অনেকেরই বদ্ধমূল ধারনা, ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার আড়ালে মূলত আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ বিস্তারের লড়াই চলছে। বিশেষত উচ্চাকাঙ্খী ইরানের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ তথা শিয়া মতবাদের বিস্তার রোধেই এই লড়েইয়ে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হয়েছে সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশ, যার এর সাথে একাট্টা হয়েছে বিশ্বমোড়ল আমেরিকা।  

এই সংকটের উৎস ঘাটতে গিয়ে বেশিরভাগ মানুষ যেমনটি মনে করে থাকেন তা হলো-হুথি বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলন যায়দী শিয়া পন্থীদের প্রতি অনুগত। 

ইয়েমেন গৃহযুদ্ধের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই আবার আগ-পাছ না ভেবে সহজেই বলে বসেন যে, ইরান সরকার ও দেশটির বেশিরভাগ মানুষ যেই মতাদর্শে বিশ্বাসী সেই (শিয়াদের) মদদেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।

কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো এই বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই। কারণ, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে যায়-আদর্শিক ও মতাদর্শগতভাবে যায়দী শিয়াদের অনেকাংশেই মিল রয়েছে সুন্নীদের সাথে। সুতরাং দীর্ঘদিনের শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্বের সাথে ইয়েমেন ইস্যুকে গুলিয়ে ফেলার কোন যৌক্তিকতা নেই।

তবে এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, এই সংঘাতের পেছনে আদর্শিক প্রপাগান্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এর ফলে মূলত মুসলমানদের মধ্যে যারা নানা ফেরকা বা মতাদর্শের উস্মাদনা উস্কে দিয়ে সংঘাতের সৃষ্টি করছে তারাই ফায়দা লুটছে। মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিভক্ত করতেই মূলত বিভিন্ন গোষ্ঠী এসব ফেরকা ও মতাদর্শকে উস্কে দিচ্ছে। অবশ্য এই ভয়ংকর ফাঁদ থেকে মুসলমানদেরকে বেরিয়ে আসার জন্য নানা সময়ে ইসলামিক স্কলাররা সতর্ক করে আসছেন।    

তাছাড়া মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব নীতিমালায় ভিন্নতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক, কারণ প্রত্যেক দেশেরই একটি অভ্যন্তরীণ কৌশল থাকে যা একেবারেই তার নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র। দেশ পরিচালনার এই নিজস্ব কৌশলের ক্ষেত্রে সাধারণত খুব একটা নড়চড় হয় না। তবে, নীতিমালা সংক্রান্ত এই ভিন্নতা সত্বেও মুসলিম দেশগুলো সহজেই একে অপরের কাছাকাছি আসতে পারে এবং পারস্পরিক স্বার্থ –সংশ্লিষ্ট ইস্যুসহ বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের স্বার্থে একযোগে কাজ করতে পারে।

 

আর এক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা রেখে খোলা মনে আলোচনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়াই হবে মুসলিম দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার কিংবা অপরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে জবরদস্তিমূলক হস্তক্ষেপ অবশ্যই পরিহার করতে হবে।

তবে, ওই সব তথাকথিত গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ যারা সব সময় বিশৃঙ্খলা ও ক্রোধকে উস্কে দিতেই তৎপর, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোন সমঝোতামূলক আলোচনা শুরুর আগেই তা ভেস্তে না যায়। মুসলিম বিশ্বকে অবশ্যই মিডিয়ার বর্তমান স্ট্যান্ডবাজির বিষয়ে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। 

মুসলিম বিশ্বকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে সদা তৎপর একে শ্রেনীর গণমাধ্যমের এই হীন ষড়যন্ত্রের প্রমান পাওয়া যায় ইয়েমেন ইস্যুর বেলাতেও। কারণ প্রতিনিয়ত প্রচার করা হচ্ছে যে-ইরানের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্খাই ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের অন্যতম কারণ।

এমনকী এর আগে বাহরাইনের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশটিতে যে গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছিল তার জন্যও ইরানকে দায়ী করা হয়। তবে, কোন প্রমান ছাড়াই এই অন্ধ দোষারোপের রাজনীতি ও অপপ্রচার বিশ্ববাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব বিষয়টি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এখন ইয়েমেন ইস্যুতেও ইরানের বিরুদ্ধে সেই একই নোংরা অপবাদের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে।

হ্যা, এটা ঠিক যে, ইসলামী বিপ্লব পরবর্তী ইরান সবসময়ই মানুষকে স্বৈরশাসন, রাজতন্ত্র, শেখ পরিবারতন্ত্র এবং এ ধরনের চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উৎসাহ দিয়ে আসছে। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে একটি দেশের সাধারণ মানুষ স্বত:স্ফুর্তভাবে দেশটির স্বৈরশাসন বা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে তার জন্যও ইরানকে দায়ী করতে হবে।

ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জেগে ওঠাকে বিদেশী মদদপুষ্ট নিপীড়ন থেকে গণতন্ত্রের পথে বেরিয়ে একটি প্রানান্তকর গণ-প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছে ইরান। আর ইয়েমেনের জনগণ একান্ত জাতীয় স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়েই এমনটি করছেন বলেও মনে করে ইরান। এখানে ইরানের কোন হীন স্বার্থ নেই।

এখানে স্নরন করা যেতে পারে যে, মিশরের গণজাগরণকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান স্বাগত জানিয়েছিল। ওই গণতান্ত্রিক জাগরণের মধ্য দিয়ে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় এসেছিল, অথচ ব্রাদারহুডের আন্দোলনের সাথে ইরানি শিয়াদের আদর্শগত ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে।

এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো ইরান কখনও ভিন্নমতের কারণে কারো বিরোধিতা করেনা, সব সময় দেশটি মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের পক্ষে। আর মুসলিম বিশ্বের যেখানেই যে সম্প্রদায় রয়েছে তারা স্ব স্ব অবস্থানে থেকে ন্যায়সঙ্গতভাবে এগিয়ে যাক সেটাই চায় ইরান।  

এই অঞ্চলে শিয়া মতবাদকে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে কখনই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কাজ করে না। যদিও এই ধারণাই ব্যাপকভাবে বিস্তারলাভ করেছে।  

সত্যিকার অর্থে ইরানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ওইসব ক্ষমতাসীনদের জন্যই একটি মূর্তিমান আতংকের নাম যারা ইরানের কারণে নয় বরং গণজাগরণের মুখে ক্রমেই কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। ক্ষমতার মসনদে থাকা এসব স্বরশাসকরা কখনই তাদের পুরোনো আঞ্চলিক রক্ষাকবচকে হারাতে চায় না।

বর্তমান বিশ্বে স্বৈরশাসন বা রাজতন্ত্র জনগণ আর চায় না। তারা ইনসাফভিত্তিক গণতান্ত্রিক শাসন চায়। এই জাগরণই বছরের পর বছর আরব বিশ্বে টিকে থাকা এক একজন রাজতান্ত্রিক শাসককে ভাবিয়ে তুলছে। আর এর জন্য ইরানকে দায়ী করা ভিত্তিহীন অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।  

ইয়েমেন ইস্যুতে ইয়েমেনের বাসিন্দাদেরই সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার থাকতে হবে। বিবদমান পক্ষগুলোকে কোন বাইরের দাদাগিরির অধীনে না থেকে বরং স্বাধীনভাবে নিজেদের মধ্যে কোন সংলাপে বসে একটি সমঝোতায় পৌছতে হবে অথবা ইয়েমেনের বাসিন্দাদেরকেই পরবর্তী শাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ম্যান্ডেট দেয়ার সুযোগ দিতে হবে। কেউ বাইরে থেকে বোমা মেরে কিংবা জবরদখলের মাধ্যমে ইয়েমেনবাসীর ওপর কাউকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে তার পরিণতি কখনই কারো জন্য মঙ্গলজনক হবে না।  

যারা অন্যের ব্যাপারে মোড়লীপনায় অভ্যস্ত বা শান্তির কথা বলে আরেকজনের ব্যাপারে হর-হামেশা নাক গলাতে পছন্দ করেন তাদের মনে রাখতে হবে, ইয়েমেনের মানুষ নিজেদের ভবিষ্যত নির্ধারণের যথেষ্ট যোগ্যতা রাখেন। যেসব দেশের শাসকরা বলেন, আমরা ইয়েমেনের মঙ্গলই চাই, তারা যদি তাদের এই বক্তব্যে সত্যবাদী হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের জন্য উত্তম হলো-ইয়েমেনের ভবিষ্যত শাসক নির্ধারণে ইয়েমেনবাসীকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ দিবেন।

সৌদি আরবসহ আরববিশ্বকে সতর্ক হওয়া উচিত যে, ইয়েমেনে বিমান হামলায় শুধু দেশটির সাধারণ মানুষই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হচ্ছেন না, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যারা বাহির থেকে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দিচ্ছেন এবং আগ্রাসন চালাচ্ছেন তাদেরকে মনে রাখতে হবে- হিংসার এই লেলিহান শিখা খুব শিগগিরই আবার তাদের দিকেই ধাবিত হবে।

কেবি