা পাক-ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। ফয়েজ আহমদ বলেছেন, শেষমেশ এটাই তো হবে, কিন্তু এটা হবে বহু কিছু ধ্বংসের পর। শামিম আহমদ শামিম লিখেছেন, ফয়েজ নতুন কোনো কথা বলেননি। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে ফয়েজ আহমদ নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্য উন্মোচন করে দিয়েছেন।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৭ অক্টোবর, ২০১৪ সূত্র: (নয়া দিগন্ত )
এসএইচ





