আওয়ামী লীগের যেসব সংসদ সদস্যকে বারবার চেষ্টার পরও সংশোধন করানো সম্ভব হয়নি, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। একথা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দলটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন জনবিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিত সংসদ সদস্যরা। ৫০ জনের মতো এমপি এই তালিকায় আছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার দলের সংসদীয় বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, জনবিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, কে কী করছেন, তার রিপোর্ট আমার কাছে আছে। নিয়মিত এসব তথ্য হালনাগাদ হচ্ছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। এলাকায় যার অবস্থান ভালো না, তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, ৫ জানুয়ারির মতো নয়।

দলীয়প্রধানের এমন মন্তব্যে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন দলে ও দলের বাইরে নানা সময়ে সমালোচিত এমপিরা। এ ঘোষণার পরদিনই বিতর্কিত কয়েকজন এমপিকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমণ্ডির অফিসে বসে থাকতে দেখা গেছে। তারা দলের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেও দেখা পাননি।

বর্তমান সরকারের অতিক্রান্ত তিন বছরে বেশ কিছু এমপির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। কোনো কোনো এলাকায় দলীয় সংসদ সদস্য ও তাদের ক্যাডারদের সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, নিয়োগবাণিজ্য, দখলবাজিসহ নানা অপকর্ম দলকে বিষিয়ে তুলেছে।

কেন্দ্র থেকে চেষ্টা করেও অনেক এমপিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিতর্কিত কার্যকলাপ থেকে বিরত করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে ঢাকায় ডেকে অনেককে হুমকি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এর পরও যাদের অপকর্ম ও দলীয় কোন্দল বন্ধ হয়নি এবার তাদের মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

সরকারের বিগত তিন বছরে আওয়ামী লীগের আলোচিত-সমালোচিত এমপিদের মধ্যে রয়েছেন- বৃহত্তর ঢাকার দুজন মন্ত্রী ও একজন এমপি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের এমপি এবং মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক, নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি, টাঙ্গাইল-৩ আসনের এমপি আমানুর রহমান রানা, নরসিংদী-৫ আসনের এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফ, নীলফামারী-৩ আসনের গোলাম মোস্তফা, পিরোজপুর-১ আসনের একেএমএ আউয়াল, যশোর-১ আসনের শেখ আফিল উদ্দিন, যশোর-৪ আসনের রণজিত কুমার রায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের গোলাম রব্বানী প্রমুখ।

বৃহত্তর ঢাকার দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা ও সংবিধান নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় মামলা হয়। মামলায় জরিমানা ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এ নিয়ে বিব্রতবোধ করে। সে সময় মন্ত্রী-এমপিদের কম কথা বলার নির্দেশনা দেয় আওয়ামী লীগ।

জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় দায়সারা ভাবের জন্য ব্যাপক বিতর্কিত ও সমালোচিত হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি এবং মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক। সে সময় নিজ এলাকায় না গিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন। সে ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়কে গালি দেওয়ার অভিযোগ উঠলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে, মন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনকে তখন মানববন্ধনও করতে দেখা গেছে।

অনুষ্ঠানের ব্যানারে নিজের নাম না থাকায় নিজ মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম-সচিবের কক্ষ ভাঙচুর ও আরেক সিনিয়র সহকারী সচিবের কক্ষে তালা দেন নেত্রকোনা-২ আসনের এমপি এবং যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। তারও আগে আদম পাচারের অভিযোগ ওঠে জয়ের বিরুদ্ধে। নিজ এলাকায় ভাইদের আধিপত্যে কোণঠাসা দলীয় নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী এবং পুলিশ পেটানোর অভিযোগও আছে।

ইয়াবাসম্রাট হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে নিয়ে কম বিব্রত হতে হয়নি আওয়ামী লীগকে। অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এতে নিম্ন আদালত ৩ বছরের কারাদ- দিলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। এ ছাড়া সন্ত্রাসী তৎপরতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, চোরাচালান, জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে বদির বিরুদ্ধে। নিজ দলের নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সখ্য গড়ায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও তার ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ।

আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার আসামি হিসেবে টাঙ্গাইল-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফ ফটোশপের মাধ্যমে নিজ ছবির শরীরে বঙ্গবন্ধুর ছবির মুখম-ল জুড়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেন বলে অভিযোগ আছে। স্কুল বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘক্ষণ রাজপথে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ আছে পাবনা ও রাজশাহীর দুই এমপির বিরুদ্ধে। এ নিয়ে তখন দলকে বেকায়দায় ফেলেন তারা।

নরসিংদী-৫ আসনের এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুও নিজ এলাকায় বিতর্কিত। এলাকার নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে উল্টো তাদের ওপর হামলা-মামলার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ আছে। সেসময় জমি ফেরত চাইতে গেলে ওই পরিবারের লোকজনের ওপর এমপির বাহিনী হামলা করে। এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

নীলফামারী-৩ আসনের গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার অভিযোগ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করেন তিনি।

সম্প্রতি খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল হকের ছেলে মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অন্যের জমিতে ইটের দেয়াল দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। অবরুদ্ধ সেই পরিবারের লোকজন ওয়াল টপকে কিংবা ওয়ালের নিচ দিয়ে মাটি খুঁড়ে চলাচলের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে বেকায়দায় আছেন এমপি নুরুল হক।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধেও আছে হাজারো অভিযোগ। সন্ত্রাস, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগবাণিজ্য, টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দলের ভেতরে কোন্দল সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী নির্বাচনে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য কাউকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে না। আমাদের অনেক ভুল আছে তা সংশোধন করতে হবে। আমাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় যেসব এমপি বিতর্কিত, আগামী সংসদ নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। বিতর্কিত এমপিদের আসনে বিকল্প প্রার্থী খোঁজা হচ্ছে বলে জানান তিনি।(সূত্র-আমাদেরসময়)

এমবি