তিনি বলেন, এসব দাবিতে শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকা থেকে খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের তৃতীয় দফার লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১১টায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লংমার্চের প্রস্তুতি ও কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, প্রায় ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ লংমার্চ আগের দুটি কর্মসূচির তুলনায় সবচেয়ে দীর্ঘ। এতে ঢাকা ও আশপাশের জেলাসহ খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ মোট ১৯ জেলার নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেবেন। পথে বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়ি যুক্ত হয়ে বহরটি প্রায় দেড় হাজার গাড়িতে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সাত দফা দাবির মধ্যে প্রথমটি হলো গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। তাঁর অভিযোগ, গণভোটের রায় অস্বীকার করে সরকার রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর করছে।

তিনি বলেন, একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি ভোটের একটির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও অন্যটির ফলাফল অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি দ্বিচারিতা ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকার আন্তরিক হলে আগামী ৯ নভেম্বরের সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।

জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকে এখনো দেশে-বিদেশে চিকিৎসাধীন। ঘটনায় জড়িত, বিশেষ করে যাঁরা এখনো গ্রেপ্তার হননি, তাঁদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, সার ও জ্বালানি সংকটের কার্যকর সমাধান না হওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর দাবি, নতুন করে গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগের খবরে জনদুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, হত্যা, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও রাজনৈতিক সংঘাত বেড়েই চলেছে। এমনকি সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। তাঁর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সরকারের বিভিন্ন স্তরে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ নিয়োগ, ডিলারশিপ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধের আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, হাটবাজার, ঘাট, বালুমহাল, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, চাঁদাবাজির ধরন বদলায়নি; বদলেছে চাঁদাবাজদের পরিচয় ও দলের নাম।

লংমার্চ সফল করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানান গোলাম পরওয়ার। তাঁর ভাষ্য, ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে।

লংমার্চের কারণে মহাসড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে উল্লেখ করে তিনি আগাম দুঃখ প্রকাশ করেন। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে মহাসড়কের এক পাশ ব্যবহার করে কর্মসূচি পরিচালনার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।

অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার বলেন, সবাইকে ধৈর্য, সংযম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, স্লোগান কিংবা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন আচরণ করা যাবে না। পথে নতুন কোনো জেলা থেকে গাড়ি বহরে যুক্ত হলে সেগুলো বহরের শেষ প্রান্তে যুক্ত করতে হবে।

নিরাপত্তা, চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও গণমাধ্যমের দায়িত্বে থাকা দলগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে জানান তিনি। দীর্ঘ যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী সঙ্গে রাখার পাশাপাশি প্রতিটি গাড়ির টোলের টাকা প্রস্তুত রাখার নির্দেশনাও দেন।

লংমার্চ সফল করতে দেশবাসী, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।

আয়োজকদের সময়সূচি অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন। সকাল ৮টায় প্রায় ৬০০ গাড়ি নিয়ে লংমার্চ শুরু হবে। পথে আরও গাড়ি যুক্ত হয়ে বহরটি প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

লংমার্চের পথে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় সকাল ৯টায় এবং বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়ে সকাল ১১টায় পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরে দুপুর সাড়ে ১২টায় এবং ফুলতলার স্বাধীনতা চত্বরে দুপুর ২টায় পথসভা হবে।

পরে যশোরের মুড়লীর মোড়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় এবং ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে বিকেল ৫টায় পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় যোগ দেবে লংমার্চের বহর।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, জাহিদুর রহমান ও আতাউর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।

এস