শিক্ষকদের বলা হয় ‘দ্বিতীয় পিতা’। অর্থাৎ বায়োলজিক্যাল পিতা একটি শিশুকে জন্মদিলেও তাকে সঠিকভাবে সমাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে শিক্ষকরা। এজন্য শিক্ষকদের এ সম্মানে ভূষিত করা হয়। সেই শিক্ষকই যদি হয় ধর্ষক, তাহলে সমাজ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তা সম্যক উপলব্ধী করতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে একেবারে মাদ্রাসা পর্যন্ত এ ব্যধি মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার প্রলোভন কিংবা ফেল করার ভয়ভীতি দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের এ ফাঁদে ফেলে।

সম্প্রতি আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহফুজুর রশিদ ফেরদৌস স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ বিষয়টি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, তিনি সুন্দরী ছাত্রীদের টার্গেট করতেন। ছলেবলেকৌশলে তিনি ছাত্রীদের অনৈতিক কাজে ব্যবহার করতেন। মামলা হওয়ার পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাময়িক বরখাস্ত করেছে মাত্র। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককেও একই অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, দুটি কারণে ধর্ষণ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর একটি হলো সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজমান থাকলে ধর্ষণসহ এমন ধরনের অপরাধ সমাজে ঘটতে থাকে। আমাদের সমাজ হয়ে পড়েছে দার্শনিক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) বর্ণিত প্রকৃতির রাজ্যের অনুরূপ।

তিনি প্রকৃতি রাজ্যের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে “.. no industry, no letters, no society, and continual fear and danger of violent death..”

এবং তখন মানবজীবন ছিল “Solitary, poor, nasty, brutish and short”. টমাস হবসের এ বর্ণনার সঙ্গে আমাদের আজকের সামাজিক অবস্থার কোন পার্থক্য আছে বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয় না। আমাদের সমাজে কোন শিল্প গড়ে ওঠছে না। শিক্ষা নেই, নেই কোন সুস্থির সমাজকাঠামো। মৃত্যুর ভয় সব সময় আমাদের কাবু করে রাখে, বিপদ তাড়া করে ফেরে। এ কারণে এখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি চলছে। যার ক্ষমতা আছে তার বিচার আছে। যার ক্ষমতা নেই তার বিচারও নেই।

সম্প্রতি ফরিদপুরের সদর উপজেলার যুবলীগের সাবেক সভাপতি আসলাম ফকিরের দ্বিতীয় প্রাণভিক্ষার আবেদনের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি তার ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করে দেন। খুনের এই আসামী ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা। তাই ব্যাপক লবিং-এর জোরে তার ফাঁসির দন্ড মওকুফ হয়। এর আগে লক্ষীপুরের কুখ্যাত তাহেরের ছেলে বিপ্লবের ফাঁসির দন্ডও মওকুফ করা হয়। তাহের সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতা। তার ছেলে স্থানীয় যুবলীগের নেতা।

স্থানীয় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামকে হত্যা করার অভিযোগে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় তার ফাঁসির দন্ড মওকুফ করা হয়। এভাবে ক্ষমতাসীন দলের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মামলা-মোকদ্দমা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

কিন্তু বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা একই পর্যায়ের কোন মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। একই দেশে একই আইনের ভিন্ন আচরণ। সমাজ যখন অধপতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যায়, তখনই কেবল এমনটি হয় বলে মনীষীরা বলেন।

দ্বিতীয় কারণটি হলো অনৈতিক শিক্ষা। আমাদের সমাজে এখন নৈতিক শিক্ষার আকাল চলছে। আমাদের যে শিক্ষা কারিকুলাম রয়েছে তাতে দেখা যায়, একটি শিশু কীভাবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে তা দেয়া আছে।

কিন্তু একজন শিশু কীভাবে একজন মানুষ রূপে গড়ে ওঠবে,তার কোন কারিকুলাম নেই। বর্তমান কালিকুলামে যৌনজ্ঞান দান করার নামে কোমলমতি শিশুদের মনে ধর্ষণের স্পৃহা জাগ্রত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ থেকে শিশুরা বড় হয়ে ধর্ষণ করা ছাড়া আর কী বা করবে! মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘মানুষকে খোদাভীরুতা অর্জন করতে।’

তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সেই প্রিয় যে বেশি খোদাভীরু।’ কিন্তু আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে বরং এর উল্টোটাই শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা আছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে ধর্মহীনতা। এ কারণে আমরা এর ফলও পাচ্ছি আখচার। বর্তমান শিক্ষায় হয়ত আমরা একজন বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার পাচ্ছি, কিন্তু মানুষ তো পাচ্ছি না।

এই মানুষ তৈরির অভাবে সমাজে ধর্ষণ, খুনখারাবি, চুরিডাকাতি বেড়েই চলছে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের অবশ্যই নৈতিক শিক্ষার দিকে যেতে হবে। তানাহলে সমাজে এসব বেড়েই চলবে। [email protected]

[ বি. দ্র.- মতামত লেখকের একান্ত নিজেস্ব, টাইমনিউজ বিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সস্পর্ক নেই। ]

এমবি